পথচারীর সুবিধার্থে শত কোটি টাকা খরচ করে নগরজুড়ে সড়কবাতি স্থাপন করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্র্পোরেশন (চসিক)। অথচ এর কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রায় সময় সড়কবাতি জ্বলে না। এতে ‘ঘুটঘুটে অন্ধকার’ হয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট এলাকা। সেখানে ওত পেতে থাকে ছিনতাইকারী। দৈনিক আজাদীর সরেজমিন পর্যবেক্ষণে গণি বেকারি থেকে জামালখান পর্যন্ত এলাকাসহ অন্তত ১০টি রাস্তায় সড়কবাতি না জ্বলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এদিকে কোথাও কোথাও সড়কবাতি না জ্বলার বিষয়টি স্বীকার করেছেন চসিকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তবে এর কারণ হিসেবে বলছেন, সড়কে স্থাপিত এলইডি বাতির তার প্রায় সময় চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে চোরের দল। এতে অন্ধকার হয়ে পড়ছে সংশ্লিষ্ট এলাকা। গত ১০ মাসে অন্তত ১০টি চুরির ঘটনায় ৩৫ হাজার মিটার তার চুরি হয়েছে। এ বিষয়ে দফায় দফায় সিএমপির স্থানীয় থানাকে লিখিতভাবে অবহিত করলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত রোববার সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীও সিএমপি কমিশনার সালেহ্ মোহাম্মদ তানভীরকে চিঠি দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
গত এক সপ্তাহ ধরে রাতের বেলা নগরে বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, জামালখান থেকে গণি বেকারি, কাজীর দেউড়ি থেকে আলমাস সিনেমা হয়ে দামপাড়া, টেঙটাইল থেকে অঙিজেন, ঈদগাঁ কাঁচাবাজার রোড, বাদশা মিয়া চৌধুরী রোড, বিমানবন্দর থেকে কর্ণফুলী টানেল অফিস, সার্সন রোড, প্রবর্তক মোড় থেকে পাঁচলাইশ, অঙিজেন থেকে রৌফাবাদ, পলোগাউন্ড, কদমতলী ও স্টেশন রোড এলাকায় সড়ক বাতি জ্বলেনি।
জামালখান থেকে গণি বেকারি পর্যন্ত অংশের অন্ধকার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আইনজীবী মোস্তাফা ইমরান সোহেল পোস্ট করেছেন। তিনি লেখেন, গণি বেকারির মোড় থেকে হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ দক্ষিণ ফটক পর্যন্ত প্রায় কয়েকশ মিটার রাস্তা সম্মন্ধে বেশিরভাগ নগরবাসী ওয়াকিবহাল। এ জায়গাটি ছিনতাইকারীদের নিরাপদ জোন হিসেবে পরিচিত। তাই এ কয়েকশ মিটার নগরবাসীর জন্য আতঙ্কের নাম। এ জোনটিকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বহু লেখালেখি হয়েছে। দুপাশে পাহাড় ঘেরা এ রাস্তার ওপরে থাকা সড়কবাতিগুলো প্রায় ছিনতাইকারীরা ভেঙে দেয় বা অজ্ঞাত কারণে সড়কবাতি অচল থাকে। ফলে এলাকাটি রাতে অমাবস্যার রাতের মতো ভুতুড়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। এ অন্ধকারে আতঙ্ক ছড়িয়ে অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী ও ডাকাতরা পথচারী বা যানবাহন থামিয়ে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়। লকডাউনের প্রাক্কালে ৪ এপ্রিলেও এ রাস্তার সড়ক বাতিগুলো সচল ছিল। কিন্তু ৬ এপ্রিল থেকে একটি সড়ক বাতিও জ্বলতে দেখা যায়নি। রহস্যজনক কারণে এসব দেখার যেন কেউ নেই। অথচ এই জোন অতিক্রম করে ৩০/৪০ গজ দূরে জামালখান মোড় গভীর রাতেও সূর্যালোকের মতো উজ্জ্বল।
সিএমপি কমিশনারকে মেয়রের চিঠি : সড়কবাতি না জ্বলার কারণ হিসেবে তার চুরির কথা বলছেন চসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলীরা। এ বিষয়ে একাধিকবার থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সিএমপি কমিশনারকে দেওয়া চিঠিতে মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী লেখেন, নগরের বিভিন্ন সড়কে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক এলইডি বাতি স্থ্াপনের মাধ্যমে নগরীকে পর্যাপ্ত আলোকায়ন করে সৌন্দর্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহে এলইডি বাতি স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সংঘবদ্ধ চোরদের ক্যাবল চুরির কারণে অনেক সড়কের আলোকায়ন বন্ধ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে কোতোয়ালী, চকবাজার, পাঁচলাইশ, বন্দর, ইপিজেড ও পতেঙ্গা থানায় বিভিন্ন সময়ে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃক এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তার চুরির ঘটনা অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলমান রয়েছে।
চিঠিতে মেয়র লেখেন, পর্যাপ্ত আলোকায়ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়া সাধারণ জনগণের চলাচল ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু সংঘবদ্ধ ক্যাবল চোরদের আইনের আওতায় আনা না হলে নগরীর নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত আলোকায়ন নিশ্চিত করা দুরূহ হয়ে পড়বে। এ বিষয়ে বিশেষ টিম গঠন করে সংঘবদ্ধ চোরদের আইনের আওতায় আনার অনুরোধ করেন মেয়র।
চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) ঝুলন কুমার দাশ আজাদীকে বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার মিটার তার চুরি হয়েছে। একটি পোলের তার চুরি হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সড়কবাতি জ্বলে না। পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। তার চুরি হলে নতুন ক্যাবল স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেক্ষেত্রে সামান্য সময় লাগে। তিনি বলেন, তার চুরির বিষয়টি বিভিন্ন থানাকে অবহিত করেছি। কিন্তু সমস্যার সমাধান না হওয়ায় চুরি অব্যাহত আছে। তার চুরি হওয়ায় প্রায় সময় সড়ক অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
সিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) শাহ মো. আবদুর রউফ আজাদীকে বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি অন্ধকার স্থানে অপরাধ করতে সুবিধা হয়। সেজন্য মাদকসেবী বা অন্য অপরাধীরা যেখানে বাতি লাগানো হয় তা চুরি করে বা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। অনেক সময় তার চুরি করলে সেখানে থাকা সিসিটিভিকে অকেজো করা যায়। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং সেটা চলমান। এরপরও কোথাও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা আইনি পদক্ষেপ নেব।












