নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র বিশ্বজুড়ে একই আদলে

ডেইজী মউদুদ | শনিবার , ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ at ৬:৫২ পূর্বাহ্ণ

নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ শুরু হয়েছে। প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পক্ষকালব্যাপী নানা আয়োজনে এই প্রতিরোধ পক্ষ পালিত হয়। মহিলা পরিষদ ঢাকার নেত্রীরা এই কর্মসূচি পালন উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এই বছরের প্রতিপাদ্য হিসেবে নারী নির্যাতনকে এক কথায় ‘না’ বলার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে সাইবার সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে কিভাবে মুক্ত রাখা যায় বিষয়টিকে বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয় এবং জাতিসংঘ নারীসংস্থা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্মূলে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রতি ১০ মিনিটে বিশ্বে ঘনিষ্ঠজনের হাতে খুন হয় একজন নারী। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০২৪ সালে প্রায় ৫০ হাজার নারী ও মেয়েকে তাদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যরা হত্যা করেছে। এই তথ্যটি আন্তর্জাতিক নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্মূল দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে (তথ্যসূত্র: বাসস), বিশ্বজুড়ে প্রতি ৬০ শতাংশ নারী তার সঙ্গী বা আত্মীয় যেমন বাবা, চাচা, মা কিংবা ভাইদের হাতে নিহত হয়েছে। সেখানে পুরুষদের হাতে সংখ্যাটি ১১%। ১১৭ টি দেশের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, প্রতি বছর ৫০ হাজার নারী, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন এবং প্রতি ১০ মিনিটে ১ জন নারী নিহত হয়। সদ্য প্রকাশিত এই পরিসংখ্যানটি নারীর সহিংসতা এবং লিঙ্গভিত্তিক অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরে। মোট এই সংখ্যা ২০২৩ সালে প্রকাশিত সংখ্যা থেকে সামান্য কম, তবে প্রকৃতপক্ষে কোন হ্রাস নির্ধারণ করে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ দেশভেদে তথ্য সরবরাহের তারতম্যের কারণেই মূলত এই পার্থক্য দেখা গেছে। এই যদি হয় নারী সহিংসতার চিত্র, তাহলে কি করণীয় রয়েছে নারী সমাজের, বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী যারা নারীর সহিংসতা নিয়ে কথা বলেন, তাদেরকেই কঠোর ও প্রায়োগিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে জরুরীভিত্তিতে। এবার আসি, আমাদের দেশের চিত্রে। যে নারী জাতি স্বেচ্ছায় জীবন্ত জ্বলন্ত চিতায় আরোহণ করে নিজের জীবন বিসর্জন দিত আমরা সেই নারীর উত্তরাধিকারী। আমরা সেই নারী জাতি, যাদেরকে আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে জীবন্ত কবর দেয়া হতো, আমরা সেই জাতি, যারা নির্যাতনের প্রতিবাদ করলে ডাইনি আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলতো। এখন খুব সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে, সেই অবক্ষয় আর অন্ধকারের যুগ পেরিয়ে এখন ২১ শতকের গোড়ায় এসেও কি আমাদের নারী সমাজ এখনো পৌঁছাতে পেরেছে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে? সচেতন নারী আর লড়াক্কু নারী এর উত্তরে একবাক্যে বলবেন ‘না’,। কিন্তু আমাদের দেশের সিংহভাগ নারীই এখনো জানেন না, তাদের প্রকৃত অধিকার আর মর্যাদা আসলে নিহিত কোন জায়গায়? বিষয়টি যদি আমরা কেবলমাত্র শিক্ষিত নারী খাতে দেখি, সেখানে যোজনযোজন ফারাক দেখতে পাই। যেমন দেশে বর্তমানে নারী শিক্ষার যে হার প্রত্যক্ষ করি সেই পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলেই নারী শিক্ষার সাফল্য গাঁথা আমাদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠে। কিন্তু এর একটু গভীরে প্রবেশ করলেই দেখি এই একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত বিশাল প্রজন্ম ও মনন আর মানসিকতায় উদার, আধুনিক ধ্যান ধারণায় বেড়ে উঠতে পারেনি। একাডেমিক ক্যারিয়ার হয়তো খুবই উন্নত, সার্টিফিকেট প্রথম শ্রেণির, মেধা আর প্রজ্ঞা কেবলই সীমাবদ্ধ একটি ছকের বৃত্তে। কিন্তু ধ্যানজ্ঞান একেবারেই সেকেলে। এখনো সমাজের অনাচার, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং পুরনো ও সনাতনী মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। ফলে এই বিশাল তরুণ প্রজন্ম কিভাবে নিজেদের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলবে? ধর্মের সত্যিকার বিধিনিষেধ কি? এর অভ্যাস এবং চর্চা সঠিক হচ্ছে কি না, তা দেখার কেউ নেই, বলা তো দূরের কথা। ফলে এক উদ্ভট প্রথা এবং বিধিনিষেধে আমাদের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষিত হয়েছে। পরিবার, সমাজ, দেশ তথা জাতির জন্য প্রতিটি মানুষের যে কর্তব্য ও দায়িত্ববোধ রয়েছে, তা এই প্রজন্ম জানেই না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির করাল থাবা, অপসংস্কৃতির বিস্তার, এবং বর্তমান অস্থির সময়ের বেহাল চিত্র, সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ ক্রান্তিকাল আমরা অতিক্রম করছি। এই অবস্থায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে পারিবারিক শিক্ষা। পরিবার যদি একটু এই দুর্গতির লাগাম টেনে ধরতে পারে কুসংস্কার ও সেকেলে ধ্যান জ্ঞান পরিহার করে পরিবারের সদস্যদের মানসপটে যদি পারিবারিক শিক্ষা যেমন নিজস্ব সংস্কৃতি, আদবকায়দা, শিষ্টাচার, নৈতিকতা এবং প্রকৃত ধর্মীয় আদর্শ ও শিক্ষার বীজ এদের মাঝে রোপণ করতে পারে, তাহলে আমাদের জীবনের আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা এই অন্ধকার আর ঘোর অমানিশা কেটে যাবে ধীরে ধীরে। তবে সেই জন্য প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। একটি নির্বাচিত সরকার জন প্রতিনিধিত্বশীল একটি সরকার। গোটা বিশ্বেই এখন সংকট। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংকট চলছে। সংকটের মাঝেও বৈশ্বিক কর্মকাণ্ড থেমে নেই। সময়ের চাকার সাথে প্রবহমান এই গতি। আমরা একটি সুসময়ের অপেক্ষায় আছি। সামনেই বেগম রোকেয়া দিবস। যিনি অবরোধবাসিনীদের মুক্তি কামনা করেছিলেন। সুলতানাদের স্বপ্নপূরণে এগিয়ে এসেছিলেন। আমরা নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে যদি সফলকাম হতে পারি, তরুণ প্রজন্মকে যদি বিষয়টি সম্পর্কে মোটিভেট করতে পারি, তবেই সার্থক হবে যাবতীয় কর্মসূচি। সহিংসতা হয়তোবা কিছুটা কমে আসবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকজন জান্নাত, অন্ধকারে জ্বলন্ত এক প্রদীপ
পরবর্তী নিবন্ধবাঁশখালীতে অবৈধ বোট, জাল ও মাছ আটক