নতুন বছরের বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্রচিন্তা

শাহিদা জাহান | বৃহস্পতিবার , ১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ

২০২৬ বাংলাদেশের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় পরীক্ষার বছর। এখানে পরীক্ষার্থী সরকার নয়, বিরোধী দল নয়, এমনকি কোনো ব্যক্তি বা পরিবারও নয়। পরীক্ষার্থী হলো পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা প্রশ্নগুলো এবার আর পাশ কাটানোর সুযোগ পাবে না।

জনগণ এখন আর অলৌকিক পরিবর্তনের অপেক্ষায় নেই। তারা চায় বাস্তব, কাঠামোগত ও স্থায়ী সংস্কার। গণতন্ত্র কোনো অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি কাঠামো। ২০২৬ সালে জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোটের দিন নয়, গণতন্ত্র মানে প্রতিদিনের জবাবদিহি।

যে রাষ্ট্র ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্র উন্নয়নের নৈতিক অধিকারও হারায়। তাই নতুন বছরের প্রথম শর্ত হলো, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা।

রাজনীতি শুধু মাত্র ক্ষমতার লড়াই নয়, নীতির প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি ও প্রতিশোধকেন্দ্রিক। ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায় না। ২০২৬ সালে জনগণ চায় রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা, নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার সুস্পষ্ট রূপরেখা।

রাষ্ট্র কোনো পরিবারের উত্তরাধিকার নয়, এটি একটি প্রজন্মের যৌথ দায়িত্ব। এই বোধ রাজনীতিতে না এলে, ২০২৬ কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলাবে, বাস্তবতা নয়।

একটি সন্ধিক্ষণ, রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্র বদলের দাবি ২০২৬ জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার এক সন্ধিক্ষণ। বাংলাদেশের জন্য এটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক মোড়বদলের সময়।

দীর্ঘ অপেক্ষা, হতাশা ও প্রতিরোধের পর এই বছরটি এসেছে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস নিয়ে। একটি জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তনের কথা ভাবছে না, তারা চায় রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্রগত পরিবর্তন। জনগণের প্রত্যাশা এখন আর আবেগনির্ভর নয়,এটি স্পষ্ট, পরিণত ও দাবিনির্ভর।

দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ একটি জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়, এটি রাষ্ট্রচিন্তা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি বড় পরীক্ষা।

অর্থনীতি, নির্বাচন, সামাজিক শান্তি ও টেকসই উন্নয়ন, এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশের পথচলা।

নির্বাচন কাগুজে নয়, বাস্তব গণতন্ত্র। ২০২৬ সালে জনগণের প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশা একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। মানুষ আর কথার গণতন্ত্র চায় না। তারা চায় ভোট দেওয়ার অধিকার, ভোট গণনার স্বচ্ছতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহি। গণতন্ত্র এখানে শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়,এটি নাগরিকের রাষ্ট্রের ওপর মালিকানার প্রশ্ন। মানুষ এমন রাষ্ট্র চায়,যেখানে ক্ষমতা নয় নীতি ও ন্যায় শাসন করবে। শক্তি নয়, রাষ্ট্রের দরকার সাহস। এই দেশ বহুবার শক্তির প্রদর্শন দেখেছে, বুটের শব্দ, আদেশের ভাষা, উন্নয়নের স্লোগান। কিন্তু জনগণ এখন শক্তি নয়, সাহস চায়। এমন একটি রাষ্ট্র চায়,যে প্রশ্ন শুনতে পারে, ভুল স্বীকার করতে পারে এবং জনগণের ভোটকে সম্মান করতে পারে। জনগণ চায় আইনের শাসন,স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং এমন একটি শক্তিশালী বিরোধী দল, যা গণতন্ত্রকে ভারসাম্য দেয়।

এই নির্বাচনী প্রস্তুতি কোনো স্লোগান নয়, কোনো উন্নয়নের পরিসংখ্যানও নয়। এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নৈতিক সাহস ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার কঠিন পরীক্ষা।

অর্থনীতি সংখ্যার নয়, মানুষের ভাষায়। আজ বাংলাদেশে উন্নয়ন আছে,কিন্তু আস্থা নেই। শক্তি আছে, ভারসাম্য নেই। রাষ্ট্র আছে, রাষ্ট্রচিন্তা সুদৃঢ় নয়।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আছে, কিন্তু মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন অনুপস্থিত। সংখ্যার ভাষায় অর্থনীতি চলমান থাকলেও বাস্তবে তার অনুবাদ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, আয়ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান।

