পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন, একটি ভাষিক গোষ্ঠীর মধ্যে নারীপুরুষ থাকে; ভাষায় নারীপুরুষ সূচক কিছু ভাষিক বৈশিষ্ট্য থাকে, এটা সার্বজনীন। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা, অফিসিয়াল ভাষা বাংলা, জনজীবনের ভাষাও মূলত বাংলা। বাংলাদেশ বাংলা ভাষা কেন্দ্রিক একক ভাষিক রাষ্ট্র (মনোলিঙ্গুয়াল কান্ট্রি)। তবে এ বাংলা ভাষায় সাধুরীতি, চলতিরীতি, আঞ্চলিকরীতি ও মিশ্ররীতি বিদ্যমান। বাংলা ভাষায় নারী–পুরুষ ভাষারীতি বলে কি কোনো রীতি আছে? নারীর ভাষা, পুরুষের ভাষা কি আলাদা? ভাষাবিজ্ঞানের শাখা সমাজভাষাবিজ্ঞানে নারী–পুরুষের ভাষার বিশেষ ভাষিক বৈশিষ্ট্যের আলোচনা পাওয়া যায়। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর সমতার এ যুগে নারীরা নারীর আলাদা ভাষাকে অর্থাৎ লিঙ্গভিত্তিক ভাষাকে মানতে চান না; এটাকে ভাষিক পিতৃতান্ত্রিকতা বলে অবহিত করেন। প্রাণপুরুষ বা পুরুষসিংহ এমন শব্দের বিপরীতে নারীবাচক শব্দ পাওয়া যায় না; যাদিও এখন চেয়ারম্যান এর পরিবর্তে চেয়ারপারসন স্বীকৃতি পাচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, নারীপুরুষের ভাষা উচ্চারণে জীবতাত্ত্বিক একটি ভিত্তি আছে; অর্থাৎ কন্ঠমণি বা অ্যাডামস অ্যাপেলের গঠন স্বতন্ত্র্য হওয়ায় নারীপুরুষের কন্ঠ দ্বারা উচ্চারিত শব্দ–বাক্য স্বতন্ত্র্যরূপ ধারণ করে থাকে। তাই নারীপুরুষের কন্ঠস্বর আলাদা। মানুষের ভাষা অজর্নের ক্ষমতা সহজাত, স্বভাবজাত; তবে ভাষা বিকাশে সমাজের বা পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম। সমাজ ছাড়া, পরিবেশ ছাড়া মানুষ তার ভাষিক ক্ষমতা বিকশিত করতে পারে না। মানুষ যে পরিবেশে থাকবে সে–পরিবেশের ভাষা সে আয়ত্ত করবে এটাই স্বাভাবিক ও বৈজ্ঞানিক। সামাজিক কারণেই ভাষাবৈচিত্র্য হয়। প্রাচীন নাটকে পুরুষ কথা বলে সংস্কৃতে আর নারী প্রাকৃতে। যাইহোক, এ নিবন্ধ নারীর ভাষার স্বরূপ ও এতৎসংক্রান্ত পর্যেষণার একটি সমীক্ষা বা নিরীক্ষার পথে অগ্রসর হবে।
বাংলাদেশে নারীপুরুষ নির্বিশেষে বাংলাভাষায় কথা বলে বা জীবনের সর্বক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকে। তবে নারীপুরুষের ভাষায় কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকায় নারীর ভাষা, পুরুষের ভাষা ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা রূপে প্রতিফলিত হয়; ভাষাবিজ্ঞানীদের এমনই ধারণা, তার আগে এমন ধারণা পোষণ করত নৃবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা। তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের অগ্রপথিকগণের অন্যতম ড. সুকুমার সেন বলেন:
