বিগত সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুটপাট সংগঠিত হয় দেশের আর্থিক খাতে। সরকারের শীর্ষ কর্তাব্যক্তির সম্মতিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তায় একের পর এক দখল করা হয় দেশের ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে রুগ্ন করে দেশের বাইরে পাচার করা হয় লক্ষ কোটি টাকা। সেই টাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেনা হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। ছলচাতুরীর মাধ্যমে দায় এড়ানোর জন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সেই বিশেষ দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা হয়। অনেকে বাংলাদেশের লুটপাটের টাকায় সিংগাপুরে ধনীদের তালিকায় স্থান করে নেয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো একজন মানুষের হাতে চলে যায় দেশের ৬–৭টি ব্যাংকসহ অনেকগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যা বিশ্বে বিরল ও অন্যন্য। অথচ সাধারণ জনগণের এই টাকা দেশের উন্নয়নে ব্যয় করা হলে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হতো। আর এই কারণে মারাত্মক সংকটে পড়ে দেশের ১০–১৫টি ব্যাংকসহ অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তাই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে বাধ্য হয়ে সবচেয়ে রুগ্ন ৫টি ইসলামি ব্যাংককে বিলুপ্ত করে একটি বৃহৎ ব্যাংক করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে ফলো করা হচ্ছে ১৯৯২ সালে সংকটে পড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিসিসিআইকে।
পাকিস্তানি ব্যাংকার আগা হাসান আবেদি ১৯৭২ সালে ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল (বিসিসিআই) প্রতিষ্ঠা করেন। বিসিসিআইয়ের ২৫% মূলধন ছিল ব্যাংক অব আমেরিকার এবং ৭৫% মূলধন ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির শাসক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের। ব্যাংকটি লুক্সেমবার্গে নিবন্ধিত ছিল এবং তার প্রধান কার্যালয় ছিল পাকিস্তানের করাচি ও যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। ব্যাংকটি চালুর এক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশসহ ৭৮টি দেশে ৪ হাজারের বেশি শাখার মাধ্যমে ব্যাংকিং কার্যক্রম সমপ্রসারণ করে। ব্যাপকভাবে কার্যক্রম সমপ্রসারণের কিছুদিন যেতে না যেতেই ব্যাংকটিতে অর্থ পাচার এবং অন্যান্য আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এ কারণে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যাংকটির সম্পদ জব্দ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালে এসে ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর ব্যাংকটির বাংলাদেশ কার্যক্রম পুনর্গঠনের মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় ইস্টার্ন ব্যাংক। তৎকালীন সরকার বিশেষ করে তখনকার অর্থমন্ত্রী জনাব সাইফুর রহমানের সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে বিসিসিআইয়ের বড় অঙ্কের আমানতকারীরা হয়ে যান ইস্টার্ন ব্যাংকের মালিকানার অংশীদার। সরকারও ৬০% মালিকানা নিয়ে ব্যাংকটির পর্ষদে যুক্ত হয়। পরে ওই শেয়ার বিক্রি করে দেয় সরকার। আমানতকারী থেকে মালিকানার অংশীদার হওয়া পরিচালকেরা পরবর্তী সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। সুশাসন, সঠিক নির্দেশনা, আন্তর্জাতিক চর্চার কারণে এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের একটি ইস্টার্ন ব্যাংক। ২০ বছর ধরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৩% ঘরে। ব্যাংকটি আর্থিক সূচকের পাশাপাশি ভাবমূর্তিও অনেক শক্তিশালী, সেবার মানেও এগিয়ে। গত বছরে ইস্টার্ন ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে প্রায় ১,৬০০ কোটি টাকা। ইস্টার্ন ব্যাংককে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যাংকে উন্নীত করতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বহুজাতিক ব্যাংকের অভিজ্ঞ ব্যাংকাররা। ব্যাংকটির পরিচালকেরাও এতে সমর্থন জুগিয়ে গেছেন।
প্রায় ৩৩ বছর পর একই আদলে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন আরেক ব্যাংক গঠনের স্কিম বা নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সমপ্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন ব্যাংক গঠনের স্কিম সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে সংকটে পড়া পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারী ও কর্মকর্তা–কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হতে চলেছে। যে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠিত হচ্ছে, সেগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক। এতে পাঁচ ব্যাংকের দায়, সম্পদ ও জনবল অধিগ্রহণ করবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এরপর ধীরে ধীরে পাঁচ ব্যাংক বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
