নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ফ্যামিলি কার্ড মাইলফলক

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ১১ মার্চ, ২০২৬ at ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ

ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় তারেক রহমানের কল্যাণ রাষ্ট্রের যে চিন্তা ফ্যামিলি কার্ডকে তার প্রথম পদক্ষেপ বলেও দাবি করেন তিনি। খসরু বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত কোনো প্রকল্পই বছরের পর বছরেও বাস্তবায়ন করা যায় না। দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার সেটিকে ভুল প্রমাণ করেছে। শুধু ফ্যামিলি কার্ড না, আপনারা জানেন, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার প্রকল্প আমরা গ্রহণ করেছি। আমরা ফারমার্স কার্ড করেছি। খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়ে গেছে। আমাদের নির্বাচনি ওয়াদা যেগুলো আছে সমস্ত কাজগুলো এক মাসের মধ্যে শুরু করতে পেরেছি।

তিনি গতকাল মঙ্গলবার সকালে নগরের দক্ষিণ পতেঙ্গায় বিমানবন্দর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একজন নারী পরিবারকে যে সেবা দেয়, তার মূল্যায়ন কোনো সময় করা হয়নি। সন্তানের দেখভাল, খাবার প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে সংসারের নানাবিধ কাজ সামলে তারা পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তাদের এই অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। আজকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে তারেক রহমান তাদের বেছে নিয়েছেন।

তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবারের নারী প্রধানদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কারণ পরিবারে নারী প্রধানকে ক্ষমতায়ন করা না গেলে, তার সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি না হলে এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত না হলে আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সবাই বেতন নিয়ে বাড়িতে আসে। কিন্তু পরিবারের নারী প্রধানের কোনো বেতন নাই। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই নারী প্রধানকে ক্ষমতায়ন করতে হবে। এই নারী প্রধানের হাতে একটি অর্থনৈতিক সামর্থ্য আমাদের সৃষ্টি করতে হবে। সে (নারী) যাতে সমাজে সমাদৃত হয়, সে যাতে নিজে খরচ করতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এটার একটা প্রতিফলন ঘটবে। সুতরাং এই কার্ডটি শুধু নারীর ক্ষমতায়ন নয়। পরিবারের সাথে সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আগামী দিনে বিশালভাবে এটার একটা প্রতিফলন ঘটবে।

তিনি বলেন, আমি আনন্দিত, এখানে আসার আগে আপনাদের টাকা আপনাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে গেছে। এই যে স্বচ্ছতা, এটা আমরা অব্যাহত রাখতে চাই। খসরু বলেন, আমার রাজনৈতিক ও কর্মজীবনে অনেক প্রকল্প দেখেছি এবং বাস্তবায়ন করেছি। তবে আজকের এই কর্মসূচি আমাকে ভিন্ন ধরনের অনুভূতি দিচ্ছে। বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির অভিজ্ঞতা আমার রাজনৈতিক জীবনে একটি মাইলফলক হিসেবে থেকে যাবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি রাষ্ট্রের সুফল শুধু উপরের কিছু মানুষ পাবে আর বাকিরা বঞ্চিত থাকবেএই ধরনের অর্থনীতি বাংলাদেশে চলবে না। আমাদের অর্থনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে পিছিয়ে পড়া মানুষ। একেবারে হতদরিদ্রদের দিয়ে ফ্যামিলি কার্ড শুরু করেছি। এরপর ধাপে ধাপে দরিদ্র, নিম্নআয়ের মানুষ এবং মধ্যবিত্তদেরও এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।

তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতির মূল কেন্দ্র হবে যারা পিছিয়ে পড়া মানুষ, যারা হতদরিদ্র। যারা নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের সমস্যা প্রথম সমাধান করতে হবে। এজন্য এ কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকবে। ফ্যামিলি কার্ড একটি স্মার্ট কার্ড। এই কার্ডের মাধ্যমে আগামী দিনে জাতীয়ভাবে সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। সরকার সেদিকেই যাচ্ছে। কল্যাণ রাষ্ট্রের যে চিন্তা, এটা কিন্তু প্রথম পদক্ষেপ। একটি রাষ্ট্রের সুফল শুধু উপরের লোকগুলো পাবে আর বাকিরা বঞ্চিত হবে, এ ধরনের অর্থনীতি বাংলাদেশে আমরা চলতে দেব না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের সুফল আমরা বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। কোথাও যেতে হয় নাই। তাদের কারো কাছে যেতে হয়নি, চাইতে হয়নি। সরকার নিজ উদ্যোগে প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে গিয়ে সার্ভে করে বের করেছে সবচেয়ে যাদের চাহিদা রয়েছে।

তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কোনো ছোট উদ্যোগ নয়। অনেকে বলেছে বাংলাদেশে কি সেই অর্থনৈতিক সামর্থ্য আছে? আমরা তো প্রমাণ করেছি আমাদের সেই সক্ষমতা আছে। যদি আমার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ভালো থাকে। জনগণের কাছে যে কমিটমেন্ট করেছি, সেটারই আমরা বাস্তবায়ন করেছি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যে সক্ষমতা আছে, সেই সক্ষমতাতে এত বড় একটা প্রকল্প। চার কোটি পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড যাবে আড়াই হাজার টাকা করে। যে একটা অংক যাবে বিশাল। এটা অনেকের মনে সন্দেহ ছিল। কিন্তু জনগণ ও নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য এবং পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য আমরা মনে করেছি সেই সীমিত সক্ষমতা থাকা স্বত্ত্বেও বাজেটের একটি বড় অংশ এই প্রকল্পের জন্য দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির অর্থনৈতিক পরিধি বড় হলেও সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণেই এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।

আামির খসরু বলেন, ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে (দক্ষিণ পতেঙ্গা) ইতোমধ্যে ৫ হাজার ৫৭৫টি পরিবারের নারী প্রধানদের নিজ নিজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এতে উপকারভোগীদের কোথাও যেতে হয়নি কিংবা কারও কাছে সহায়তা চাইতে হয়নি। সরকারি কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ করে প্রকৃত হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অল্প সময়ের মধ্যে দিনরাত পরিশ্রম করে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি বলেন, এ কর্মসূচিতে কোনো ধরনের দলীয়করণ হয়নি। ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। অর্থমন্ত্রী বলেন, দরিদ্র কৃষকদের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ মওকুফ করা হয়েছে, যাতে তারা নতুনভাবে কৃষিকাজ শুরু করতে পারেন এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল বলেন, আজকের দিনটি একটি ঐতিহাসিক দিন। অতীতে অনেক সরকার কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছেন, সেগুলো বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে প্রমাণ হয়েছে যে সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবসম্মত ও জনগণের কল্যাণে কার্যকর একটি পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি আজ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এর সুফল সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা পাচ্ছেন। অনেকেই মনে করেন এই কার্ডের মাধ্যমে শুধু ২৫০০ টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এর লক্ষ্য আরও বৃহৎ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এতে নারীদের আত্মমর্যাদা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরিবার ও সমাজে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, দেশের উন্নয়নের মূল একক ব্যক্তি নয়, বরং পরিবার। সেই লক্ষ্য থেকেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশনায়ক তারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আজ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায়। তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় যখন পরিবারভিত্তিক আর্থিক সহায়তার কথা বলা হয়েছিল, তখন অনেকে তা বিশ্বাস করতে পারেননি এবং কেউ কেউ উপহাসও করেছিলেন। কিন্তু তারেক রহমান যা বলেন, তা বাস্তবায়ন করেও দেখান। আজ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। চট্টগ্রাম৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রমাণ করেছে যে বিএনপি সবসময় জনগণের কল্যাণে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও জনগণের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাবে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির এই যাত্রা দেশের নারী সমাজের জন্য নতুন আশার দ্বার উন্মোচন করেছে। একটি পরিবারের মূল শক্তি হলো নারী, আর এই কর্মসূচির মাধ্যমে সেই শক্তিকে যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া নীপা আক্তার বলেন, নির্বাচনের এক মাসের মধ্যেই কার্ড পেয়ে আমি খুব আনন্দিত। যে স্বপ্ন ছিল, তা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। গীতা সরকার বলেন, আমার মোবাইলে টাকার মেসেজ এসেছে। যারা আমাদের জন্য এত কষ্ট করেছেন, তাদের ধন্যবাদ। প্রধানমন্ত্রীকেও ধন্যবাদ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান, বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু, নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধরাঙ্গুনিয়ায় খাল দখল করে অবৈধ স্থাপনা