‘‘প্রচীন যুগ থেকে আরম্ভ করে আজ অবধি সব সমাজেই নারী ও পুরুষের মধ্যে যথেষ্ট সামাজিক ব্যবধান আছে। অবশ্য এই ব্যবধান সর্বত্র সমান নয়। পুরুষ ও নারীর কর্মক্ষেত্র আর শিক্ষা–দীক্ষা সম্পূর্ণরূপে আলাদা বলেই এই পার্থক্যের উদ্ভব। আর এই জন্যে সকল দেশেই নারী ও পুরুষের ভাষার কমবেশি পার্থক্য রয়ে গিয়েছে। কোথাও কম, কোথাও বেশি। সভ্য জগতে, যেখানে নারী ও পুরুষের কর্মক্ষেত্র প্রায় এক হয়ে এসেছে বা আসছে, সেখানে এ পার্থক্য খুবই কম দেখা যায়। কিন্তু অসভ্য সমাজে যেমন প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের মধ্যে এই পার্থক্য খুবই সুস্পষ্ট।’’ আজ থেকে প্রায় একশত বছর আগে বাঙলায় নারীর ভাষা (১৯২৭) শীর্ষক প্রবন্ধে এ কথা বলে গেছেন। নারীর ভাষা নিয়ে তিনিই প্রথম বৈজ্ঞানিক ও বৈয়াকরণিক আলোচনা করেছেন বাংলা ভাষায়। এ বিষয়ে একটু বিশদ আলোচনা পরে উত্থাপিত হবে।
নারীর ভাষাকে সমাজভাষাবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ বা আলোচনা করতে চাইলে প্রথমে জানতে হবে নারীর ভাষার বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ অর্থাৎ সমাজভাষাবিজ্ঞান নারীর ভাষার কোন্ কোন্ বিষয় বা বৈশিষ্ট্যগুলোকে বিবেচনায় নেয় কিংবা নারীর ভাষার কোন্ কোন্ সামাজিক ও ভাষিক বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনায় স্থান দেয় অথবা কীভাবে–কেন তাদের ব্যবহৃত ভাষায় কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ভাষিকরীতি গড়ে ওঠে? বলা হয়, এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণ কিছুটা শারীরিক ও মানসিক এবং কিছুটা নারীপুরুষের সামাজিক অবস্থানগত। নারীর ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছেন দেশ–বিদেশের এমন সকল ভাষাবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী প্রায় একমত হয়ে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন যার নিষ্কর্ষিতরূপ পাওয়া যায় ড. নির্মল দাসের পর্যেষণায়। তিনি তার প্রবন্ধ সংকলন গ্রন্থ বহুব্রীহি (২০১৫)-তে নারীর ভাষা সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধকে স্থান দিয়েছেন যা তার ব্যক্তিগত স্মৃতি ও ক্ষেত্রসমীক্ষার উপর নির্ভর করে রচিত; উত্তরবঙ্গের নারীর ভাষা শীর্ষক এই প্রবন্ধে উদাহরণসহ চমৎকারভাবে নারীর ভাষার স্বরূপের সারসংক্ষেপ করেছেন। তিনি বলেন: ‘‘মেয়েরা তাদের প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার জন্য কিছুটা রক্ষণশীল, তাই তাদের শব্দভান্ডারও অনেকখানি রক্ষণশীল, অর্থাৎ মেয়েদের কথায় এমন অনেক শব্দ ও ইডিয়ম পাওয়া যায় যা সেই সময়কার পুরুষের ভাষায় দুষ্প্রাপ্য ও অপ্রচলিত। সিসেরো–র একটি প্রচলিত উক্তির মধ্যে Jespersen মেয়েলি ভাষার এই রক্ষণশীলতার ইঙ্গিত পেয়েছেন। আবার মেয়েদের ভাষা রক্ষণশীল বলেই পুরুষেরা যে পরিমাণে নতুন কথা নিত্য ব্যবহার করে, মেয়েরা নতুন কথা তত আয়ত্ত করে না। তাই মেয়েদের শব্দভান্ডার পুরুষের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কৃশ। আবার শারীরিক–মানসিক উৎকর্ষের জন্যই হোক বা অন্য যে কারণেই হোক প্রগতির আহবানে পুরুষেরাই প্রথম সাড়া