নগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন জাতিসংঘ পার্কের পাশ থেকে উদ্ধার করা হতভাগ্য নবজাতকটিকে কি প্রতিবন্ধী ভেবেই ফেলে দেয়া হয়েছিল? ফেলে দিয়েছেন কি তার জন্মদাতা মা-বাবাই? কিছু তথ্যপ্রমাণে এরকমই ইঙ্গিত মিলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, জামাল খানস্থ ইনোভা হাসপাতালে শনিবার রাতে চকবাজারের জনৈক বাপ্পী বড়ুয়ার স্ত্রী এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, ওই নবজাতকের কপালে রয়েছে একটি বাড়তি মাংসপিণ্ড। এর পরদিন রোববার রাতে জাতিসংঘ পার্কের পাশ থেকে উদ্ধার করা নবজাতক কন্যা শিশুটির কপালেও একটি বাড়তি মাংসপিণ্ড রয়েছে। এ কারণে এই দুই শিশুই এক কিনা প্রশ্ন ওঠে। তবে বাপ্পী বড়ুয়া দাবি করেন, তার নবজাতক কন্যাটি মারা গেছে এবং তাকে তার গ্রামের বাড়িতে সমাধি দেয়া হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি দৈনিক আজাদীকে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ওই গ্রামে কোনো শিশুকে সৎকার বা সমাধি দেয়ার ঘটনা ঘটেনি।
বলা হচ্ছে, মা-বাবার দ্বিতীয় কন্যা সন্তান হিসেবে শিশুটি পৃথিবীতে আসে। পৃথিবীর আলো দেখার সাথে সাথে এক নির্মম পৃথিবীও বাচ্চাটিকে প্রত্যক্ষ করতে হয়। যে মা দশ মাস গর্ভে ধারণ করে একটু একটু করে বড় করেছিল জন্মের পর সেই মায়ের দুধও কপালে জুটেনি হতভাগ্য শিশুটির। গত রোববার রাত ১০ টা নাগাদ চকবাজারের বাসার কাছে জাতিসংঘ পার্কের পাশে অসুস্থ জীবন্ত বাচ্চাটিকে কাপড়ের পুটলিতে মুড়িয়ে ছুড়ে ফেলা হয়। হতভাগ্য শিশুটি কক্সবাজারের রামুর জনৈক বাপ্পী বড়ুয়া এবং তার স্ত্রীর ঘরে জন্ম নিয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে দাবি করা হচ্ছে। এই দাবির সমর্থনে দৈনিক আজাদীর হাতে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ এবং কল রেকর্ড রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডিএনএ টেস্ট করে চমেক হাসপাতালের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন হতভাগ্য শিশুটিকে ঠিকানায় ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হবে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, ইনোভা হাসপাতালে জন্ম নেয়া ওই কন্যা শিশুর কপালে যে বাড়তি মাংসপিণ্ড রয়েছে তা এনসিপালেকোল নামের অতি সাধারণ অসুস্থতা। ছোট্ট একটি অপারেশনের মাধ্যমে এটা সারিয়ে তোলা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বাচ্চাটির বাবা-মা বাড়তি মাংসপিণ্ডসহ জন্ম নেয়া শিশুটিকে প্রতিবন্ধী ভেবে শংকিত হয়ে ওঠেন। তাদের ঘরে আগেরও একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। দ্বিতীয় কন্যা সন্তানটি প্রতিবন্ধী হবে এটি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি ওই দম্পতি। তড়িঘড়ি করে ইনোভা হাসপাতাল থেকে বাচ্চাসহ রিলিজ নেয়া হয়।
পরবর্তীতে জাতিসংঘ পার্কের পাশে কাপড়ের পুটলি মুড়িয়ে বাচ্চাটিকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়। চকবাজার থানা ছাত্রলীগ নেতা মো. সাদেক রেজাসহ ৬ বন্ধু মিলে প্রাইভেটকার থেকে ছুড়ে ফেলা বাচ্চাটিকে কুড়িয়ে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়। সেখানে ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে বেওয়ারিশ বাচ্চা হিসেবে হতভাগী কন্যা শিশুটির চিকিৎসা চলছে।
অসুস্থ শিশুটির ছবি দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হলে সেটি ইনোভা হাসপাতালে ওইদিন জন্ম নেয়া শিশু হিসেবে আলোচনা শুরু হয়। দৈনিক আজাদীর পক্ষ থেকে ব্যাপারটি নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করে হতভাগ্য বাচ্চাটির পরিচয় এবং ভাগ্যবিড়ম্বনার তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়।
এই ব্যাপারে বাপ্পী বড়ুয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার বাড়ি রামু। চান্দগাঁওতে থাকি। তাহলে হাসপাতালে চকবাজারের ঠিকানা দিয়েছেন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ও আচ্ছা চকবাজার আমার বাসা। ইনোভা হাসপাতালে তার একটি কন্যা সন্তান জন্ম নিয়েছে বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, প্রাইভেট ক্লিনিকে বিল বেশি হওয়ায় ওখান থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে বাচ্চাকে ভর্তি করাই। সেখানে বাচ্চাটি মারা গেছে। সেটিকে রামু গ্রামের বাড়িতে নিয়ে সমাধিস্থ করা হয়েছে। প্রাসঙ্গিক কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বাপ্পী বড়ুয়া ফোনের লাইন কেটে দেন। পরবর্তীতে বাপ্পী বড়ুয়ার মা ফোন করে এই প্রতিবেদকের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ধমকাতে থাকেন। তার ছেলের ‘জারজ সন্তান’ হয়েছে বলে আমরা মনে করছি কিনা সেই প্রশ্নও করেন। তিনি বলেন, তাদের বাচ্চাটি ইনোভা হাসপাতালে মারা গেছে। সেখানে সিসিটিভিতে বাচ্চা মরে যাওয়ার ছবি আছে। হাসপাতালে গিয়ে তা দেখে আসারও পরামর্শ দেন তিনি।
এই ব্যাপারে ইনোভা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভময় দাশ রাজুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাদের হাসপাতালে কোনো বাচ্চা মারা যায়নি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে শুধু ওইদিন নয়, গত এক সপ্তাহেও কোনো বাচ্চা মারা যায়নি কিংবা মৃত জন্মায়নি।
বাপ্পী বড়ুয়া তার সন্তান মারা যাওয়ার পর গ্রামের বাড়িতে সমাধিস্থ করা হয়েছে বলে দাবি করলেও স্থানীয় ইউপি মেম্বার আবুল কালাম গতরাতে দৈনিক আজাদীকে জানান, বাপ্পী বড়ুয়া আমার পরিচিত। তার কোনো সন্তানকে গ্রামে সমাধিস্থ করা হয়নি। তিনি আরো জানান, ওই গ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে কোন বাচ্চা সমাধিস্থ করা হয়নি।
পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান দৈনিক আজাদীকে জানান, আমরা আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হবো। আদালতের অনুমতি নিয়ে প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করিয়ে বাচ্চাটির পিতা-মাতাকে শনাক্তের উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও তিনি জানান।










