সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ঘোষণা দিয়েছেন যে, বাসা–বাড়ি থেকে সরাসরি ময়লা–আবর্জনা সংগ্রহে নগরবাসী থেকে আলাদা কোনো ফি নেওয়া হবে না। আগামী ১ মার্চ থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ময়লা সংগ্রহে বাসা–বাড়ি থেকে ৭০–৮০ টাকা করে নেওয়া হত। মার্চ থেকে বিনামূল্যে নেওয়া হবে। তবে নগরবাসীর কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে, আমাদের যেসব কর্মচারী আপনাদের কাছে ময়লা নিতে আসবে তাদের নিয়মিত ময়লা দিয়ে দিবেন। গত সোমবার আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, ময়লা সংগ্রহে ফি না নেওয়ার কারণ হিসেবে ডা. শাহাদাত বলেন, নগরবাসী অনেকে এই টাকা দিতে রাজি হতেন না। আবার নানারকম অভিযোগ ছিল। তাই আমরা এই টাকা নেওয়াটাই বন্ধ করে দিচ্ছি। আমাদের কর্মচারীদের সঙ্গে বর্তমান ভেন্ডারদের সমন্বয় করে দেওয়া হবে। সঙ্গে আমাদের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দেওয়া হবে। সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ময়লা সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তিনি বলেন, দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলোতে আমরাই প্রথম যারা ময়লা থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করার উদ্যোগ নিয়েছি হালিশহরে। এখন আমরা ফিজিবিলিটি স্টাডির শেষ পর্যায়ে আছি। এটি যদি বাস্তবায়িত হয় এই ময়লা দিয়ে চট্টগ্রামকে আমরা সম্পদে পরিণত করতে পারব। বায়োগ্যাস প্রকল্পের জন্য ৩ হাজার থেকে ৩২শ মেট্রিক টন ময়লা কালেকশন করার চিন্তাভাবনা ছিল জানিয়ে মেয়র বলেন, আমরা ২২০০ মেট্রিক টন ময়লা পাচ্ছিলাম। ৮০০–১০০০ মেট্রিক টন ময়লা বাইরে ফেলে দিচ্ছিল জনগণ। যার কারণে আমরা ডোর টু ডোর প্রকল্পটা জোরদার করেছিলাম। এরপর আমরা ৪০০–৫০০ মেট্রিক টন ময়লা এক্সট্রা কালেকশন করতে পেরেছি, সেখানে ৭০–৮০ টাকা করে নেওয়া হতো।
অনেক বিষয়ে সাফল্য অর্জনের কথা স্বীকার করেও বলতে হয়, নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের আন্তরিক তৎপরতা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তুলতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলা জরুরি। তা না হলে সব উন্নয়ন প্রকল্প ভেস্তে যাবে বলে আশংকা রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মীদের ওপর খোদ মেয়রের আস্থা নেই। তিনি তাদের বিরুদ্ধে কাজে ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, অভিযোগ রয়েছে অনেকে সাইন করে চলে যাচ্ছেন, কিন্তু কাজ করছেন না। এই ধরনের কাজে যারাই জড়িত থাকবেন, সেই ওয়ার্ডের সুপারভাইজারদের আমি দায়ী করব। সবাইকে কাজে লাগিয়ে শহরকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিচ্ছন্ন শহর মানেই বাসযোগ্য শহর। নগরের প্রতিটি কোণে যদি পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে, তা শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না– মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পরিবেশও রক্ষা করে। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য সঠিকভাবে পরিচালনা করা এখন একান্ত জরুরি। চট্টগ্রাম নগরী বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের চলাচল ও কার্যক্রমের ফলে তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য। একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। নগরবাসীর জন্য পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নিয়মিতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করে যাচ্ছে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে প্রতিদিনই চট্টগ্রাম নগরে কঠিন, প্লাস্টিক, চিকিৎসা, নির্মাণসহ নানা ধরনের বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যা জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন আধুনিক প্রযুক্তি, পরিকল্পিত কৌশল এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
আমরা জানি, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অনেকগুলো কাজের মধ্যে মূল দায়িত্ব তিনটি। রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামত, পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম পরিচালনা, শহর আলোকায়ন করা। কিন্তু সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয়ে পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমসহ অন্যান্য অপরিহার্য সেবা শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। কয়েক বছর আগে বিলবোর্ড অপসারণ করে নগরীর সৌন্দর্য রক্ষায় যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে অভিনন্দন জানিয়েছিল নগরবাসী। কিন্তু এখন নগরী আবার পরিণত হয়েছে জঞ্জালে। এর বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে অ্যাকশনে নামতে হবে। যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান অবৈধ সাইনবোর্ড ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে এবং নগরীর সৌন্দর্যহানি করছে, অনতিবিলম্বে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। সাইনবোর্ড বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলতে হবে। জনস্বার্থে একটা বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে এভাবে, সাত দিনের মধ্যে অবৈধ সাইনবোর্ড স্ব–উদ্যোগে সরিয়ে ফেলুন, নইলে সিটি কর্পোরেশন তা উচ্ছেদ করবে এবং জরিমানা প্রদান করবে।
তাই বলা যায়, নাগরিকদের সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন, টেকসই ও উন্নত চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।