দেয়,সেজন্য কিছু কিছু আদিম আচার ও সংস্কার নারীর মনোজীবনের আশ্রয়েই দীর্ঘস্থায়ী হয়। মেয়েদের এই আপেক্ষিক আদিমতার জন্য প্রায় সব দেশের মেয়েদের বাগব্যবহারে কতকগুলি সাধারণ বাচনিক নিষিদ্ধতা (verbal taboo) প্রতিপালিত হয়, যেমন, স্বামী বা গুরুজনের প্রকৃত নামোচ্চারণের পরিবর্তে তার সর্বনাম, প্রতিশব্দ বা রূপকার্থজ্ঞাপক শব্দ ব্যবহার, অমঙ্গলসূচক শব্দোচ্চারণে ভীতিবোধ ও প্রতিশব্দ–সন্ধান। শুধু অনুন্নত সমাজেই নয়, সভ্য সমাজেও হীনমন্যতাবোধ, লজ্জাশীলতা ও শারীরিক–মানসিক কোমলতা হেতু মেয়েরা কিছু কিছু শব্দের সরাসরি ব্যবহারে সংকোচ বোধ করেন। শব্দভান্ডারের এই দারিদ্র্য, লজ্জাতুরতা ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার জন্য মেয়েদের কথায় শ্বাসাঘাত ও স্বরাঘাত প্রাধান্য লাভ করে। এই স্বরাঘাত ও শ্বাসাঘাতের সাহায্যে মেয়েরা কথার অন্তর্নিহিত আবেগ বা ভাবকে একটা নির্দিষ্ট দিকে চালিত করার চেষ্টা করে। এই একই কারণে মেয়েদের ভাষায় তীব্রতাসূচক ও অনুভবদ্যোতক অব্যয় ও বাক্যাংশের আধিক্য। ভাবের তুলনায় শব্দ কম ও শ্বাসাঘাত–স্বরাঘাত বেশি বলে সাধারণ কথোপকথনে পুরুষের চেয়ে মেয়েদের বাক্যই পরিমাণে বেশি অসমাপ্ত থাকে, সুতরাং অসম্পন্ন বাগব্যবহার নারীর ভাষার আর একটি আপেক্ষিক বৈশিষ্ট্য। এছাড়া মেয়েরা ভাবপ্রকাশ করতে গিয়ে তীব্রতাসূচক ঝোঁক দেওয়া শব্দ বা শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের পক্ষপাতী বলে তারা এশাধিক বাক্যাংশ–নির্ভর দীর্ঘ মিশ্র বাক্য ব্যবহারে তেমন অভ্যস্ত নয়, কিন্তু পুরুষেরা শব্দভান্ডারের আপেক্ষিক সমৃদ্ধির জন্যই হোক অথবা ভাবপ্রকাশের ব্যাপারে কিছুটা চিন্তা বা বুদ্ধিনির্ভর হওয়ার জন্যই হোক এশাধিক বাক্যাংশ–নির্মিতি একটি জটিল বাক্য ব্যবহারে অসুবিধা বোধ করে না। মেয়েদের দীর্ঘবাক্য সেদিক থেকে আসলে সংযোজক অব্যয় দিয়ে জোড়া–দেওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাক্যের সংকলনবিশেষ। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলে উভয় ভাষার মধ্যে সাধারণ স্তরে আরো অনেক তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রভেদ ধরা পড়বে, তাদের কোনোটি চূড়ান্ত, কোনোটি–বা দেশকালপাত্রভেদে আপেক্ষিক।’’ নারীপুরুষের ভাষার পার্থক্য এসব কারণে হয়ে থাকে এবং সুকুমার সেন ও নির্মল দাস উদাহরণ দিয়ে তা বিশদভাবে দেখিয়েছেন তাদের প্রবন্ধে। নির্মল দাস উত্তরবঙ্গের ভাষা থেকে উদাহরণ আহরোণ করলেও সুকুমার সেন তা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের নারীর ভাষা থেকে।
