দ্রুত লাইটারেজ জাহাজ ও আইসিডিতে নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহের আহ্বান

জ্বালানিমন্ত্রীর নিকট বিডব্লিউটিসিসি ও বিকডার চিঠি প্রেরণ

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ১০ মার্চ, ২০২৬ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ

জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর এলাকায় পণ্য খালাস কার্যক্রম বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে বলে উল্লেখ করে লাইটারেজ জাহাজের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) দ্রুত সংকটের সুরাহা এবং লাইটারেজ জাহাজগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন এবং দ্রুততার সাথে ডিজেল সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছে। গতকাল জ্বালানি মন্ত্রী বরাবরে প্রেরিত এক জরুরি চিঠিতে সংস্থাটির কনভেনর হাজী সফিক আহমেদ এই আহ্বান জানান।

হাজী সফিক আহমেদ জানান, আমদানিকৃত পণ্যবাহী মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে নিয়োজিত লাইটারেজ জাহাজগুলো প্রয়োজনীয় ডিজেল না পেয়ে কর্ণফুলী নদী এলাকায় অলস সময় কাটাচ্ছে। এতে আমদানি বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া ছাড়াও দেশের অভ্যন্তরীণ সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে কয়েক দিনের মধ্যেই বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এ অবস্থায় লাইটারেজ জাহাজে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, লাইটারেজ জাহাজে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বন্দর ও জাহাজ মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, দেশে পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় হাজার লাইটারেজ জাহাজ সক্রিয় রয়েছে। এসব জাহাজের ওপর নির্ভর করেই বহির্নোঙরে অবস্থান করা বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করা হয়। ড্রাফটজনিত কারণে অনেক বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরের জেটিতে ভিড়তে না পারায় সেগুলো বহির্নোঙরে নোঙর করে এবং পরে ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে পণ্য জেটি কিংবা দেশের বিভিন্ন নদী বন্দরে পাঠানো হয়। ফলে বহির্নোঙরের পুরো কার্যক্রমই লাইটারেজ জাহাজের ওপর নির্ভরশীল। বিডব্লিউটিসিসির তথ্যমতে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরএর বহির্নোঙরে বিভিন্ন বাল্ক পণ্য নিয়ে প্রায় ৭৩ থেকে ৭৪টি মাদার ভেসেল অপেক্ষমাণ রয়েছে। এসব জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও পরিবহনের জন্য প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক জাহাজই নির্ধারিত সময়ে বহির্নোঙরে যেতে পারছে না। প্রতিদিন এসব জাহাজের চলাচলের জন্য গড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয় বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের অভিযোগ, আগে ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত জ্বালানি পাওয়া গেলেও বর্তমানে তেল বিপণন কোম্পানিগুলো রেশনিং করায় প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। নদীপথে জ্বালানি সরবরাহকারী বাংকার্রিং ব্যবসায়ীরাও পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। এতে অনেক জাহাজ বরাদ্দ পেলেও তেলের অভাবে মাদার ভেসেলের কাছে যেতে পারছে না। লাইটারেজ জাহাজ অপারেটর শেখ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, আগে যে পরিমাণ তেল পাওয়া যেত এখন তার অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা মজুদ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তেল চাই না, শুধু জাহাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি চাই। কিন্তু সেই তেল না পাওয়ায় অনেক জাহাজ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ডিজেল ছাড়া আংশিক ডিজেল নিয়ে কোন জাহাজেরই পক্ষে সাগরে যাত্রা করা সম্ভব নয়। সাগরে তেল ফুরিয়ে গেলে জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করে চালানো অসম্ভব। স্থলভাগে তেল ফুরালে কোন না কোন পাম্প থেকে যোগাড় করা যায়, কিন্তু সাগরে সেটি সম্ভব নয়। তাই লাইটারেজ জাহাজে রেশনিং করে আংশিক তেল দেয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আমরা বাড়তি তেল চাচ্ছি না, বিপণন কোম্পানির কাছে আমরা স্বাভাবিক সময়ে কি পরিমাণ তেল নিতাম তার রেকর্ড আছে। সেই রেকর্ড দেখেই আমাদের প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ দিলেই বিদ্যমান সংকটের সুরাহা হবে। অন্যথায় লাইটারেজ জাহাজগুলো মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাসের জন্য যেতে পারবে না।

বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে খাদ্যশস্য, সার, কয়লা, ক্লিংকার ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য খালাস করা হয়। এসব জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে শুধু বন্দরের কার্যক্রমই নয়, পুরো দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। শিপিং ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পণ্য খালাসে বিলম্ব হলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ডেমারেজ বা জাহাজ ভাড়া গুনতে হবে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পণ্যের বাজারমূল্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

বিডব্লিউটিসিসির কনভেনর হাজী সফিক আহমেদ বলেন, বহির্নোঙরের কার্যক্রম পুরোপুরি লাইটারেজ জাহাজের ওপর নির্ভরশীল। এই জাহাজগুলো চলতে না পারলে বন্দরের অর্ধেক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। তাই দ্রুত লাইটারেজ জাহাজগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই বহির্নোঙর এলাকায় পণ্য খালাস কার্যক্রম বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। এতে আমদানি বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অপরদিকে বেসরকারি আইসিডি মালিকদের সংগঠন বিকডা জরুরি ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহ দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে গতকাল মন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট আলহাজ্ব খলিলুর রহমান স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়েছে যে, চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম বহুলাংশে বেসরকারি আইসিডিগুলোর উপর নির্ভরশীল। বেসরকারি আইসিডিগুলোতে কন্টেনার হ্যান্ডলিং এবং পরিবহনে প্রতিদিন ৬০/৬৫ হাজার লিটার ডিজেল লাগে। কন্টেনার হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট পরিচালনা করতে এই তেল লাগে। নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহ না পেলে এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। যা বন্দরের সার্বিক উৎপাদনশীলতায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিকডা প্রেসিডেন্ট বেসরকারী আইসিডিগুলোতে প্রয়োজনীয় ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে মন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআকাশপথে কাটেনি সংকট
পরবর্তী নিবন্ধহাদি হত্যার ঘটনায় ভারতে আটককৃতদের বিষয়ে কনস্যুলার অ্যাক্সেস চেয়েছে বাংলাদেশ : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী