কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না পাহাড় কাটা। অবিরাম চলছে পাহাড় কাটার যজ্ঞ। পাহাড় কেটে ছোট্ট পরিসরেই গড়ে তোলা হচ্ছে বসতি। মনে হচ্ছে পাহাড় কাটার উৎসব চলছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি, বিভিন্ন স্থানে অবাধে পাহাড় কাটা চলছে। এই মাটি নিচু এলাকা ভরাটের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিদিন ট্রাক্টর বোঝাই করে মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। পাহাড় কাটার কাজ শুরুর আগে সেখানে অনেক গাছগাছালি ছিল। সেগুলো প্রথমে পরিষ্কার করা হয়। তারপর তারা মাটি কেটে নিয়ে যায়। পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষেধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কাটা চলছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন পাহাড় কাটা বন্ধে কোনো ভূমিকা রাখছে না বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। পাহাড় কাটার কারণে বেশ কিছু বনজঙ্গল কাটা পড়েছে। ন্যাড়া হয়ে পড়েছে বিভিন্ন পাহাড়ের বিশাল এলাকা। এভাবে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।
গত ২২ জানুয়ারি ‘আস্ত পাহাড় কেটে সাবাড়’ শীর্ষক প্রকাশিত আজাদীর প্রতিবেদনে জানা যায়, দোহাজারীতে প্রকাশ্যে একটি পাহাড়ের সিংহভাগ কেটে সাবাড় করেছে পাহাড় ও মাটি খেকোরা। চন্দনাইশের দোহাজারী পৌরসভার জামিজুরী হাফছড়িকুল পাহাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। শুধু দোহাজারী জামিজুরী এলাকা নয়, পুরো চন্দনাইশের পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড় কাটছে মাটিখেকোরা। এসব মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহের পাশাপাশি ফসলি জমি ও ভিটে ভরাটে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেআইনিভাবে পাহাড় কাটার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
এদিকে পাহাড় কেটে মাটি পরিবহন করতে গিয়ে বেহাল অবস্থা দোহাজারী পৌরসভার অধীনে প্রথম কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাফছড়িকুল আরসিসি সড়কটির। মাটিবাহী ডাম্পার চলাচলের কারণে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে দেবে যাওয়ায় চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। তবে পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসন জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেও চন্দনাইশে তা মানা হচ্ছে না। প্রচলিত আইন অমান্য করে পাহাড় কাটায় ক্ষোভ জানান স্থানীয়রা। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রকাশ্যে দিনরাত সমান তালে কাটা হয় পাহাড়। পাহাড় কেটে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ফেলা হচ্ছে। মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে ইটভাটায় এবং ফসলি জমি ও ভিটে ভরাট করার কাজে। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও থামছে না পাহাড় কাটা। এভাবে পাহাড় কাটার কারণে বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা।
পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ–দিনের পর দিন পাহাড় কেটে বসতি নামের মৃত্যুপুরী গড়ে তোলা হলেও তা নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের যেন কোনো মাথা–ব্যথাই নেই। অথচ পাহাড় কাটা রোধ ও বিপন্ন হওয়া থেকে পরিবেশ রক্ষায় সরকারের আইনগত প্রতিষ্ঠান এটি। যতক্ষণ তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে অভিযোগ না আসে কিংবা গণমাধ্যমে রিপোর্ট না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকাশ্যে পাহাড় কাটার ধূম চললেও তাদের তেমন পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। যদিও এ অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি পরিবেশ অধিদপ্তরের। পাহাড় কাটা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারার নেপথ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতাকেই বড় করে দেখেন পরিবেশবিদরা। তাঁরা বলেন, ক্ষমতাশালী লোক যদি পাহাড় কাটে তাহলে অধিদপ্তরের কতটুকুইবা করার মতো থাকে। তাই অধিদপ্তরের পদক্ষেপকে ছোট করে দেখাটা ঠিক হবে না।
পাহাড়খেকোদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে শঙ্কিত সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে পাহাড়খেকোরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো সাবাড় হওয়ার শঙ্কা দিনে দিনে প্রকট হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকে সমাজের স্বার্থান্বেষী মানুষ আর বিগত সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে বিলুপ্ত হয়েছে চট্টগ্রামের প্রায় ১৩০টির অধিক পাহাড়। আধুনিক সভ্যতার আধুনিকায়নে চট্টগ্রামের পরিবেশ যেন এক গুমোট বাঁধা নৈরাজ্যের সাক্ষী। তাই পাহাড় কাটা রোধে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া চট্টগ্রামের পাহাড় কাটা রোধে প্রয়োজন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ। অতি দ্রুত অভিযান চালিয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।