বাংলাদেশে তথা বাংলায় নারীর ভাষা গবেষণার পূর্বাপর তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নারীপুরুষের ভাষার ধ্বনিগত দিক নিয়ে গবেষণা যতটুকু হয়েছে, শব্দগত ও বাক্যগত বিষয়ে গবেষণার পরিমাণ এখনও অপ্রতুল। বলা যায়, নারীর ভাষা নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রথম গবেষণা করেন অটো য়েসপারসন, ১৯২২ সালে। তার কিছু দিন পরে পশ্চিমবঙ্গের নারীর মুখের ভাষা নিয়ে গবেষণা করেন ড. সুকুমার সেন, ১৯২৭ সালে, যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে; এবং ১৯২৮ সালে Women’s Dialect in Indo-Aryan শীর্ষক অতি দীর্ষ ও তথ্যবহুল প্রবন্ধ রচনা করেন যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যলয়ের জার্ণাল অব লেটারস–এ প্রকাশিত হয়েছিল। তার পঞ্চাশ বছর পর এটি Women’s Dialect in Bengali নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটিতে ১৫টি অধ্যায়ে প্রাচীন ইন্দো–ইউরোপীয় ভাষা থেকে নব্য ইন্দো–ইউরোপীয় ভাষার বাংলা ভাষা কেন্দ্রিক নারীর ভাষার একটি বৈয়াকরণিক কাঠামো নির্মাণ করেছেন যা আজও অদ্বিতীয়। এবং এপর্যন্ত এ বিষয়ে যতটুকু গবেষণা হয়েছে তা সুকুমার সেনের দেখানো মডেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। সুকুমার সেন তাঁর এ গবেষণায় প্রাচীন, মধ্য ও নব্য ভারতীয় আর্যভাষার উদাহরণ আহরণ করেছেন বৈদিক সাহিত্য থেকে আর বাংলা ভাষার তথ্য–উপাত্ত সংগৃহীত হয়েছে পশ্চিম বঙ্গেও হাওড়া–হুগলী–বর্ধমান–চব্বিশ পরগনার নারীদের মুখের ভাষা থেকে। অর্থাৎ সাহিত্য ও ক্ষেত্রসমীক্ষা উভয় ধারার মাধ্যমে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল; এরূপ মডেলে বৃহৎ পরিসরে আর কোনো গবেষণাকর্ম এখনও পরিলক্ষিত হতে দেখা যায় না। উক্ত গবেষণাকর্মটিতে বাংলাদেশের নারীর ভাষার কোনো তথ্য–উপাত্ত নেই। আমরা জানি, অঞ্চলভেদে ভাষার আলাদা রূপ হয় তেমনি ধর্ম–সংস্কৃতি, শিক্ষা–পেশা, ধনী–গরিব ইত্যাকার সামাজিক স্তরবিন্যাসের চলক বা কারণেও ভাষার আলাদা রূপ হয়। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ব ও উত্তর সাহিত্যে প্রতিফলিত ও অঞ্চলভেদসহ অন্যান্য চলক বা কারণে নারীর মুখের ভাষার ভিন্ন ভিন্ন উপাত্ত নিয়ে গবেষণার যথেষ্ট অবকাশ আছে।
সুকুমার সেনের বাঙলায় নারীর ভাষা (১৯২৭) প্রবন্ধ প্রকাশের পঞ্চাশ বছর পূর্বে নারীর ভাষা নিয়ে গবেষণা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন মৃণাল নাথ তার ভাষা ও সমাজ (১৯৯৯:৯৬) গ্রন্থে। তিনি বলেন: “এরও পঞ্চাশ বছর পূর্বে আমাদেরই দেশে সারদাচরণ মিত্র (১৮৭২) তাঁর ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক একটি প্রবন্ধে বাংলাদেশের নারীর ভাষায় যে প্রভেদ আছে তা তিনি উল্লেখ করলেও বিস্তারিত আলোচনা করেন নি।” অর্থাৎ ভাষাভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্য ও তার গবেষণা সকল শাখায় স্বকীয় ধারা গড়ে তুললেও ভাষাবিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখা, যেমন, সমাজভাষাবিজ্ঞান, মনোভাষাবিজ্ঞান, নৃভাষাবিজ্ঞান, স্নায়ুভাষাবিজ্ঞান, কম্পিউটরীয় ভাষাবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণা–পর্যেষণা আশানুরূপ অগ্রগতি লাভ করে