নগরীর জিইসি মোড় থেকে আগ্রাবাদ। দূরত্ব চার কিলোমিটারের কম। এই পথটুকু যেতে সিএনজিচালিত টেক্সিচালকেরা ভাড়া চাইছেন ২০০ টাকা। খুলশী থানার সামনে থেকে প্রবর্তক মোড়, দেড় কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে চাওয়া হয় ১৫০ টাকা। হালিশহর থেকে আগ্রাবাদ যেতে দুই কিলোমিটারের কিছু বেশি পথের ভাড়া ১৫০ টাকা। অথচ মিটারে চললে এসব গন্তব্যের ভাড়া এর অর্ধেকের কম হওয়ার কথা। নগরীতে এখন সিএনজি টেক্সিতে ওঠা মানে চালকের চাহিদামতো ভাড়া মেনে নেওয়া। দরদাম করে কিছুটা কমানো গেলেও নির্ধারিত ভাড়ায় গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।
শুধু উৎসব–পার্বণ কিংবা বিশেষ দিন নয়, বছরের প্রতিটি দিন এভাবে বাড়তি ভাড়া গুণতে হচ্ছে নগরবাসীকে। অভিযোগ রয়েছে, নগরীতে চলাচলকারী বৈধ–অবৈধ মিলিয়ে ২০ হাজারের বেশি সিএনজি টেক্সি থেকে প্রতিদিন দুই কোটি টাকার বেশি বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সেই হিসাবে মাসে বাড়তি ভাড়ার পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ৬০ কোটি টাকা। মিটারে ভাড়া আদায়ের সরকারি উদ্যোগ প্রায় দুই দশক আগে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে এই ভাড়ার নৈরাজ্য চলছে। যাত্রীদের অভিযোগ, ভাড়া নির্ধারণ ও আদায়ের ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় চালকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছেন।
নগরীর মোমিন রোড থেকে জিইসি মোড়ের দূরত্ব সর্বোচ্চ তিন কিলোমিটার। এ পথে যেতে ১৫০ টাকার কমে টেক্সিতে ওঠাতে চান না চালকেরা। জাকির হোসেন রোডের উইমেন কলেজ মোড় থেকে আগ্রাবাদ যেতে চার কিলোমিটারের কম দূরত্বের জন্য চাওয়া হয় ২০০ টাকা। মোমিন রোড থেকে হালিশহর যেতে ভাড়া হাঁকা হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। আগ্রাবাদ থেকে হালিশহর আবাসিক এলাকায় যেতে চাওয়া হয় ১৫০ টাকা। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এসব পথে মিটারে ভাড়া আদায় করা হলে খরচ অনেক ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে থাকার কথা। ফলে যাত্রীদের একেকটি যাত্রায় প্রায় দ্বিগুণের বেশি অর্থ গুণতে হচ্ছে।
নগরীতে বর্তমানে বৈধ সিএনজি টেক্সির সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার। এর বাইরে আরও অন্তত সাত হাজার টেক্সি অবৈধভাবে চলাচল করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। এসব অবৈধ টেক্সির রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট নেই। ফলে সরকার এসব যানবাহন থেকে প্রাপ্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ নগরীর সড়কজুড়ে দাপটের সঙ্গে চলছে এসব টেক্সি। কখনো একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে দুইটি টেক্সি, কখনোবা গ্রামের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে নগরীতে চলাচল। এভাবে বৈধ–অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
সিএনজি টেক্সিতে মিটার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০০৫ সালে। ওই বছরের ৬ এপ্রিল সরকার সার্কুলার জারি করে ভাড়ার হার নির্ধারণ করে দেয়। একই সঙ্গে ১ জুনের মধ্যে চট্টগ্রামের সব ফোর–স্ট্রোক টেক্সিতে মিটার সংযোজনের নির্দেশ দেওয়া হয়। মিটার আমদানি ও সংযোজনের জন্য ছয়টি প্রতিষ্ঠানকেও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো টেক্সিতেই মিটার সংযোজন করা সম্ভব হয়নি। পরে দফায় দফায় সময় বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে টেক্সিমালিকেরা ওই ছয়টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মিটার