নারী উন্নয়ন শুধু নয়, মানব উন্নয়নে হোক সমষ্টিগত চিন্তার প্রতিফলন

অঞ্জলি বড়ুয়া | রবিবার , ৮ মার্চ, ২০২৬ at ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ

নারী শ্রমিকের অধিকার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৯০৮ সাল থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত অনেক ত্যাগ সংগ্রামের পর ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ ৮মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করেন। যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল নারীর সমস্ত রকমের রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক অধিকার, সমতা ও লিঙ্গ ভেদ দূর করা।

কিন্তু এত বছর পরেও এত লেখালেখি, আন্দোলন, নীতিমালা প্রণয়ন, নারী সম্মেলন করেও তা পুরোপুরি অর্জন হয়েছে কি? হয়নি। এখনো নারীরা পদে পদে নির্যাতিত ও বঞ্চিত সবক্ষেত্রেই। সেটা আমাদের দেশে হোক বিদেশে হোক, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় হোক, পারিবারিক কারণে অকারণে হোক, কর্মক্ষেত্রে হোক সবক্ষেত্রেই। সেটার একমাত্র কারণ আমি মনে করি নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়। চেতনা ও মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি আমাদের।

নারী তবুও বহতা নদীর মত বয়ে চলেছে নিরন্তর। নিজ আলয়ে, নিজ ভুবনে নিজ কর্তব্য পালনে, নিজের আত্মউন্নয়নে, নিজেকে স্বাবলম্বী করার যুদ্ধে, অর্থনৈতিক স্বাধিকার আদায়ে, সমাজ ও রাষ্ট্র উন্নয়নে। কিন্তু এক পা এগিয়ে গেলে দশ পা পিছিয়ে যেতে হয়েছে নারীকে। পিছিয়ে যেতে গিয়ে আত্মবিসর্জন দিয়ে গেছে নারী প্রতিবার, বার বার। বৃত্তের বাইরে পা রাখা কঠিন থেকে কঠিন সাধনায় ব্যাপৃত এখনো নারী। নারী এখনো নির্যাতিত হয় ঘরে বাইরে।

এখন ধর্ষণ, খুন, রাহাজানি, যুদ্ধে নারী সংসিসতা, ইমোশনাল এব্যুসমেন্ট, সুসাইড, অকারণ বর্বরতা, চলতেই আছে, কিছু বিচার অনেক চরাই উৎরাই পেরিয়ে পাওয়া গেলেও অনেক অনেক ঘটনা চাপা পড়ে যায়। আমরা ভুলে যাই সবকিছু যেন সবকিছু ঠিকঠাক, কোন ব্যাপার না এগুলো, সবাই নিজের স্বার্থসিদ্ধি তো ব্যস্ত। আসলে স্বার্থটা কি আমরা নিজেরাই জানিনা।

একজন নারী যদি কোন চাকুরি বা কর্মজীবী নাও হয়, একজন গৃহিণীর কাজের কোন পরিমাপক এখনো সৃষ্টি হয়নি, যা অতুলনীয়। নিজের পরিবারের প্রত্যকের সে একজন মা, স্ত্রী, বোন, কন্যা, জায়া রূপে একজন গৃহলক্ষ্মী। তাইতো আমরা বলে এসেছি। সেটাও যদি বলি ভালোবেসে হোক, আধিপত্যে রাখার জন্য হোক তারপরও নারী তো পুরো পরিবারের প্রত্যকের মঙ্গল চায়। পুরো পরিবারকে সমস্ত বিপদের হাত থেকে আগলে রাখে, প্রত্যেকের উন্নতির জন্য নিজের সবকিছু বিসর্জন দেয়। সেই অর্থেও তো আমরা সম্মান করতে পারি, মর্যাদা দিতে পারি। তাও আমরা কুন্ঠিত হই। কোন বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়, পারিবারিক কোন উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু বন্টনের সময়, ক্ষমতা থাকলেও, শিক্ষিত হলেও গৃহকর্ত্রীকে ডাকা হয় না। পরিবারের কন্যা সন্তানটি কি বিষয়ে পড়ালেখা করবে, উচ্চতর শিক্ষা নিতে চায় কিনা, চাকুরি করতে চায় কিনা, কখন সে বিয়ে করবে, বিয়ে হলে কখন সে মা হতে চায় তাও তার সম্মতি নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেনা এখনো পর্যন্ত কেউ। একটি কন্যা সন্তান কোথাও গেলে, সে পড়তে যাক, চাকুরি করতে যাক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাক তাকে বলা হয় সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরবে, আর ছেলে যদি রাত বারোটায়ও বাড়ি ফিরে তাকে কিছু বলা হয়না, সেটা আমরা পরিবার থেকেই বিভেদ তৈরি করে দেই তুমি ছেলে তুমি বাইরে থাকতে পার, তুমি মেয়ে তুমি পারো না।

তার কারণ আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবেশ মেয়েদের স্বাধীনভাবে চলার মত নয়। সেই পরিবেশ আমরা যুগের পর যুগ চলে গেলেও তৈরি করতে পারিনি। আইন করে, সংবিধানে সমতা রক্ষার ধারা রেখেও পারিনি। কারণ আমরা বদলাইনি, আমাদের চেতনায় নারী নীচে থাকবে, পর্দা করবে, নারীর সবক্ষেত্রে যাওয়ার, সবকিছু পাওয়ার নয় এই তামাদি মানসিকতা রয়ে গেছে আমাদের মজ্জায় পুরুষতান্ত্রিক বৃত্তাবদ্ধ হয়ে।

