চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিবেশ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে নগরীর ঐতিহ্যবাহী পুকুর ও দিঘি রক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এ উপলক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন মুন্সী পুকুরপাড়, চকবাজার প্যারেড মাঠ, বলুয়ারদিঘি, বাকলিয়া স্টেডিয়াম এবং সদরঘাটের বালুর মাঠ পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে মেয়র সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও সংস্কার, উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। তিনি বলেন, নগরীর পুকুর, দিঘি ও খেলার মাঠগুলোকে পরিকল্পিত সংস্কারের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলা হবে, যাতে নগরবাসী সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন। পুকুর ও দিঘি রক্ষায় জনসচেতনতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে মেয়র বলেন, বলুয়ারদিঘি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দিঘিগুলোর একটি। লোকমুখে প্রচলিত, এটি মোগল আমলে খনন করা হয়েছিল। ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষার্থে এই দিঘিটি সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। যেকোনো অগ্নিদুর্ঘটনায় এই দিঘির পানি ব্যবহার করে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আজ চট্টগ্রামে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, তার মূল কারণ হলো জলাশয়, জলাধার, দিঘি ও পুকুর দখল করে ভরাট করে ফেলা। আমি মনে করি, চট্টগ্রামের বৃহত্তর স্বার্থে ঐতিহ্যবাহী বলুয়ারদিঘিসহ যেসব পুকুর–দিঘি এখনো টিকে আছে, সেগুলো রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এলাকাবাসী সবাই এই দিঘি রক্ষায় সিটি কর্পোরেশনকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবেন বলে আমি আশা করি।
নগরে পুকুর বা জলাশয় অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুকুর, খাল, নদী–এসব জলাশয় নগরের প্রাণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জলাশয় না থাকলে নগরের তাপমাত্রা শুধু বৃদ্ধি পায় না, নগরে পানির স্তরও নিচে নেমে যায়। কিন্তু সেই পুকুর ও জলাশয়গুলোকে কিছুতেই রক্ষা করা যাচ্ছে না। তাই জলাশয় রক্ষায় বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান জরুরি। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জলাশয় সংরক্ষণ আইনসহ অনেকগুলো আইন কোনো না কোনভাবে জলাশয় দূষণ ও দখল প্রতিরোধ, সংরক্ষণ ও রক্ষা বা এ সম্পর্কিত বিষয় উল্লেখ করেছে। কিন্তু এসব আইন বাস্তবায়নও কোনো একক সংস্থার কাছে না থাকায় আইনের বাস্তবায়ন শিথিলভাবে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কোন বাস্তবায়নই হচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাছাড়া দখল ও দূষণকারীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শ আইন বাস্তবায়নে বাধার সম্মুখীন হয়।
নানা কারণে নগরীতে একের পর এক পুকুর ও দীঘি ভরাট করে বহুতল ভবন গড়ে তোলা হচ্ছে। অভিযোগ আছে, বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালীদের ছত্র–ছায়ায় পুকুর ও জলাশয় ভরাটের মাধ্যমে পরিবেশ এবং প্রতিবেশির বহুমুখী সংকট তৈরী করা হচ্ছে। পরিবেশের সুরক্ষায় আর.এস, পিএস, ও বিএস জরিপ চিহ্নিত পুকুরগুলো উদ্ধার করার জন্য দাবি উঠেছে। চট্টগ্রাম শহরে একসময় অনেক পুকুর ও জলাশয় ছিল। জলাশয়গুলো মানুষ এবং পশুপাখির পানীয় জলের চাহিদা মেটাতো। কিন্তু হারিয়ে গেছে অনেক পুকুর।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলাশয় কমে যাওয়ার ফলে একদিকে অল্প বৃষ্টিতে যেমন জলাবদ্ধতার সমস্যা আগের তুলনায় আরো বেড়েছে, তেমনি অনেক এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে, ধীরে ধীরে এই সমস্যা বড় আকার ধারণ করতে শুরু করেছে। জলাশয় ভরাট করে যেসব বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, সেগুলোও খুব ঝুঁকিপূর্ণ। ধারণা করা হয়, ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হলেই এসব ভবন প্রায় সবই ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক স্থানে অগ্নিকাণ্ডের সময়ে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সার্বিক বিবেচনায় পুকুর ও দিঘিগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া পরিবেশের জন্য অশনি সংকেত।
যারা পুকুর, দিঘি ও জলাশয়গুলো ভরাট কিংবা দখল করেছেন ও ভরাট করছেন, তাদের বেশিরভাগই আসলে লোভ ও লালসা থেকেই করছেন। ফলে পুকুর ভরাটের ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে বেআইনিভাবে এবং কখনো কখনো যোগসাজশে আইনের ফাঁক গলিয়ে। এসব ক্ষেত্রে আইন রক্ষার দায়িত্ব যে সকল প্রতিষ্ঠানের ওপর সে সকল প্রতিষ্ঠানকেও আমরা যথাযথ দায়িত্ব পালনে দেখছি না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রকৃতি প্রদত্ত কিংবা মানুষের সৃষ্টি করা বৈশিষ্ট্যসম্বলিত ও পুরনো পুকুর, দিঘি এবং জলাশয়গুলোকেই বেশি নষ্ট করা হচ্ছে, ভরাট ও দখল করা হচ্ছে। ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা জরুরি।