কেনেন। এসব প্রতিষ্ঠান টেক্সিমালিকদের কাছে অন্তত ১০ কোটি টাকার মিটার বিক্রি করেছিল। কিন্তু মিটারগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়নি। কোনো টেক্সিই নিয়মিত মিটারে ভাড়া আদায় শুরু করেনি। মিটার বিক্রির পর প্রতিষ্ঠানগুলো সরে গেলেও সেগুলো চালক, মালিক কিংবা যাত্রী কারও কোনো কাজে আসেনি। পুলিশের পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে মিটারে ভাড়া আদায় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হলেও তা স্থায়ী হয়নি। একপর্যায়ে মিটার চালুর উদ্যোগ থমকে যায়।
এরপর থেকে নগরীতে সিএনজি টেক্সির ভাড়া নির্ধারণের প্রধান পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে চালক ও যাত্রীর দরদাম। এতে যাত্রীদের দরকষাকষির সক্ষমতার ওপর ভাড়ার পরিমাণ নির্ভর করছে। কেউ কিছুটা কম ভাড়ায় যেতে পারলেও অনেককে চালকের চাহিদামতো ভাড়া দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত কিংবা যানবাহনের সংকটের সময় যাত্রীদের দরদাম করার সুযোগ কমে যায়। পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাবে নগরবাসীকে বাধ্য হয়ে সিএনজি টেক্সিতে চড়তে হচ্ছে। অস্বাভাবিক ভাড়া নিয়ে মাঝেমধ্যে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে।
নগর ট্রাফিক পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক। ভাড়ার একটি নির্দিষ্ট হার থাকা উচিত, পাশাপাশি একটি শৃক্সখলাও থাকা প্রয়োজন। কিন্তু নগরীতে টেক্সি ভাড়ার ক্ষেত্রে সেই শৃক্সখলা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। মিটার চালুর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটি কার্যত চাপা পড়ে গেছে। বর্তমানে নগরীর কোনো টেক্সিতে মিটার নেই।
তবে ভাড়া নৈরাজ্যের অভিযোগ মানতে নারাজ সিএনজি টেক্সিচালকদের একজন নেতা। তিনি বলেন, মিটারে ভাড়া আদায়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। চালক ও যাত্রী আলোচনা করে ভাড়া ঠিক করেন। কোনো চালকের চাহিদা অনুযায়ী ভাড়া পছন্দ না হলে যাত্রী অন্য টেক্সিতে যেতে পারেন। তাই একে নৈরাজ্য বলা আপত্তিকর। চালকেরা জোর করে কারও কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছেন না বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়ছে। গাড়ির যন্ত্রাংশ, গ্যাসের দাম ও মালিকের জমাসহ বিভিন্ন খরচ বেড়েছে। এসব বাড়তি ব্যয় সামাল দিয়ে চালকদেরও জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। তাই ভাড়া বাড়িয়ে না নিলে তাদের দিন চলবে কীভাবে? বাজারে একশ টাকার নিচে সবজি পাওয়া কঠিন। ফার্মের মুরগি বা তেলাপিয়া মাছের দাম জানি কি না ওই নেতা প্রতিবেদককে সেই প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, সবকিছুর বাড়তি দামের মধ্যে শুধু কয়েক টাকার সিএনজি ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়।
যাত্রীদের প্রশ্ন, সিএনজি টেক্সির ভাড়া যদি চালক ও যাত্রীর দরদামের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার কার্যকারিতা কোথায়? প্রায় দুই দশক আগে মিটার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর না হওয়া এবং ভাড়া নিয়ন্ত্রণে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় নগরবাসীর ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ ক্রমে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। নগরীর গণপরিবহনে শৃক্সখলা ফেরাতে মিটার চালু, নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর এবং অবৈধ টেক্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।









