নানা উদ্যোগেও চালু হচ্ছে না ‘কাগজবিহীন’ ব্যবস্থা

চট্টগ্রাম কাস্টমস । আজ আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস

জাহেদুল কবির | সোমবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো পেপারলেস ট্রেড বা ‘কাগজবিহীন’ ব্যবস্থা করতে পারছে না চট্টগ্রাম কাস্টমস। পূর্ণাঙ্গ পেপারলেস ট্রেড চালুর বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্তারা বিভিন্ন সময় আশার বাণী শোনান। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শুল্ক পরিশোধে ইপেমেন্ট ব্যবস্থা ও ইঅকশন চালু করেছে। সমস্যা হচ্ছে, এই সেবাগুলোতে প্রায় সময় ভোগান্তির অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা। ইপেমেন্টের ক্ষেত্রে বিকেল চারটার পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারের সাথে সরকারি ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংযোগ না থাকার কারণে এই সময়ের পরে শুল্ক পরিশোধ করা যায় না। ফলে কাস্টমসের অন্যান্য শাখা খোলা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের পরে শুধুমাত্র শুল্ক পরিশোধ করতে না পারার কারণে ব্যবসায়ীরা পণ্য খালাস করতে পারেন না। আবার চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘ সময় পড়ে থাকা অখালাসকৃত পণ্য দ্রুত নিলামের জন্য ইঅকশন (অনলাইন নিলাম) চালু করা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনলাইনে দরপত্র দাখিল ছাড়া বাকিসব কাজ আগের মতো ম্যানুয়ালি করতে হচ্ছে। আমদানিরপ্তানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম কাস্টমসে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন ব্যবস্থা চালু না হওয়ার ফলে এখনো আমদানিকারকদের ফাইল নিয়ে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ধর্ণা দিতে হচ্ছে। এতে সময়ক্ষেপনের পাশাপাশি পণ্য খালাসেও দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমসের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তারাই চান না, কাস্টমসে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন চালু হোক। পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন হয়ে গেলে ৯০ শতাংশ ফাইল প্রথা উঠে যাবে। অর্থাৎ পেপারলেস ট্রেড শুরু হলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের ফাইল জিম্মি করে উৎকোচ আদায়ও বন্ধ হয়ে যাবে।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টমে অটোমেশনের প্রক্রিয়া শুরু হয় মূলত সেই ১৯৯৪ সালে। সেই সময় নির্দিষ্ট কিছু তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে গত ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকায় বাংলাদেশচীন মৈত্রী সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তির অটোমেশন অ্যাসাইকুডা প্লাস সফটওয়্যার উদ্বোধন করা হয়। পরে সফটওয়্যারের কিছু দুর্বলতা থাকায় গত ২০১৩ সালে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যার চালু করা হয়। পরে ধাপে ধাপে কাস্টমসের সকল কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী দৈনিক আজাদীকে বলেন, অটোমেশন মানে হলো পেপারলেস একটি ব্যবস্থা। যেখানে স্টেকহোল্ডাররা ঘরে বসে প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করে কাজ করতে পারার কথা। এখন সেই জায়গাতে কাস্টমসের কর্মকর্তারা সবকিছু ফাইলে দেয়ার কথা বলেন। এতে যে উদ্দেশ্য নিয়ে অটোমেশন কার্যক্রম শুরু হয়, সেটি অন্ধকারেই রয়ে গেছে বলা যায়। তবে এক সময় অ্যাসাইকুডা সার্ভারের যে ভোগান্তি পোহাতে হতো, সেটি বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যানের দূরদর্শী উদ্যোগের কারণে একপ্রকার সমাধান হয়ে গেছে বলা যায়। আমরা চাই চট্টগ্রাম কাস্টমস স্বচ্ছতার ভিত্তিতে চলুক। যেখানে প্রত্যেক স্টেকহোল্ডার হয়রানিবিহীন সেবা পাবেন। তবেই আমাদের আমদানিরপ্তানি বাণিজ্য এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন দৈনিক আজাদীকে বলেন, কাস্টমসের সকল অটোমেশন না হওয়ার কারণে স্টেকহোল্ডারদের পদে পদে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। একটি সমস্যার কথা বলিআমরা ঘরে বসে অনলাইনে ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিপেস্টো (আইজিএম) দাখিল করি। কিন্তু আমাদের আইজিএম অ্যামেন্ডমেন্টের (সংশোধনী) জন্য কাস্টম হাউসে দৌঁড়ঝাপ করতে হচ্ছে। আমাদের যদি অনলাইনে সংশোধনী ফি পরিশোধ করে সংশোধন করার সুযোগ দিত, তবে কাস্টমসে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। এখন আমাদের বিভিন্ন অফিসারদের টেবিলে টেবিলে ধর্ণা দিতে হচ্ছে।

আমিন অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী এবং কাস্টমসের নিয়মিত বিডার ফজলুল আমিন বলেন, কাস্টমসে ইঅকশন চালু করা হলেও মূলত ইঅকশন হচ্ছে কেবল নামেই। একমাত্র দরপত্র জমা দেয়াটাই হচ্ছে অনলাইনে। বাকি সব প্রক্রিয়া সেই আগের মতোই ম্যানুয়ালি করতে হচ্ছে বিডারদের। এতে ভোগান্তি সেই আগের মতোই রয়ে গেছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার শফি উদ্দিন বলেন, কাস্টমসের সকল কাজ অটোমেশনের করার জন্য এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ইঅকশন এবং ইপেমেন্ট চালু করা হয়েছে। অনলাইনে কাজের ক্ষেত্রে কারিগরি ত্রুটি হওয়াটা স্বাভাবিক। না হলে এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা ভালোভাবে কাজ করতে পারছেন।

এদিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আজ আমাদের দেশেও আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস পালিত হবে। এই উপলক্ষে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্র্র্তৃপক্ষ সেমিনারের আয়োজন করেছে। ১৯৫৩ সালে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে কাস্টমস কোঅপারেশন কাউন্সিলের উদ্বোধনী অধিবেশনকে স্মরণ করে প্রতি বছর এ দিনটি আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস হিসেবে পালন করা হয়। পৃষ্ঠপোষকতা করে ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশন বা ডব্লিউসিও। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও ২০১০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস পালন করে আসছে এনবিআর।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসমাবেশ সফল হওয়ায় মেয়রের কৃতজ্ঞতা
পরবর্তী নিবন্ধপলোগ্রাউন্ডে তারেক রহমানের সমাবেশ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়