নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ নূরজাহান বেগম

জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি

ডেইজী মউদুদ | শনিবার , ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

এই উপমহাদেশে সাপ্তাহিক নারী পত্রিকার প্রথম নারী সম্পাদক নূরজাহান বেগম। ‘বেগম’ নারীদের জন্য প্রথম পত্রিকা। এই অঞ্চলে শিক্ষিত নারীদের কাছে এই পত্রিকা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। আমি যখন প্রাইমারি স্কুলে বাল্যশিক্ষার ছাত্রী, পড়েছিলাম ‘ঘোড়ায় চড়িল/আছার খাইল/ আবার উঠিল/ উড়িয়া পড়িল কিংবা দুষ্টমতি লঙ্কাপতি / হরে নিল সীতা সতী/ রামচন্দ্র গুণধর / বধিলেন লঙ্কেশ্বর…” তখন মা কে দেখেছি “বেগম” পত্রিকা পড়তে। আমার শিক্ষক পিতা আমার মায়ের জন্য বেগম কিনতেন। কিনতেন গল্প, উপন্যাস সহ নানা বই পুস্তক। কিন্তু মা আর আপাকে দেখতাম ‘বেগম’ দিকেই বিশেষ নজর। কারণ এই পত্রিকায় গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ছাড়াও শিশুদের সুন্দর ছবি, নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেয়া হতো। কেবল তা নয়, থাকতো সেলাইফোঁড় নামের কলাম, যেখানে উলের কাজ, ক্রুশির কাজ নিয়ে লেখা থাকতো। থাকতো রান্নাবান্নার রেসিপিও। আমি বাল্যশিক্ষা পেরিয়ে ক্লাস ওয়ান / টুতে পড়াকালীন সময়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ‘বেগম’ এ চোখ বুলাতাম। প্রথমেই বাচ্চার ছবিটি দেখে ফেলতাম। আরো লক্ষ্য করেছি, আমার মা সেলাই আর রান্নার কলামটি কেটে অতি যত্নে রেখে দিতেন। ব্যাস! এই হলো নূরজাহান বেগম এর ‘বেগম’ পত্রিকার সাথে আমার পরিচয়ের সূচনা। কিন্তু কে এই পত্রিকার সম্পাদক, কীভাবে চলে কিছুই জানতাম না। কিন্তু ‘বেগম’ নামটি আমার মগজেমননে গেঁথে গিয়েছিল চিরকালের জন্য। তখন আবার ‘ললনা’ টাপুরটুপুর এসব ম্যাগাজিনও আমি আমার বাসায় দেখেছি। বিশেষ করে টাপুরটুপুর ছিল খুব প্রিয় ছিল। টাপুরটুপুর এর প্রচ্ছদ আমার এখনো মনে আছে। তবে যখন বড় হলাম, তখন সাপ্তাহিক বেগম এর সাথে পরিচয় হলো অন্যরকমভাবে। ৮০ এর দশকে যখন আমি সাংবাদিকতায় প্রবেশ করি, তখন নারী নেত্রী সুফিয়া কামাল, নূরজাহান বেগম সহ অনেক বরেণ্য নারীদের সান্নিধ্যে যাবার সুযোগ হয়। সুফিয়া কামালের সাথে ছিল আত্মীয়তার বন্ধন। উনি আমার শ্বশুর পরিবার আলম পরিবারের সদস্যতুল্য। উনাকে আমরা ফুফু ডাকতাম। উনার জীবন কাহিনী জানতে গিয়েই সওগাত সম্পাদক নাসিরউদ্দীন সাহেব, বেগম পত্রিকা এবং নূরজাহান বেগমের সাথে আমার নব পরিচয় ঘটে। নূরজাহান বেগমের জন্ম চাঁদপুরে ১৯২৫ সালের ৪ জুন। আর তিনি প্রায় পরিণত বয়সেই ২০১৩ সালের ২৩ মে চিরবিদায় নেন। যদিও পিতা সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ছিলেন শতবর্ষী। ১৯২৫ সালের জুন থেকে যদি ২০২৫ সালের জুন ধরি, তাহলে উনার শতবর্ষ হয়। বেঁচে থাকলে তিনিও পিতার মতো শতবর্ষী হতেন। এই মহীয়সী নারী সাংবাদিককে উনার জন্মশতবর্ষে এই প্রজন্মের নারী সাংবাদিকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার উদ্দেশ্যেই এই লেখার অবতারণা।

