নারী বিষয়ক সংস্কার: বাস্তবায়ন এবং আশঙ্কা

রাফওয়া ইসলাম | শনিবার , ৫ এপ্রিল, ২০২৫ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ

আমরা ইতোমধ্যেই জানি যে গত ১৮ নভেম্বর ২০২৪এ ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’ গঠন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নারী উন্নয়ন সংগঠন ‘নারীপক্ষ’এর নির্বাহী শিরীন পারভিন হককে প্রধান করে ১০ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিশনের যাত্রা। সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’ গঠন ও কমিশনের কার্যপরিধি নির্ধারণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এরই মধ্যে নিজেদের প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন। আর এই প্রতিবেদন তৈরিতে সংস্কার কমিশন ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সব শ্রেণিপেশার নারীদের সঙ্গে নিয়মিত সভা করেছে। তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের মতামত এবং কমিশনের সদস্যদের পর্যবেক্ষণের সহযোগে সুপারিশ তৈরি হবে। কিন্তু কী কী সুপারিশ থাকতে পারে? এ প্রসঙ্গে সংস্কার কমিশনের প্রধান জানান, ‘‘যেসব ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য হচ্ছে সেগুলো তারা খুঁজে বের করে পরিত্রাণের সুপারিশ রাখবেন। সেটা আইনে হোক, সংবিধানে হোক, নীতিতে হোক, কর্মসংস্থাতে হোক। আমরা ছক করে নিয়েছি সংবিধান ও আইন, প্রাতিষ্ঠানিক, কর্মসূচি, নীতিসেগুলোর যেখানে বৈষম্য রয়েছে সেগুলোর বৈষম্য বিলোপের সুপারিশ থাকবে। এটা হবে বৈষম্য বিলুপ্তি এবং সমতার পক্ষে পদক্ষেপ নেওয়া।” অবশ্য কমিশনের কিছু কিছু সুপারিশ হয়তো নানামুখী বাধার মুখে পড়তে পারে, সে আশঙ্কাও রয়েছে! এ প্রসঙ্গে তিনি জুলাইআগস্টে কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতনের আন্দোলনে নারীদের জোরালো অংশগ্রহণ থাকলেও এরই মধ্যে তাদের ‘অদৃশ্য’ করে ফেলার কথাও উল্লেখ করেন। যাই হোক, সংস্কার কমিশনের প্রধান বলছেন, সুপারিশগুলো তিন ভাগে বাস্তবায়নের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু সুপারিশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, কিছু মধ্যম মেয়াদেযেগুলো নির্বাচিত সরকার বাস্তবায়ন করবে আর কিছু সুপারিশ দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য রাখা হবে। তাহলে কীরকম হতে পারে সেই সুপারিশগুলো বা কমিশনের কাছে কী প্রত্যাশা করছে নারীরা?

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম জানিয়েছেন নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের কাছে মূল চারটি বিষয়কে মাথায় রেখে সুপারিশ রাখা হয়েছে। নারীদের সংরক্ষিত আসন বাড়ানো এবং সরাসরি ভোট, সিডও সংরক্ষণ প্রত্যাহার, বাল্যবিয়ের বিশেষ বিধান প্রত্যাহার, সহিংসতা প্রত্যাহারে হাই কোর্টের রায় আছে সেই মোতাবেক অফিসে অফিসে অভিযোগ কমিটি করতে হবে, যৌন হয়রানির জন্য কী শাস্তি হবে, কোন ধরনের যৌন হয়রানিতে কী শাস্তি হবেএরকম নির্দেশনার আইন করতে হবে। বর্তমানে সংসদে নারীদের জন্য পঞ্চাশটি সংরক্ষিত আসন রয়েছে। জনসংখ্যা বাড়ার ফলে সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে একশ পঞ্চাশটি করার প্রস্তাব করেছে মহিলা পরিষদ। জাতিসংঘ কর্তৃক পুরুষের সমান পর্যায়ে নারীর মানবাধিকার আদর্শগত ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক সিডও সনদ বা নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসন সনদ পরিগৃহীত হয়। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালের ৬ ডিসেম্বর কিছু ধারা সংরক্ষণ সাপেক্ষে সিডও সনদ অনুমোদন করে। সিডও সনদের ২ এবং ১৬ () এর গ ধারায় সংরক্ষণ আরোপ করায় এই ধারা অনুযায়ী প্রচলিত আইনে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক ধারার সংশোধন এবং বৈবাহিক জীবনে নারীপুরুষ সমান অধিকার পাচ্ছে না। এগুলো প্রত্যাহার না হলে সিডও’র বাকি ধারাগুলোর জায়গাটা সীমিত হয়ে যায়। এর পাশপাশি আদিবাসী নারীর অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের কর্মপরিবেশ, রাস্তাঘাটে নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থলে এবং গণপরিসরে নারী সহিংসতা প্র্রতিরোধের জন্য আইন রাখার প্রস্তাব করেছেন তারা। যেগুলো আসলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে করা যায়। বাজেটে নারীর জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয় সেটাকে সহিংসতা প্রতিরোধ, নারীর কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, সেফটি নেটওয়ার্ক বা নিরাপত্তা বলয় বাড়ানোর কথাও সুপারিশ করবে কমিশন। পাশাপাশি এর ব্যবহার সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা সরকারকে নিয়মিত তদারকি করার কথাও বলবেন তারা। তবে এসব সুপারিশকে উচ্চাভিলাষী বলছেন কেউ কেউ, বর্তমান সামাজিকরাজনৈতিক বাস্তবতায় এসবের বাস্তবায়ন সম্ভব কীনা এমন প্রশ্নও রেখেছেন অনেকে। এ প্রসঙ্গে সংস্কার কমিশনের প্রধান বলছেন, ‘‘নারীদের ব্যাপারে বাংলাদেশের সমাজ এখনও রক্ষণশীল। এর সঙ্গে নারী বিদ্বেষও রয়েছে। এটার আমরা নমুনা দেখতে পাচ্ছি। নারী বিদ্বেষী সমাজ, নারীর প্রতি বৈষম্য করে, জাজ করে এমন সমাজেইতো আমরা বাস করছি। সুতরাং অনেকগুলো সুপারিশই আমি জানি গ্রহণ করা হবে না বা অনেক বাধা আসবে। কিন্তু তারপরও আমরা সুপারিশগুলো করব, এ কারণে করবএ সুপারিশগুলো মানুষ শুনুক, জানুক এবং এগুলো নিয়ে মানুষ বিতর্ক করুক, সমালোচনা করুক, যাই করুক পাবলিক পর্যন্ত অন্তত এ বিষয়গুলো উঠে আসুক।’’

উল্লেখ্য ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’এর অন্যান্য সদস্যরা হলেন, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স এন্ড ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র ফেলো মাহীন সুলতান, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফৌজিয়া করিম ফিরোজ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কল্পনা আক্তার, নারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হালিদা হানুম আক্তার, বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরুপা দেওয়ান, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র সামাজিক উন্নয়ন উপদেষ্টা ফেরদৌসী সুলতানা, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নিশিতা জামান নিহা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদৃঢ়তার জয় গান: বিবিসি হানড্রেড উইম্যান ২০২৪
পরবর্তী নিবন্ধসাতকানিয়ায় মানসিক প্রতিবন্ধীকে ধর্ষণ, ধর্ষক গ্রেফতার