নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত প্রশংসাযোগ্য

| শনিবার , ২৮ মার্চ, ২০২৬ at ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন মামলায় সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থা সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের অগ্রাধিকার হিসাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১৭ মার্চ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সব মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত অ্যাকশনে যাওয়ার এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. নাসিমুল গনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মন্ত্রিসভা সুয়োমুটো একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ধর্ষণ মামলা যেগুলো আছে বা এর আগে হয়েছে, এগুলোর জন্য একটা বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সব মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে এ পদক্ষেপ নেবে। বৈঠকে আন্তঃসংস্থা সমন্বয় বাড়ানো, জনসচেতনতা তৈরি এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিটি জেলায় বিশেষ আদালতের কার্যক্রমও জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক ব্যাধি। নারীর প্রতি পুরুষের অধঃস্তন ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর উন্নয়নকে ব্যাহত করছে। এ অবস্থায় নারীর সমঅধিকার নিশ্চিতে ছাত্রসমাজকে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে।’ তাঁরা বলেন, সহিংসতার ঘটনা কেবল নারীর জীবনকেই বিপন্ন করে না; বরং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অগ্রগতিতে বাধা দেয়। তাঁরা নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের পাশাপাশি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

বিশ্লেষকরা বলেন, জেন্ডার সমতাপূর্ণ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা, শারীরিকমানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, বহুবিবাহ, যৌন হয়রানি, খুন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। নারীর প্রতি অধস্তন ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, নারীবান্ধব আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ করতে না পারা, বিচারিক কাজে দীর্ঘসূত্রতার ফলে নারীর উন্নয়ন, তথা দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা নির্মূলে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তির অধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্বু এসব ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন ও যথাযথ প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিতে ছাত্রসমাজের ভূমিকাকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে।

নারীর প্রতি পুরুষের যে মনোভাব তা এখনো অনেক নিচে পড়ে আছে। নারী নির্যাতন এখনো অনেকের চোখে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এখন পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা নারীকে আরও বেশি পণ্যে পরিণত করেছে। আসলে নারীকে পুরুষের সমমর্যাদা দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পুরুষের মানসিক বৈকল্য দূর করা। এটা সবচেয়ে জরুরি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অধিকার পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার এক ধরনের অদম্য মনোভাব। এজন্য নারীদের দীর্ঘ লড়াই করতে হবে।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে অনুমান করা যায় যে, বর্তমান সরকার অত্যন্ত নারীবান্ধব। ইতোপূর্বে নারীদের সুরক্ষার জন্য আইন ও নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। আরও অনেকভাবে বর্তমান সরকার এ ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে। আসলে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী। তাদের কথা গুরুত্বের সঙ্গে না ভেবে সামনে এগোনো যাবে না। নারীপুরুষ সবাই সমান। তা বিবেচনা করে আগামী দিনে কীভাবে নারী নির্যাতন বন্ধ করা যায় সে বিষয়ে একটি দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

অস্বীকার করা যাবে না যে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় আমাদের অনেক ভালো আইন আছে। এখন আইনগুলোর প্রয়োগের জায়গায় জোর দেওয়া জরুরি। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে হবে। নারী নির্যাতন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না, তাও তদারক করা ও জবাবদিহির বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নারী নির্যাতনের পেছনে কেবল আইনি দুর্বলতা নয়, সামাজিক মানসিকতা, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিও দায়ী। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের থেকে শুরু করে তদন্ত ও বিচারপ্রতিটি ধাপেই ভুক্তভোগীদের নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে অপরাধীরা অনেক সময় পার পেয়ে যায়, যা নতুন অপরাধকে উৎসাহিত করে। এই প্রেক্ষাপটে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জনসচেতনতা তৈরির বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত খুবই প্রশংসনীয় একটা উদ্যোগ। এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন জরুরি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে