নারী : মমতা, শক্তি ও সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি

নেভী বড়ুয়া | রবিবার , ৮ মার্চ, ২০২৬ at ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ

নারী শুধু জীবনসত্তা নয়; নারী মায়া, মমতা, শক্তি, ধৈর্য, অনুভূতি, সাহস ও ভালোবাসায় গড়া এক অনন্য পরশপাথর। নারী মানেই কোমলতা, নারী মানেই গভীরতা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন– ‘নারীর হৃদয়, সে তো এক আশ্চর্য জিনিসএকই সঙ্গে কোমল এবং কঠোর।’

নারী বাবার ঘরের প্রাণ, স্বামীর ঘরের প্রাচুর্য এবং সন্তানের পরম নির্ভরতা। আজকের নারী আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চায়, নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে চায়। তবুও বাস্তবতার নিরিখে দেখা যায়, আমাদের সমাজে অধিকাংশ নারী এখনও অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি স্বাবলম্বী নয়। নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য অনেক সময় নারীরা পুরুষের উপর নির্ভরশীল থাকেবাবার বাড়িতে বাবার উপর, আর শ্বশুরবাড়িতে স্বামীর উপর। তবে এ কথাও সত্য যে, পুরুষরাও নারীর উপর সমানভাবে নিভর্রশীল। কারণ নারীরাই ঘরের লক্ষ্মী, মা অন্নপূর্ণা, বিদ্যায় সরস্বতী। নারী বাবার আদরের কন্যা, ভাইয়ের স্নেহের বোন, স্বামীর প্রিয়তমা স্ত্রীএক কথায় সংসারের পূর্ণতা। নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক যখন মধুর হয়, তখন সেই সম্পর্ক আনন্দময় ও ভালোবাসায় ভরপুর হয়ে ওঠে। নারী কেবল বিধাতার সৃষ্টি নয়; পুরুষও নিজের অন্তরের সৌন্দর্য মিশিয়ে নারীকে গড়ে তোলে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে যদি নারী ও পুরুষ পরস্পরের পরিপূরক হয়, তবে তাদের মধ্যে এত বিভেদ কেন? কেন নারী বিদ্বেষ বা পুরুষ বিদ্বেষ? কেন অনেক সময় নারীর পথচলা কণ্টকময় হয়ে ওঠে? কেন তৃণমূল পর্যায়ে এখনও অনেক নারী নির্যাতিত ও অবহেলিত হয়? তবে কি এটি কেবল পুরুষের মনোশক্তি বা পেশিশক্তির অপপ্রয়োগ? নারীরা মূলত সমতা বা ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে না; তারা চায় সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে পুরুষের সহযাত্রী হয়ে চলতে। আজকের নারী আকাশ, পাহাড়, সমতল, সমুদ্রঅফিস আদালতসহ সর্বক্ষেত্রে সমান দক্ষতায় কাজ করছে। তবুও নারীর ক্ষমতায়ন এখনও সর্বত্র সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আমাদের সমাজে পুরুষের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা নারীদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নারীরা পুরুষকে পিছনে ফেলে নয়, বরং পাশে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। একইভাবে পুরুষদেরও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। পথেঘাটে, বাসেট্রামে, ঘরেবাইরে নিরাপদে চলাচলের মতো বন্ধুসুলভ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

সংসার জীবনেও স্বামীর সহযোগিতা, যত্ন, সম্মান ও মর্যাদা একটি নারীর জন্য বড় আশীর্বাদ। কারণ ঘরের মানুষের অসহযোগিতা নারীর বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই সহযোগিতা পেলে নারী হয়ে ওঠে একজন সুগৃহিণী, প্রিয়তমা স্ত্রী, গর্বিত প্রজন্মের গর্বিত মা এবং সমাজ ও দেশ গঠনে একজন আদর্শ মানুষ।

বিশ্বখ্যাত মানবতাবাদী মাদার তেরেসা নারীদের ‘বাড়ির হৃদপিণ্ড’ বা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীর ভালোবাসা ও মমতাই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। নারী শিক্ষাই নারীমুক্তির প্রধান শর্ত। নারীদের যোগ্যতা নারীদের নিজেদেরই অর্জন করতে হয়। নিজেদের সমস্যা সমাধানে নারী শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নারীরা শিক্ষিত হলেই পরিবারের, সমাজের এবং দেশের অগ্রগতি সম্ভব।

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন– ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হলেন মা। আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।’ নারীর নিজস্ব প্রচেষ্টা ও আত্মবিশ্বাসই তার ভাগ্য নির্মাণের প্রধান শক্তি। পুরুষের অনুপ্রেরণা তখনই কার্যকর হয়, যখন নারী নিজেই নিজের উন্নয়নের তাগিদ অনুভব করে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর সেই বাস্তবসত্য উক্তি– ‘আপনারে দীপ করে জ্বালো, আপনার যাত্রাপথে আপনিই দিতে হবে আলো” নারীদের জীবনের জন্য এক অনুপ্রেরণামূলক দিকনির্দেশনা।

আইএলওর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে প্রায় ২১% কম মজুরি পান। যদিও শিক্ষা ও নারী উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবুও অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ক্ষেত্রে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। নারী সহিংসতা, নারী বৈষম্য এবং নারীর অনিরাপদ পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি কমেনি। তাই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়নারী ও পুরুষ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তারা একে অপরের পরিপূরক। পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধই পারে একটি সুন্দর, সমতাভিত্তিক ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনারী দিবসের অঙ্গীকার
পরবর্তী নিবন্ধআহা নারীজীবন!