উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ চট্টগ্রাম তথা দেশের একটি অন্যতম প্রতিনিধিত্বশীল আবৃত্তি ও মনন চর্চার সংগঠন। ২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করে আজ অবধি কার্যকর একটি সংগঠন হিসেবে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গৌরবের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে উচ্চারক। কেবল আবৃত্তি চর্চা নয়, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট ও আন্দোলন–সংগ্রামে উচ্চারক সোচ্চার ভূমিকা রেখে আসছে।
আবৃত্তির সাংগঠনিক চর্চার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বন্ধু সংগঠনগুলোর সঙ্গে সু–সম্পর্ক বজায় রেখে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ তৈরিতে উচ্চারকের রয়েছে উচ্চকণ্ঠ ভূমিকা। নতুন নতুন ভাবনা ও সৃষ্টিশীল কর্মসূচির বাস্তবায়ন করে চলেছে উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ। সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চার ক্ষেত্রে উচ্চারক আজ একটি ভিন্নমাত্রিক গতিশীল সংগঠনে পরিণত হয়েছে। বিগত ১৯ বছর উচ্চারক সফলতার সাথে পেরিয়ে এখন ২০ বছরে পদার্পণ করেছে। নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি ১০ বছরপূর্তি উপলক্ষে ২০১৩ সালে, ১২ বছরপূর্তি উপলক্ষে ২০১৫ সালে এবং ১৫ বছরপূর্তি উপলক্ষে ২০১৮ সালে বর্ণাঢ্য আবৃত্তি উৎসবের আয়োজন করে। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা এবং বিভাগীয় শহরের আবৃত্তিশিল্পী ও সংগঠক এবং ওপার বাংলার আবৃত্তিশিল্পী ও সংগঠন অংশ গ্রহণ করে। আবৃত্তি পরিবেশনা ছাড়াও দেশের প্রথিতযশা আবৃত্তি শিল্পীদের সম্মাননা, বাউল ও লোকসঙ্গীতের সম্পৃক্ততা ছিল এসব উৎসবে। উচ্চারকের শিরোনাম ভিত্তিক আয়োজন শ্রাবণে রবীন্দ্রনাথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কথামালা–কবিতা–গানে গানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
২০০৭ সালের কথা। তখন পর্যন্ত একাত্তরের ঘাতক–রাজাকারদের ফাঁসির দাবি নিয়ে চট্টগ্রামে উল্লেখ করার মতো কোনো আবৃত্তি অনুষ্ঠান হয়নি। উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ ঘটনার স্রোত দিয়েছে নাড়া শিরোনামে একাত্তরের পরাজিত শক্তি রাজাকার–আলবদর ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবি নিয়ে হাজির হয়। প্রতিবাদী কবিতা ও গান নিয়ে রাজাকারদের বিচারের দাবিতে উচ্চারক তাদের উচ্চকণ্ঠ অবস্থান তুলে ধরে। গত অর্ধযুগ ধরে উচ্চারক একুশের প্রথম কবিতার স্রষ্টা কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর জন্মদিন পালন করে আসছে কথা–কবিতা আর গানে। গত চার বছর ধরে কবি প্রণয় কান্তির জন্মদিনও পালন করে আসছে উচ্চারক। শরতের শুভ্র–সুন্দর অনুভূতিগুলো শিরোনামে নিয়মিত অনুষ্ঠান করে থাকে উচ্চারক। প্রতি মাসে নবীন সদস্যদের নিয়ে তরুণালোয় অরুণোদয়ের স্বর নামে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে।
উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ ২০০৩ সালে তাদের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে যে বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করেছিল তা আজও শিল্পবোদ্ধাদের কাছে সমাদৃত হয়ে আছে। ভূ–মধ্যসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকের উপর ইঙ্গ–মার্কিন হামলার প্রতিবাদে আমেরিকার এক কবির লেখা কবিতা নিয়ে উচ্চারক তাদের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে ‘গ্রাস’ শিরোনামে সাড়া জাগানো এক কবিতা। এরপর ‘রক্ত–সন্ত্রাস এবং দীর্ঘশ্বাস, ‘চিরকালের প্রমিথিউস’, ‘উড়ুক ঝরাপাতা’, ‘বাংলার মুখ’, ‘ক্ষুধা’, ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’, ‘যেদিন আমি হারিয়ে যাবো’সহ আরো অসংখ্য প্রযোজনার মঞ্চায়ন করে প্রশংসিত হয়েছে উচ্চারক।
উচ্চারক তাদের প্রশংসনীয় শ্রুতি প্রযোজনা ‘সীমান্ত’ ও চর্যাপদের গান ‘চর্যায় অর্চনা’ নিয়ে বিগত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওপার বাংলার কলকাতা, বহরমপুর ঘুরে এসেছে। দেশভাগের ইতিহাস নিয়ে ভারতের বিখ্যাত গল্পকার অভিজিৎ সেনের গল্প সীমান্ত অবলম্বনে উচ্চারক শ্রুতি প্রযোজনাটি দুই বাংলায় সমান প্রশংসা অর্জন করেছে। তাছাড়া নিরীক্ষাধর্মী প্রযোজনা ‘চর্যায় অর্চনা’র মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যার কয়েকটি পদে বরেণ্য সঙ্গীত শিল্পী মো. মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে নতুন ভাবে সুরারোপ করে মঞ্চায়ন করে যাচ্ছে। এর বাইরে ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিন্ডিকেট’ এবং ফিলিস্তিনের উপর ইসরাইলের আগ্রাসনের প্রতিবাদে থিম ভিত্তিক শ্রুতি প্রযোজনা ‘মন ও মানচিত্রের বিভাজন’ নিয়মিত মঞ্চায়ন করে যাচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ নিয়ে উচ্চারক নির্মাণ করেছে নতুন প্রযোজনা ‘চিরকালের মর্সিয়া’। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে উচ্চারকের দলীয় আয়োজন ‘রজত কণ্ঠে পিতার শ্লোক’ একটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন উচ্চারকের।
উচ্চারক শুরু থেকেই নিজস্ব চিন্তা–চেতনার মৌলিক অনুষ্ঠান আয়োজনে উদ্যোগী হয়। তারই আলোকে উচ্চারক জন্মলগ্ন থেকে নির্বাচিত কবিদের উপস্থিতিতে তাদের কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান ‘কবি ও কাব্যকথার সমন্বয়’ আয়োজন করে আসছে।
উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ প্রতি বছর তিনমাসব্যাপী শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তি কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। এ পর্যন্ত ১৯টি সফল কর্মশালা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উচ্চারক তাদের নিয়মিত সদস্যদের পাশাপাশি অন্তত সহস্রাধিক তরুণ প্রজন্মকে বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। অনেককে আবৃত্তি–উপস্থাপনা এবং সংবাদপাঠ বিষয়ে করে তুলেছে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত। উচ্চারক একটি যুক্তিনির্ভর তরুণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়। তাই আবৃত্তি চর্চার পাশাপাশি উচ্চারক শিশু বিতর্ক এবং অন্যান্য শিশুবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করে গত চার বছর ধরে শিশুদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
উচ্চারক সভাপতি ফারুক তাহের বলেন, আবৃত্তির মাধ্যমে অসামপ্রদায়িক ও বিভেদহীন একটি সৃষ্টিশীল সমাজ গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ। সংগঠনের প্রতিটি সদস্য থেকে সাধারণ কর্মীদেরও মার্জিত ও পরিশীলতভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে উচ্চারক। বিগত ১৯ বছর ধরে সহস্র তরুণ উচ্চারকের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে।