নি। সুকুমার সেন তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের ধারায় প্রথাগত ব্যাকরণের আলোকে নারীর ভাষার যে অসাধারণ পান্ডিত্যপূর্ণ পর্যেষণা, তার পূর্বে অটোয়েসপারসন কিংবা ফিশার (১৯৫৮), লেবোভ (১৯৬৬), ট্রাডগিল (১৯৭৫) প্রমুখ আধুনিক ধারায় অর্থাৎ সমাজভাষাবিজ্ঞানের ধারায় বাস্তব জীবনের মুখের ভাষা নিয়ে যে–গবেষণার সূত্রপাত হয়েছিল তা আজও আমাদের পথ দেখায়।
বাংলাদেশে নারীর ব্যবহৃত মুখের ভাষা কিংবা বাংলাদেশের সাহিত্যের পাতায় পাতায় যেভাবে নারীচরিত্র–নারীভাষা প্রতিফলিত হয়েছে সে তথ্য–উপাত্ত নিয়ে উভয় ধারায় গবেষণা করার সুযোগ আছে। এবিষয়ে এখনও পর্যাপ্ত ও উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম কম; তবে এ বিষয়ে যে কয়েকটি গবেষণাকর্ম লক্ষণীয় তার মধ্যে ড. নির্মল দাস, মৃণাল নাথ, রাজীব হুমায়ুন প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ। এয়াড়া বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রতিফলিত নারীর ভাষা নিয়ে আলোচনা করেছেন সরকার আবদুল মান্নান (২০১৭) এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি একাডেমিক গবেষণা করেছেন ড. সোহানা বিলকিস বাংলাদেশের উপন্যাস: নারীর ভাষা প্রসঙ্গ (২০১৪) শিরোনামে যেখানে নারীর উচ্চারিত বাক্যে শ্বাসাঘাত ও স্বরাঘাতের বিশ্লেষণ করা হয়েছে যা এক্ষেত্রে নতুন ধারার সূত্রপাত বলা যায়।
বাংলাদেশের সমাজে নারীর সামাজিক স্তর বিন্যাস, ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, কর্ম–পেশা, অঞ্চল, বয়স প্রভৃতি বিষয় ভিত্তিক নারীর ভাষাবৈচিত্র্য কীভাবে বিরাজমান তা তুলে আনতে পারলে আমাদের সমাজে ভাষিক ক্ষমতায়নে কতটুকু হয়েছে তা নিরূপণ যেমন করা যাবে তেমনি সমাজের অগ্রগতির মাপকাঠি নির্ণয় করা যাবে নিঃসন্দেহে। পরিশেষে বলা যায় প্রায় একশত কিংবা দেড়শত বছর পূর্বে সূচিত নারীর ভাষা নিয়ে আলোচনা–বিশ্লেষণ–গবেষণা আজও অপ্রতুল। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এ মাসে এবং মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের এ মাসে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা এ রাষ্ট্রে নারীর ক্ষমতায়নের স্বার্থে এ বিষয়ের গবেষণাকে এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকারই হোক আমাদের ব্রত। উল্লেখ্য যে, আধুনিক শিক্ষা ও কর্ম–পেশার সহঅবস্থান, গ্রাম–নগরের সহজ মিশ্রণের কারণে নারীপুরুষের ভাষিক বৈশিষ্ট্য অনেকটাই সমতার পর্যায়ে এসেছে। তাছাড়া বর্তমান গবেষক শিশুর ভাষা অর্জন প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার সময় লক্ষ্য করেছেন যে সাড়ে তিন বছর পর্যন্ত বয়সের শিশুদের মধ্যে লিঙ্গভেদে ভাষিক পার্থক্য অনুপস্থিত। লিঙ্গভেদে ভাষিক পার্থক্য কখন থেকে শুরু হয় এমন তথ্যও আমাদের হতে নেই।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক।