সবচেয়ে উল্লেখ্য যে নারী শিশু হোক, কিশোর হোক বৃদ্ধ হোক কোথাও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নাই, তাই নারী নিজেকে শত চেষ্টা করেও নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারেনা, নিজের ক্ষমতা দেখাতে পারেনা, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে এখনো সীমাবদ্ধতায় ভোগে। তাহলে আমরা কিভাবে বলবো নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে,নারী স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে। এত এত অবদান নারীর সর্বক্ষেত্রে তা কিঞ্চিৎ পরিমাণ হয়েই রয়ে গেল সবার কাছে।

তাই নারীরা আজও এত ত্যাগ সংগ্রাম করেও নিজের আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে পারছেনা। পথে, বিপথে, রাস্তায়, ঘরে, বাইরে কর্মস্থলে হেনস্থার শিকার হচ্ছে। নারী নির্যাতন বন্ধ হয়নি। ধর্ষণ, খুন, আত্মহত্যা হয়েই যাচ্ছে।

আমরা যতই নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার আদায়ের কথা বলিনা কেন তা কার্যকর হবেনা যদি আমাদের তামাদি মানসিকতার পরিবর্তন না করি এবং আমরা প্রত্যেক নারী পুরুষ সবাই একই মানসিকতা একই দাবী নিয়ে এগিয়ে না আসি। তার জন্য প্রয়োজন নারী পুরুষ একসাথে সবার মনোচেতনায় জাগ্রত হওয়া।

তাই শুধু নারী উন্নয়ন নয় নারী পুরুষ সবার একসাথে উন্নয়ন দরকার। মানব ও মানবিকতার বিকাশ একসাথে না হলে মানব উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী অধিকার আদায়, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীদিবস হোক পুরুষেরও। আমরা চাই এ ব্যাপারে পুরুষেরা আরও অগ্রগামী ভূমিকা রাখুক।

মানব উন্নয়ন আসলে ঘটাতে গেলে কয়েকটি বিষয় আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নারী পুরুষ সবাই কে সেদিকে সমভাবে একসাথে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন : . ছেলে মেয়ে ভেদাভেদ না করে পরিবার ও স্কুল থেকেই নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। ২. নারী পুরুষ সবাইকে সমান মেধায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ৩. প্রত্যেক পিতা,ভাই, স্বামী নিজের পরিবারে নারীদেরসহ সকল নারীকে সমানভাবে সম্মান করতে হবে। ৪. নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে অপরাধীদের তাৎক্ষণিক শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে ৫. যারা ধর্ষক ও বিপথগামীতায় বিচরণ করে( একটু চোখ কান খোলা রাখলেই আমরা দেখতে পাবো)তাদের চিহ্নিত করে মোটিভেশানাল শোধানাগারে নৈতিক শিক্ষায় সচেতন করতে হবে। ৬. গৃহিনীর কাজের স্বীকৃতি ও মূলয়ায়ন করতে হবে, গৃহিণীর কাজকে গৃহ ব্যবস্থাপক বা হোম মেকারের দায়িত্ব মনে করে সকলেই ঘরের কাজে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৭. নারী শিক্ষায় অগবর্তী রেখে বাধ্যতামূলক করতে হবে, মানব উন্নয়নে নারী পুরুষ শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। ৮. নারী পুরুষ উভয়ের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা স্বীকৃত করে সেভাবে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি করার বিধান কার্যকর করতে হবে। ৯. নারী পুরুষ একসাথে উন্নয়নের জন্য গুড গভর্ন্যান্স, সরকারি নীতিমালা, সামাজিক সংগঠন, উন্নয়নকামী সংগঠন গুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার ও বাস্তবায়নে প্রত্যেকের সচেতন ভাবে মনোযোগী হতে হবে। ১০. নারীদের আরও আত্মসচেতন, আত্ম মর্যাদা রক্ষায়, নিজের অধিকার গুলো সম্পর্কে নিজেদের জানতে হবে, নারীর সব ধরনের স্বকীয় মর্যাদা নারীদের নিজেকেই মেনে চলে বিনয়োচিত আচরণে আন্দোলন করে যেতে হবে। সহযোদ্ধা হিসেবে পুরুষদের সাথে রাখতে হবে। যখন নারী দিবসে নারীপুরুষ একসাথে আনন্দের সাথে উদযাপন করে বলবে আমরা ঐক্যবদ্ধ সকল বিষয়ে, তখনই মনে করবো আমরা সভ্য জাতি। তখন আমরা একসাথে দেশ ও জাতির উন্নয়নে আরও এগিয়ে যেতে পারবো।

লেখক : শিক্ষাবিদ, কবি ও প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ
পরবর্তী নিবন্ধসিটি মেয়রের সাথে দক্ষিণ কাট্টলী মহাতীর্থ বারুণী স্নান পরিচালনা পরিষদের মতবিনিময়