পার্বত্য চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় উৎসব বিজু। ভোরের আলো ফুটতেই নদী ও হ্রদের জলে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরকে বিদায় জানানো হয়েছে। নতুন বছরের জন্য কামনা করা হচ্ছে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ভিন্ন নামে (বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু) এই উৎসব পালন করে। তবে উদ্দেশ্য এক, পুরনো দুঃখ ভুলে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো। ফুল, শোভাযাত্রা, প্রার্থনা আর মিলনমেলায় পাহাড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এতে অংশ নিচ্ছে। পুরো অঞ্চলজুড়ে দেখা যাচ্ছে সমপ্রীতির চিত্র।
খাগড়াছড়ি : খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে চাকমা সমপ্রদায়ের বিজু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। গতকাল ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মাইনী নদীতে ফুল দিয়ে পুজা শুরু করেন চাকমা জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন বয়সী মানুষ। জেলার মাইনী ও চেঙ্গী নদীর বিভিন্ন অংশে ফুল বিজুর আয়োজনে সমবেত হয় চাকমা জনগোষ্ঠীর মানুষ। এ উপলক্ষ্যে সকালে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে বিজু উদযাপন কমিটি। এতে অংশ নেয় বিভিন্ন বয়সী মানুষ। চাকমা তরুণ তরুণীরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বন থেকে সংগ্রহ করা বিজু, মাধবীলতা, অলকানন্দসহ নানা রকমের বুনো ফুল দিয়ে পুজা করে। পরে নদীর পাড়ে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে প্রার্থনা করে। ফুল বিজুতে অংশ নেয়া প্রগতি চাকমা বলেন, আমরা ফুল
গজানা অনুষ্ঠানে এসেছি। অনেকে ‘ফুল ভাসানো’ বলে, কিন্তু এটা হবে ফুল গজানা। মাইনী নদীতে ফুল দিয়ে আমরা মা গঙ্গাকে পুজা করেছি। আমাদের সামনের বছর আরো সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। আমরা নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছি।
বিজু উদযাপন কমিটির আয়োজনে অংশ নেয় দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানজিল পারভেজ। তিনি বলেন, আজকে ফুল বিজুর অনুষ্ঠান হয়েছে। এর মধ্যদিয়ে অশুভ, জরাজীর্ণতা, গ্লানি ভুলে নতুন বছর আরো সুখ ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে এমন প্রত্যাশা থাকবে। এ ধরনের উৎসবের মধ্যে পাহাড়ে বসবাসরত মানুষের সমপ্রীতির বন্ধন আরো সুদৃঢ় হবে।
দীঘিনালায় বিজু উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জ্ঞান চাকমা বলেন, উদযাপন কমিটির উদ্যোগে ৫ দিনব্যাপী নানা আয়োজন রয়েছে।
রাঙামাটি : রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, কাপ্তাই হ্রদের পানিতে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল নিবেদন করে বাংলা পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছে রাঙামাটির পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষ। গতকাল ভোর থেকে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে কাপ্তাই হ্রদে ফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এ উৎসব। রাঙামাটি শহরের তবলছড়ির কেরাণী পাহাড়, রাজবন বিহার ঘাট, গর্জনতলী এলাকাসহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ফুল ভাসানো হয়। ফুল ভাসাতে আসা মৈত্রী চাকমা বলেন, আজকে হচ্ছে আমাদের ফুল বিজু। আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফুল নিয়ে আমাদের চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনন–হাদি পরে পানিতে ফুল ভাসাতে এসেছি। আমি ফুল ভাসিয়ে গঙ্গা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেছি নতুন বছরে আমরা যাতে সবাই সুখে শান্তিতে ভালো থাকতে পারি।
রাঙামাটির বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংত্রাণ, চাংলান, পাতা, বিহু–২০২৬ উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদার বলেন, বিজু আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। এই উৎসব আমরা যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছি। আজ সোমবার (৩০ চৈত্র) বিজু উৎসবের দ্বিতীয় দিন ‘মূল বিজু’। এরপর উৎসবের তৃতীয় দিন গজ্যাপজ্যা বিজু বা নববর্ষ উৎসব।
বান্দরবান : বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বান্দরবানে সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসিয়ে চাকমা সমপ্রদায়ের বিজু এবং তঞ্চঙ্গ্যা সমপ্রদায়ের বৈসু উৎসব শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার সকালে সাড়ে সাতটায় বান্দরবানের বালাঘাটা পুরানো নদীঘাট এলাকায় ফুল ভাসাতে অংশ নেয় চাকমা–তঞ্চঙ্গ্যা সমপ্রদায়ের তরুণ–তরুণী, শিশু কিশোর এবং বিভিন্ন বয়সের শতশত নারী–পুরুষ। তিন দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে জেলা সদরের বালাঘাটা ও মাঝেরপাড়া এলাকা ছাড়াও পাহাড়ি পল্লীগুলোতে।
উৎসব আয়োজন কমিটির সমন্বয়ক উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গা বলেন, পাহাড়ে বিভিন্ন সমপ্রদায়ের বর্ষবরণের প্রধান এই সামাজিক উৎসবকে সমষ্টিগতভাবে বলা হয় বৈসাবী। এ উৎসবকে চাকমাদের ভাষায় বিজু, তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষায় বিসু, ত্রিপুরাদের ভাষায় বৈসুক, মারমাদের ভাষায় সাংগ্রাই নামে ডাকা হয়।