এই সংকট কেবল বৈশ্বিক নয়, এটি গভীরভাবে নীতিগত। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র দুর্বল, সিন্ডিকেট রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি না থাকলে অর্থনীতি ক্ষমতাঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর নিরাপদ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তা মানুষের আস্থার ওপর দাঁড়ায়, শুধু সংখ্যার ওপর নয়।

রাজনৈতিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক ন্যায় ২০২৬ সালে জনগণের রাজনৈতিক প্রত্যাশা স্পষ্ট, বংশানুক্রমিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির অবসান, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র, আদর্শভিত্তিক নেতৃত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তা। জনগণ বুঝে গেছে, ব্যক্তি বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না, রাষ্ট্র বদলায় যখন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়। ২০২৬ তাই জনগণের রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরীক্ষা। মানুষ এমন একটি অর্থনীতি চায়, যেখানে প্রবৃদ্ধি কেবল বড় প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষ ন্যায্য সুযোগ পাবে।

নতুন সরকার গঠিত হলে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অর্থনীতি। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, তারা অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে পারবে কি না। সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি, তরুণদের জন্য বাস্তব কর্মসংস্থান, এগুলো কোনো স্বপ্ন কিংবা বিলাসিতা নয়, এগুলো অর্থনৈতিক ন্যায়ের শর্ত।

শান্তি ভয়ের নয়, ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষ শান্তি চায়, কিন্তু ভয়ভিত্তিক নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে যেন শাস্তি না আসে, আইন যেন আশ্রয় হয়, হুমকি নয়। সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠী যেন নিরাপদ থাকে। শান্তি তখনই টেকসই হয়, যখন রাষ্ট্র নাগরিককে নিয়ন্ত্রণ করে না, সুরক্ষা দেয়। আপাত স্থিতিশীলতা যদি ভয়ের ওপর দাঁড়ায়, সেখানে শান্তি নয়, জমে থাকা ক্ষোভ থাকে। উন্নয়ন, মানুষকে বাদ দিলে উন্নয়ন নয়। জনগণ উন্নয়নবিরোধী নয়। তারা এমন উন্নয়ন চায়, যেখানে শিক্ষা ভবিষ্যৎ তৈরি করে,স্বাস্থ্য অধিকার হয়, ব্যয় নয়। যেখানে তরুণরা দেশ ছাড়াকে মুক্তি ভাবতে বাধ্য হয় না। রাষ্ট্র যদি ইটসিমেন্ট দেখায়, আর তরুণ দেখায় পাসপোর্ট, এই বৈপরীত্যই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। উন্নয়ন যদি মানুষকে মর্যাদা না দেয়, তবে তা রাষ্ট্রের সৌন্দর্য নয়।

একটি রাষ্ট্র টিকে থাকে তিনটি ভিত্তির ওপর, অর্থনৈতিক ন্যায়, রাজনৈতিক বৈধতা ও সামাজিক শান্তি। এই তিনটির একটিও দুর্বল হলে রাষ্ট্র বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী দেখালেও ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়ে। রাজনৈতিক বৈধতা ছাড়া অর্থনীতি টেকসই হয় না, আর অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়লে শান্তি ঝুঁকিতে পড়ে।

২০২৬এর বাংলাদেশে জনগণ কোনো অবতার চায় না, কোনো অলৌকিক সমাধানও নয়। তারা চায় একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, একটি মানবিক অর্থনীতি, একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক শান্ত সমাজ।

২০২৬ সাল প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে, আমরা কি আবার পুরোনো ব্যর্থতাগুলো নতুন নামে ফিরিয়ে আনব, নাকি সত্যিকারের সংস্কারের পথে হাঁটব? এই বছর জনগণ আর অপেক্ষা করতে চায় না। তারা প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল দেখতে চায়।

রাষ্ট্র যদি জনগণের ভাষা না শোনে, জনগণ একদিন রাষ্ট্রের ভাষা বদলে দেয়, ইতিহাস সেটাই বলে। রাষ্ট্র শক্তি দিয়ে টিকে থাকতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ তৈরি হয় শুধু জনগণের আস্থায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই, রাষ্ট্র কি জনগণের সঙ্গে চলবে, নাকি জনগণকে ছাড়িয়ে চলতে চাইবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও শান্তির ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানুষকে কৃতজ্ঞ বানানো নয়, মানুষকে স্বাধীন, সক্ষম ও মর্যাদাবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এই প্রত্যাশাই নতুন বছরের। এই প্রত্যাশাই ২০২৬। ২০২৬ শুধু একটি বছর নয়, এটি একটি সিদ্ধান্ত।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনতুন বছর নিয়ে আসুক বিশ্বময় শান্তি ও সমৃদ্ধির বারতা
পরবর্তী নিবন্ধড. মঈনুল ইসলামের কলাম