ভোটাধিকার একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় সুযোগ–সুবিধা ভোগের আইনগত পন্থা। নাগরিক সত্তার পরিপূর্ণতা আসে ভোটাধিকারের মাধ্যমে। একজন নাগরিককে কেবল নাগরিক হিসেবেই দেখার প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে রাষ্ট্র। নারী–পুরুষ তথা যেকোনো ব্যক্তিই একজন নাগরিক হিসেবেই দায়বদ্ধ থাকে রাষ্ট্রের প্রতি। তবে দীর্ঘসময় ধরে নারী–পুরুষের ভেদাভেদ রাষ্ট্র কাঠামোকেও ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। এর ছায়া পড়েছে প্রত্যেক ক্ষেত্রে। তবে আপাতত বলা যায়, ভোটাধিকার ছিল সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং একক মজবুত ভিত্তি৷
এক সময় নারীকে মনে করা হতো অনুভূতির মানুষ, যুক্তির নয়। তাকে মনে করা হতো সংসারের রক্ষক, কিন্তু সমাজের নির্মাতা নয়। এই ধারণা শুধু সামাজিক নয়, রাষ্ট্রের চিন্তার মধ্যেও রয়ে গেছে। ফলে নারী রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও, পূর্ণ নাগরিক হয়ে উঠতে পারেনি। সমাজের প্রারম্ভিক ভিত্তি প্রস্তরে যেখানে নারীর হাতের বুনন রয়েছে, সেখানে প্রতি ক্ষেত্রেই নারীকে দেওয়া হয়েছে শিকল। এই তালা আর চাবির ব্যবধানে সমাজ তার ক্ষমতার চর্চা করেছে নিজের মতো করে, নিজের জন্যে। নারী কখনো রাজনীতির বাইরে ছিল না, বিমুখ থাকেনি বিনির্মাণে। কিন্তু ধর্মীয়, সামাজিক বিধির জালে আটকে রাখা হয়েছে তার মনন। এই অদৃশ্যমান উপস্থিতির সুফল তো হয়নি, দিনে দিনে সমাজ পিছিয়েছে শুধু। শ্রম, ত্যাগকে স্বাভাবিকতার একক পতাকা ধরে নেওয়া হয়েছে, মতামত ছিল নিষ্প্রয়োজন। দীর্ঘসময়ের এই স্তব্ধ পরিবেশে দমবন্ধে কতশত প্রাণ ছটফট করেছে।
কিন্তু দিন বদলেছে, সময়ের সাথে নারীও তার সমস্ত দেনা নিয়ে হিসাব খুলেছে।
আজ হয়তো ভোট দেওয়া স্বাভাবিক এক ঘটনা, তবে দীর্ঘসময় আন্দোলন ও বহু ত্যাগের পরই এই অধিকার অর্জন হয়।
ভোট মানে শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন নয়। ভোট মানে নিজের জীবনের ওপর প্রভাব রাখার সুযোগ। যে সিদ্ধান্ত সংসদে নেওয়া হয়, তা নারীর শ্রম ও নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। যে সংসদ মাতৃত্বকালীন ছুটি ঠিক করে, সেই সংসদে নারীর কণ্ঠ না থাকলে আইন একপেশে হয়। যে সংসদ ধর্ষণ আইন তৈরি করে, সেখানে নারী অনুপস্থিত থাকলে ন্যায়বিচার দুর্বল হয়। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে এসব সিদ্ধান্তে নারীর কোনো ভূমিকা ছিল না। নারী ভোটাধিকার আসলে একটি প্রশ্নের উত্তর–রাষ্ট্র কি নারীকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখে?
