নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা থাকতে হবে

| শনিবার , ১১ এপ্রিল, ২০২৬ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গটি এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শহরভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যয় ও সেবা গ্রহণের প্রবণতা ক্রমেই বদলাচ্ছে, কিন্তু তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের ব্যবস্থাপনা এগোচ্ছে না। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টসের ছয়টি রাউন্ডে আমরা দেখেছি, আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। শহরে এই ব্যয়ের চাপ তুলনামূলক বেশি। নগরস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও পরিকল্পনা অপরিহার্য। আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার সার্ভিস প্রজেক্টের অন্তর্গত ওয়ার্ডগুলোতে সেবা প্রদানের মাধ্যমে দেখা গেছে, ফ্রন্টাল লেবেল, চিকিৎসক, মিডওয়াইফ, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ানসহ সুষম জনবল এবং বিনা মূল্যের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের বিশ্বাস ও সেবা গ্রহণ বৃদ্ধি করে।

স্বাস্থ্য সুরক্ষা বলতে আমরা শুধু শারীরিক সুস্থতাকেই বুঝি। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৪৮ সালে যে সংজ্ঞা দিয়েছে, সেখানে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক দিকের সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে ১৩ থেকে ১৮ শতাংশ মানুষ। সামাজিক স্বাস্থ্য মানে সমাজের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ, সহায়তামূলক এবং সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখা। ফুটপাত, যানজট, বালুর সিমেন্টের মতো দৈনন্দিন ব্যাঘাতও মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। জনগণ যতক্ষণ স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ প্রতিরোধে দায়িত্ব নেবে না, ততক্ষণ স্বাস্থ্য উন্নয়ন অসম্ভব। আত্মার স্বাস্থ্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ; সত্য, শান্তি, সহিষ্ণুতা ও পরোপকারের চর্চা স্বাস্থ্যকর সমাজ গঠনে অপরিহার্য।

তাঁরা বলেন, জনগণকে সচেতন করা, সোশ্যাল হেলথ ইনস্যুরেন্স চালু করা এবং রাজস্ব বরাদ্দ ও মন্ত্রণালয়ের সহায়তা মিলিয়ে ১ শতাংশের সাসটেইনেবল ফান্ড তৈরি করা যেতে পারে। অবকাঠামো শক্তিশালী করে, প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিটে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও মিডওয়াইফ নিয়োগে নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে স্থিতিশীল ও কার্যকর করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষিত বায়ু, খেলাধুলা ও পায়ে হাঁটার স্থানের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য এবং অতিরিক্ত লবণ সমৃদ্ধ প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা, হতাশা ও দুশ্চিন্তা, অনিরাপদ সড়ক ইত্যাদি কারণে বড় শহরগুলোতে অসংক্রামক রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও অনেক বেশি। স্থানীয় সরকার আইন অনুসারে নগরের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাদানের দায়িত্ব হচ্ছে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসমূহের। আইনগত দায়িত্ব পালনের জন্য শহর এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণ, বিশেষ করে দরিদ্র জনগণের জন্য পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, পুষ্টি বিষয়ে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, আধুনিক কারিগরি, ব্যবস্থাপনা নীতি ও প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন ভাবধারায় সেবা প্রদান ইত্যাদি প্রহণযোগ্য কার্যক্রমের সমন্বয়ে কৌশলপত্র ২০১৪ প্রণয়ন করা হয়। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সরকারের সক্রিয় সদস্য হিসাবে মেয়র ও কাউন্সিলরদের নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য কিছু বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞগণ। নগরের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, সেবার মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জনগণের মধ্যে প্রচারণা চালানো, জরুরি গর্ভবতী ও প্রসূতি সেবার জন্য মাতৃসদন প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা ও ধাত্রী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য গণসচেতনতা বাড়াতে এলাকা ভিত্তিক প্রচারণা চালানো।

নগরস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জনঘনত্ব বিবেচনা করা অপরিহার্য। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হাসপাতাল, ডাক্তার, ওষুধের সরবরাহ সীমিত থাকলে গুণগত সেবা প্রদান সম্ভব হবে না। দ্রুত আরবানাইজেশনের সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে রোগের ঝুঁকিসংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের সংমিশ্রণ, হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ ও ক্যানসার। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, শব্দ ও বায়ুদূষণ, জীবনযাত্রার চাপ তরুণ প্রজন্মকে প্রভাবিত করছে। দরিদ্র, স্থানান্তরিত এবং বস্তিবাসী জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে সুরক্ষাহীন। স্বাস্থ্যসেবার অভাব সামাজিক অসাম্য ও বৈষম্য আরও বাড়াচ্ছে। নগরপরিকল্পনায় বয়সভিত্তিক প্রজন্ম শিশুকিশোর, যুবকযুবতী ও বয়স্কসব ধরনের মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে নগরস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা এখনও স্বপ্নের মতো। নাগরিক সমাজ, যাকে আমরা সুশীল সমাজ বলি, জনগণের পক্ষে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু নিজেদের জনগণের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ তা গুরুত্বপূর্ণ। যদি নাগরিক সমাজ নিজেই জনগণের মধ্যে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা না করে, তাহলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অন্যদের জবাবদিহিতা আশা করা যায় না।

আমরা মনে করি, নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। এ জন্য গবেষক, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বয় প্রয়োজন। নিরাপদ খাদ্য, স্বাস্থ্যশিক্ষা, নগরে হাঁটার জায়গাএসব বিষয় একসঙ্গে নিয়ে কাজ না করলে নগর স্বাস্থ্যসংকট দূর হবে না। এ বিষয়ে সিটি মেয়রের মনোযোগ বাড়াতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে