নদীতে সাকার মাছের দাপট: পরিবেশগত উদ্বেগ

মুহতাসিম মাহমুদ | মঙ্গলবার , ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ

সমপ্রতি সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীতে এক জেলে নৌকাভর্তি সাকার মাছ বিনা মূল্যে দিতে চাইছেন এক বৃদ্ধাকে, কিন্তু তিনি একটি মাছও নিতে রাজি নন। দৃশ্যটি দেখলে মজার মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের নদনদীতে চলতে থাকা একটি গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত।

সাকার মাছ, যাকে সাকারমাউথ ক্যাটফিশও বলা হয়, ধীরে ধীরে দেশীয় মাছকে সরিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে। একসময় অ্যাকোয়ারিয়ামের কাচ পরিষ্কার রাখার উদ্দেশ্যে এই মাছ আমদানি করা হলেও অসচেতনতা, বন্যার সময় ছড়িয়ে পড়া এবং দুর্বল নজরদারির কারণে এখন তারা নদনদীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে।

নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাকার মাছের উপস্থিতি প্রথম ধরা পড়ে ২০০৮ সালের দিকে, যদিও অনেকেই দাবি করেন আশির দশকেই তারা এই মাছ দেখেছেন। এরপর বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, কর্ণফুলী, মেঘনা, যমুনা, সুরমাকুশিয়ারাসহ বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ে এদের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। যা একসময় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল, এখন তা প্রায় নিত্যদিনের বাস্তবতা।

এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়। ভারত, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস ও ফিলিপাইনসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বহু দেশে সাকার মাছকে আক্রমণাত্মক বিদেশি প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব দেশে দেশীয় মাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, জলজ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং জেলেদের ক্ষতির কথা উঠে এসেছে। ঘন নদীনেটওয়ার্ক, ঘনঘন বন্যা এবং বহিরাগত প্রজাতি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতাই এই বিস্তারের প্রধান কারণ।

সাকার মাছের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এদের অসাধারণ সহনশীলতা। দূষিত পানি, কম অক্সিজেন এমনকি প্রতিকূল পরিবেশেও এরা সহজেই টিকে থাকতে পারে। নদীর তলদেশে থাকা শ্যাওলা ও জৈব পদার্থ খেতে গিয়ে এরা তলদেশ নাড়াচাড়া করে, জলজ উদ্ভিদ উপড়ে ফেলে এবং পানিতে পলির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে পানি ঘোলা হয় এবং দেশীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলেদের অভিজ্ঞতা পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে। যেখানে একসময় রুই, কাতলা বা শিং ধরা পড়ত, এখন সেখানে জালের বড় অংশজুড়ে শুধু সাকার মাছ। এতে আয় কমছে, ভেঙে পড়ছে নদীর স্বাভাবিক খাদ্যচক্র। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে খাদ্যনিরাপত্তা ও জেলেদের জীবিকায়। মেক্সিকোর মতো কিছু দেশে সাকার মাছ পেজ ডিয়াবলোনামে পরিচিত এবং প্রক্রিয়াজাত করে খাওয়া হয়। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের অনেক নদী দূষিত হওয়ায় গবেষণায় দেখা গেছে, সাকার মাছের দেহে সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু জমতে পারে। তাই যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া এ মাছ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

আন্তর্জাতিকভাবে সাকার মাছের চামড়া, কোলাজেন, সার কিংবা পশু ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব উদ্যোগ নিলে উল্টো এদের বিস্তার আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই যেকোনো ব্যবহারমূলক উদ্যোগ হতে হবে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায়।সাকার মাছ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও ক্ষতি কমানো যায়। এর জন্য আমদানি, চাষ ও বিক্রিতে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। অ্যাকোয়ারিয়াম ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীদের সচেতন করা এবং দেশীয় মাছের প্রজনন এলাকায় বাছাইকৃত জাল ব্যবহার করে সাকার মাছ অপসারণ করা যেতে পারে। হালদা নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ক্ষেত্র রক্ষা এবং পানির মান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সাকার মাছের এই দাপট শুধু একটি মাছের সমস্যা নয়; এটি আমাদের নদীপরিবেশের ভারসাম্যহীনতার একটি সতর্ক সংকেত। সময় থাকতে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও জনসচেতনতা না বাড়ালে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হতে পারে জীববৈচিত্র্য, জীবিকা ও নদীর স্বাস্থ্যের বিনিময়ে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইতিহাস বিকৃতিকে না বলুন
পরবর্তী নিবন্ধমানুষ কী বলবে- কী ভাববে?