প্রাচীন এথেন্সে গণতন্ত্র ছিল, কিন্তু নারীরা ভোট দিতে পারত না। রোমান সাম্রাজ্যেও একই চিত্র। মধ্যযুগে ইউরোপে নারীকে রাজনৈতিকভাবে অযোগ্য ভাবা হতো। তাকে বলা হতো আবেগপ্রবণ, সিদ্ধান্তহীন। ১৮শ ও ১৯শ শতক পর্যন্ত ইউরোপ ও আমেরিকায় ভোটাধিকার ছিল মূলত সম্পত্তিশালী পুরুষদের জন্য। নারী সেখানে নাগরিক নয়, নির্ভরশীল হিসেবে বিবেচিত হতো।
নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের সূচনা হয় ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি। ১৮৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত Seneca Falls Convention ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সেখানে প্রথমবার সংগঠিতভাবে নারীরা ভোটাধিকার দাবি করে। যুক্তরাজ্যে আন্দোলন জোরালো হয় ১৯০০ সালের পর। Emmeline Pankhurst–এর নেতৃত্বে Suffragette আন্দোলন রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানায়। নারী আন্দোলনকারীরা গ্রেপ্তার হন, অনশন করেন, এমনকি কারাবরণ করেন। সমাজ তাদের “উগ্র” বলেছিল, কিন্তু ইতিহাস তাদের ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করেছে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাষ্ট্রের বাস্তবতা বদলে যায়। পুরুষরা যুদ্ধে গেলে নারীরা কারখানা, হাসপাতাল ও প্রশাসনে দায়িত্ব নেয়। তখন রাষ্ট্র বুঝতে পারে–নারী অক্ষম নয়। এর ফল হিসেবে যুক্তরাজ্যে ১৯১৮ সালে ৩০ বছরের বেশি বয়সী নারীরা ভোটাধিকার পায়। ১৯২৮ সালে তা পূর্ণ সমতা পায়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯২০ সালে 19th Amendment এর মাধ্যমে নারীরা ভোটাধিকার অর্জন করে।
ভারতীয় উপমহাদেশে নারী ভোটাধিকার আসে ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে। ১৯৩৫ সালের Government of India Act নারীদের সীমিত ভোটাধিকার দেয়। তবে সামাজিক বাধা ছিল প্রবল। বাংলা সমাজে নারী জাগরণে বড় ভূমিকা রাখেন বেগম রোকেয়া। যদিও তিনি সরাসরি ভোট আন্দোলন করেননি, তার লেখায় রাজনৈতিক সচেতনতার বীজ ছিল। নারীকে চিন্তা করতে শেখানোই ছিল তার মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমান ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়। এটি ছিল একটি সাহসী এবং প্রগতিশীল সিদ্ধান্ত। বর্তমানে বাংলাদেশে নারী ভোটার সংখ্যা পুরুষের কাছাকাছি। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়–এই ভোট কতটা স্বাধীন? গ্রামাঞ্চলে অনেক নারী ভোট দিতে যান পরিবারের নির্দেশে। যেমন কিছুদিন আগেই দেখা গেছে, একজন লোক বলছেন, আমার স্ত্রী আমার অধীনে, সে তো আমার কথার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোথাও সামাজিক চাপ, কোথাও ভয়, কোথাও সহিংসতার আশঙ্কা নারীর পছন্দকে সীমাবদ্ধ করে।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে নারী ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি ছিল। কিন্তু একই সময়ে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল কম। অর্থাৎ নারী ভোটার আছে, কিন্তু নেতৃত্বে নারী কম। স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত আসন নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ালেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সবসময় সমান নয়। অনেক নারী প্রতিনিধি নিজেই বলেন, তাদের মতামত গুরুত্ব পায় না।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবারো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এবছর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা অন্যতম দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি এন পি) মোট প্রার্থী ঘোষণা করেছে ২৯২ টি আসনে যেখানে মাত্র ১০–১২ আসনেই নারী প্রার্থী রয়েছেন৷ আবার নতুন রাজনৈতিক দল এনসি পি (ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি) মাত্র ৩ জন নারী প্রার্থী ঘোষণা করেন। যদিও জামায়াতে যোগদানের কারণে তাদের বেশিরভাগ নারী প্রার্থীরা পদত্যাগ করেন। এছাড়া বাংলাদেশে জামায়াত–ই ইসলামি দল কোনো নারী প্রার্থীই ঘোষণা করেননি। অর্থাৎ দেশে আলোচিত তিনটি দলই নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি প্রতিবন্ধকতামূলক আচরণ করছে। যেখানে মোট ভোটারের ৪৯.৩% ই নারী ভোটার। সেখানে এত বিশাল সংখ্যক নাগরিককে উপেক্ষা করে নির্বাচন হলেও তা কতটা দেশের কল্যাণে আসবে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, নারী ভোটাররা সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও দুর্নীতির মতো বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ নারীর ভোট রাজনীতির আলোচনাকে মানবিক করে। যখন নারী ভোট দেয়, তখন রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বদলাতে বাধ্য হয়। মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নারী নির্যাতন আইন, শিক্ষা নীতিতে পরিবর্তন–এসবের পেছনে নারীর ভোট একটি বড় শক্তি।
তাছাড়া ভোট দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। নিরাপদ ভোটকেন্দ্র, রাজনৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক সমর্থন–এসব ছাড়া ভোটাধিকার অসম্পূর্ণ। নারীকে কেবল ভোটার নয়, নেতৃত্বের অংশ করতে হবে। রাজনীতি যদি নারীর জন্য নিরাপদ না হয়, তাহলে গণতন্ত্রও নিরাপদ নয়। ভোট একটি কাগজ হতে পারে। কিন্তু নারীর হাতে তা হয়ে ওঠে কণ্ঠস্বর। আর সেই কণ্ঠস্বরই গণতন্ত্রকে জীবিত রাখে।