পিতা কলকাতায় চাকরি করতেন বিধায় নূরজাহান বেগম মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে চাঁদপুর ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি দেন। চাঁদপুর থেকে স্টিমারে চেপে গোয়ালন্দ ঘাট, সেখান থেকে ট্রেনে করে শিয়ালদহ রেলস্টেশনে নেমে কলকাতা। পিতা নাসিরউদ্দীন সাহেব নিজেই ঘোড়াগাড়ি নিয়ে স্ত্রী আর কন্যাকে নিতে এসেছিলেন। ঘোড়াগাড়ি এসে থামলো কলকাতার ১১ ওয়েলেসলি রোডের দ্বিতল বাড়ির সামনে। এটিই উনাদের বাসা। গ্রামের শিশুটিকে কলকাতার সমকালীন নাগরিক পরিবেশের সাথে মানানসই করতে স্যাকরার দোকানে নিয়ে নাক কান ফুটানো হলো, দীর্ঘ ঘন কালো কুন্তল সেলুনে নিয়ে বব কাট করলো। আর যেই বাড়িতে শিশু নূরজাহান মায়ের সাথে এসে উঠেছিলেন, সেটি যেনো চাঁদের হাট। কবি শিল্পী সাহিত্যিকদের আড্ডাখানা। উনাদের দোতলার পাশের ঘরে থাকতেন কবি নজরুল। কবিআড্ডা, গানের আসর নূরজাহান বেগমের স্বচক্ষে দেখা। এই বাড়িতেই কবি নজরুল নাসিরউদ্দীন সাহেবের অনুরোধে তাঁর ‘মৃত্যুক্ষুধা’ আর ‘কুহেলিকা : উপন্যাস দুটি লিখেছিলেন। সেসময় এই বাড়িতে আসতেন বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকরা। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল মনসুর আহমেদ, ইব্রাহীম খাঁ,আবুল কালাম শামসুদ্দিন, হাবীবুল্লাহ বাহার, খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন এর মতো সাহিত্যিকরা আসতেন নিয়মিত। মাঝে মাঝে বেগম রোকেয়াও আসতেন। সেই সাহিত্যিক পরিমণ্ডলেই নূরজাহান বেগমের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় বেগম রোকেয়ার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে শিশুশ্রেণিতে ভর্তির মধ্য দিয়ে। সেখান থেকে ১৯৪২ সালে তিনি মাধ্যমিক এবং ১৯৪৪ সালে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। একই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে তিনি বিএ পাস করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের কিছুকাল আগেই কলকাতা থেকেই ‘বেগম’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নূরজাহান বেগম এর পিতা নাসিরউদ্দীন সাহেব। তবে ‘বেগম’ এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। আর উনার সাথে সম্পাদনার কাজ করতেন নূরজাহান বেগম। আজ থেকে শত বছরের কাছের সময়ে পিতাপুত্রী মিলে নারী সমাজের চিন্তা চেতনার অগ্রগতি নিয়ে যে ভাবনা ভাবতে পারতেন, বেগম পত্রিকায় সেই চেতনা আর ভাবনারই প্রতিফলন ঘটতো। নারীদের গেরস্থালি, ছবি, সূচিকর্ম, সাহিত্যচর্চা, স্বাস্থ্যসেবা, সমস্যা আর সম্ভাবনার কথাই থাকতো বেগম এর পরতেপরতে। মূলত এই পত্রিকার মধ্য দিয়ে সমকালীন নারীদের মাঝে পাঠ্যভ্যাস গড়ে ওঠে। সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলের সাথে ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে তারা সাংসারিক কাজের মাঝেও বিনোদন খুঁজে পেতেন। বেগম এর প্রথম সংখ্যা ছাপা হয় ৫০০ কপি। মূল্য ছিল চার আনা। আর প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে ছিল বেগম রোকেয়ার ছবি। প্রথম