মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত নবম দিনে আরো বিস্তৃত ও রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে। গতকাল রোববার পর্যন্ত এ যুদ্ধে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। তেহরানের বিশাল অংশের আকাশ কালো মেঘে ঢেকে রয়েছে। আর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ও তার মিত্ররা ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জায়গায় হামলার দাবি করছে। তেহরান, লেবানন ও উপসাগরীয় অঞ্চলসহ কয়েকটি ফ্রন্টে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য আহমদ আলামোলহোদা বলেছেন, পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ভোট ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং নতুন নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি জানান, এখন সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার দায়িত্ব রয়েছে বিশেষজ্ঞ পরিষদের সচিবালয়ের প্রধান হোসেইনি বুশেহরির ওপর।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) ঘোষণা দিয়েছে, তারা ইসরায়েলের বেয়ারশেবা ও তেল আভিভ শহর এবং জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি এই হামলাকে ‘অপারেশন ওয়াদে সাদেক ৪’ এর ২৮তম ধাপের অংশ বলে উল্লেখ করেছে। তারা জানিয়েছে, বেয়ারশেবা ও তেল আবিবে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র ছিল ‘খেইবার’ ধরনের, যার ওয়ারহেড অত্যন্ত ভারী।
এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে অন্তত ১ হাজার ৩ শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া হামলায় দেশজুড়ে প্রায় ১০ হাজারের মতো বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার মধ্যে হাজার হাজার আবাসিক ভবন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
যুদ্ধের নবম দিনে এসে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি ডিপো থেকে বের হয়ে আসা তেল তেহরানের কিছু পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আর এতে রাজধানীর রাস্তাগুলোর পাশে কথিত ‘আগুনের নদী’ তৈরি হয়েছে। এর আগে ইরানের জ্বালানিমন্ত্রী জানান, তেহরানের পশ্চিমে আলবোর্জ প্রদেশের কারাজ শহরসহ তিনটি এলাকায় রাতে জ্বালানি ডিপোগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত চারজন ট্যাঙ্কার লরি চালক নিহত হয়েছেন। বর্তমানে ঘন ধোঁয়া তেহরানের বিশাল অংশের আকাশ কালো মেঘে ঢেকে রয়েছে। দূষণের প্রেক্ষিতে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার তরফ থেকে নাগরিকদের অনুরোধ করা হয়েছে যেন তারা খোলা জায়গায় যাওয়া থেকে বিরত থাকেন এবং যতটা সম্ভব বাড়িতে অবস্থান করেন। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট এই আগুনের কারণে অ্যাসিড বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করেছে। রেড ক্রিসেন্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তেলের গুদামে বিস্ফোরণের ফলে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত হাইড্রোকার্বন, সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ও মেঘের মধ্যে প্রবেশ করে। ফলে বৃষ্টি হলে সেই বৃষ্টি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয় এবং তাতে অ্যাসিডের বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।
লেবাননের পূর্বাঞ্চলের বেকা উপত্যকার নবী চিত শহরে ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলায় অন্তত ৪১ জন নিহত এবং আরও অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন বলে লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ লেবাননে সংঘর্ষে হেজবুল্লাহর হামলায় দুইজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার কথাও জানিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে গতকাল পর্যন্ত অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি ও মিত্রদেশে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। কিছু হামলায় মার্কিন সামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গেল ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের আরো চারটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার দাবি জানিয়েছে তেহরান। দেশটির ইসলামিক রেভলুশনারি গার্ড কোর্পসের (আইআরজিসি) দাবি, তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত চারটি রাডার ধ্বংস করেছে। আইআরজিসির বরাতে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ বলেছে, ‘প্রিসিশন ক্ষেপণাস্ত্র’ দিয়ে এসব রাডারে হামলা চালানো হয়। এছাড়া বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনাকে বন্দি করার দাবি জানিয়েছেন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, মার্কিন সেনা বন্দি হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র গোপন করছে। আমার কাছে খবর এসেছে, বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনাকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক করা হয়েছে। কিন্তু আমেরিকানরা দাবি করছে যে, তারা যুদ্ধে নিহত হয়েছে। এই চেষ্টা সত্ত্বেও সত্য খুব বেশি দিন তারা লুকিয়ে রাখতে পারবে না। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিক এক বিবৃতিতে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েলে এখন পর্যন্ত ১০ জন নিহত হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৭টা পর্যন্ত ১ হাজার ৯২৯ জন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। গতকাল তেল আবিবে নতুন করে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর দিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ করা ছবিতে তেল আবিবের আকাশে ধোঁয়া দেখা গেছে।
এছাড়া ইরান এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর দাবি করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে কুয়েতসহ কয়েকটি দেশের মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোও ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকায় রকেট হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। এছাড়া ইসরায়েলি বিমান বাহিনী লেবাননেও নতুন করে হামলা চালিয়েছে এবং সেখানকার বিভিন্ন স্থানে হেজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে।
ইরানের নেতৃত্ব এই হামলাকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে প্রয়োজন হলে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে আরও আক্রমণ চালানো হবে। ইরানের কিছু কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জন্য মার্কিন নেতৃত্বকে মূল্য দিতে হবে। তারা এই সংঘাতকে ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে উল্লেখ করেছেন।