এই পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের মালিকানাধীন। বাকি চারটি ব্যাংক ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তাঁরা দুজনই ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ। এসব ব্যাংকে নামে–বেনামে তাঁদের সর্বাধিক শেয়ার ছিল এবং তাঁরা ঋণের নামে লক্ষ কোটি টাকা এসব ব্যাংক থেকে বের করে নেন। আর এ কারণে ব্যাংকগুলোর সব শেয়ার শূন্য করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
স্কিম অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সরকার ইতিমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন দিয়েছে, যা রেজল্যুশন স্কিমে ‘ক’ শ্রেণির শেয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে। পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়ী আমানতের অংশ থেকে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তরিত হবে, যা ‘খ’ শ্রেণির শেয়ার হিসেবে গণ্য হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের স্থায়ী আমানতের অংশ থেকেও সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তরিত হবে,যা ‘গ’ শ্রেণির শেয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি, জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি, বহুজাতিক কোম্পানি, রেজল্যুশনের আওতাভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোর ক্ষেত্রে এই শেয়ার রূপান্তরের বিধান প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের আমানত শেয়ারে রূপান্তর করা যাবে না। নতুন ব্যাংক পরিচালনার জন্য প্রাথমিকভাবে সাত সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে। এরমধ্যে অন্তত ৫০% সদস্যকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্কিমে পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরত দেওয়ার সময়সূচিসহ সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সব আমানতকারীর অর্থ নিরাপদ রয়েছে। স্কিম অনুযায়ী, যেসব সাধারণ গ্রাহকের আমানত দুই লাখ টাকা পর্যন্ত, ‘আমানত সুরক্ষা আইন’–এর আওতায় তা যেকোনো সময় উত্তোলন করা যাবে। যাঁদের আমানত দুই লাখ টাকার বেশি,তাঁদের অর্থ কিস্তিতে উত্তোলনের সুযোগ থাকবে। চলতি ও সঞ্চয়ী আমানত নির্ধারিত মেয়াদ অনুযায়ী তোলা যাবে, পুরো অর্থ তুলতে সর্বোচ্চ ২৪ মাস সময় লাগবে। গুরুতর রোগে আক্রান্ত, যেমন ক্যানসার বা কিডনি ডায়ালাইসিসে আক্রান্ত আমানতকারীদের জন্য মানবিক বিবেচনায় বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। তাঁরা চিকিৎসার প্রয়োজনে নির্ধারিত সময়সীমা বা সীমার বাইরে গিয়েও অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। দুই লাখ টাকার বেশি আমানতের ক্ষেত্রে প্রথম এক লাখ টাকা স্কিম কার্যকরের তিন মাস পর তোলা যাবে। এরপর পর্যায়ক্রমে ৬, ৯, ১২, ১৫, ১৮ ও ২১ মাস পর এক লাখ টাকা করে উত্তোলন করা যাবে। বাকি অর্থ ২৪ মাস পর উত্তোলন করা যাবে। প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ক্ষেত্রেও একই সময়সূচি প্রযোজ্য হবে। মেয়াদি ও স্থায়ী আমানতের ক্ষেত্রে এসব আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০% পর্যন্ত বিনিয়োগ বা ঋণসুবিধা নেওয়া যাবে। বিভিন্ন মেয়াদের স্থায়ী আমানত নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন বা দীর্ঘ মেয়াদে রূপান্তর করা হবে। চার বছরের বেশি মেয়াদি আমানত মেয়াদ পূর্তির পর পরিশোধযোগ্য হবে।
তবে সবচেয়ে কঠিন বিষয় হবে ব্যাংকটির আস্থা অর্জন করা। আস্থা বা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারলে ব্যাংকটিকে নতুন আমানত নিয়ে চিন্তা করতে হবে না এবং তা করতে পারলে অচিরেই দাঁড়িয়ে যাবে নতুন ‘সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক’। এই জন্য শুরু থেকে সুশাসনে জোর দিতে হবে। একটি দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ভালো পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে অচিরেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একটি ভালো ব্যাংক হিসেবে গড়ে উঠবে–সেই প্রত্যাশায় রইলাম।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।