চারমাস সুফিয়া কামাল সম্পাদক ছিলেন। নূরজাহান বেগম ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। কলকাতার ওয়েলেসলি স্ট্রিটের অফিসে বসে তিনি লেখা সংগ্রহ থেকে শুরু করে সম্পাদনা, অনুবাদ, ছবি সংগ্রহ সবকিছুই পিতার পরামর্শেই করতেন। তবে সেই সময়ে সামপ্রদায়িক বিষবাষ্প, সামপ্রদায়িক দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এতটা ভয়াবহ ছিল যে, সনাতন ধর্মের লেখকরা আর লেখা দিতে চাচ্ছিল না। এই সময়ে নূরজাহান খান অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। অর্থাৎ এই পত্রিকা টিকিয়ে রাখতে বেশ ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়েছিল। এর পরেও ১৯৪৮ সালে তিনি কলকাতা থেকে প্রথমবারের মতো বেগম এর ঈদসংখ্যা বের করেন। এতে ৬২ জন নারীর লেখা ছাপা হয়। ৬২ টি বিজ্ঞাপনও পাওয়া যায়। ১৯৫০ সালে ‘বেগম’ এর অফিস ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ঠিকানা হয় ঢাকার পাটুয়াটুলীতে। ১৯৬০ থেকে ৭০ দশক পর্যন্ত বেগম এর প্রচার সংখ্যা ছিল ২৫ হাজারের মতো। উচ্চ শিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত এমন কোনো গৃহিণী নেই, যিনি বেগম পড়তেন না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডাকযোগে এই পত্রিকা যথাসময়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়া হতো। মুসলিম নারী লেখক ও পাঠক তৈরিতে এই পত্রিকার রয়েছে কিংবদন্তিতুল্য অবদান। নারীদের উদ্দেশ্যে বের করা হলেও ক্রমে এই পত্রিকা পুরুষদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যেহেতু নূরজাহান বেগম কিংবদন্তি সাংবাদিক নাসিরউদ্দীনের কন্যা। পিতার পেশাদার সাংবাদিকতা তিনি দেখেছিলেন, আবার হাতে কলমেই শিখেছেন পিতার কাছ থেকে। এর সাথে নিজের মেধা আর যোগ্যতার স্বতঃস্ফূর্ত মেলবন্ধনে নূরজাহান বেগম এই পত্রিকাকে নিয়ে গিয়েছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তিনি এই পত্রিকায় তুলে আনলেন নারী জাগরণ আর নারী স্বাধীনতা থেকে নারী অধিকার। যেখানে উঠে এসেছিল কুসংস্কার বিলোপের কথা, প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলের নারী নির্যাতনের কাহিনী, জন্মনিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে গ্রাম্য নারীদের জীবনবোধ থেকে লেখা চিঠিও। প্রকৃত অর্থে ‘বেগম’ ছিল নারী অধিকার আর নারী শিক্ষার পক্ষে অবদমিত এক সাহসী মাধ্যম। নূরজাহান বেগম এই পত্রিকার মধ্য দিয়ে সর্বকালের নারীদের মতামত ও ভাষ্য তুলে এনেছিলেন। এর পর থেকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার পথ বিস্তৃত হয়। বেগম পত্রিকার মাধ্যমে তারা নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেতন হন। তাঁর প্রদর্শিত পথেই নারীরা সাংবাদিকতা পেশায় আসার প্রেরণা পান। নূরজাহান বেগমের সাংবাদিকতা জীবন এতই সফল, উজ্জ্বল আর বর্ণিল, স্বল্প পরিসরে শেষ করা অসম্ভব। জন্মশতবর্ষে এই নারীকে জানাই শত কুর্ণিশ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে ধানের শীষ আজ সময়ের দাবি
পরবর্তী নিবন্ধনারী ও তার ভোটাধিকার