দেড় দশক পর হালদার উজানে বন্ধ হয়েছে তামাক চাষ

সবজি চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি | মঙ্গলবার , ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর উজানে ও শাখাপ্রশাখার তীর ঘিরে গত দেড় দশক চলমান থাকা ক্ষতিকর তামাক চাষ থেকে সরে এসেছেন প্রান্তিক কৃষকরা।

হালদার উজান মানিকছড়ি উপজেলার ঘোরখানা, তুলাবিল, ছদুরখীল, আছাদতলী ও যোগ্যাছোলা অংশে দীর্ঘ দেড় দশক তামাক কোম্পানির লোভনীয় অফারে থাকা তামাক চাষিদের বিকল্প জীবিকায়ন সৃষ্টি হয়েছে। হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এবং কৃষি বিভাগের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইডিএফ ও পিকেএসএফ এখানকার কৃষকদের মৌসুমী সবজি, ফলজ বাগান, হাঁসমুরগি, গরুছাগল, ধানগম, আপেল কুল, আম ও আনারসসহ নানা প্রকার চাষাবাদে পাশে দাঁড়িয়েছে। ফলে হালদাচরে শীতকালীন এবং গ্রীষ্মকালীন সবজিতে কৃষি বিপ্লবের হাতছানি দৃশ্যমান।

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত বছর পর্যন্ত হালদা পাড়ে ১১ জন তামাকচাষী প্রায় ২০ একর জমিতে তামাক চাষ করেছিলেন। তবে হালদা নদী ও এর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে গত ৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত সরকারি গেজেটে হালদা নদীর পাড়ে তামাক চাষ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকেই চলতি মৌসুমে তামাক চাষ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় খাগড়াছড়ি জেলা মৎস্য দপ্তর এ উদ্যোগের নেতৃত্ব দেয়। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি ও মাসিক সমন্বয় সভায় জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গেজেটের বিষয়টি তুলে ধরে জেলা প্রশাসন, কৃষি অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের সহযোগিতা কামনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় মানিকছড়ি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হালদা পাড়ের ১১ জন তামাকচাষির সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করে তামাক চাষ নিষিদ্ধের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানান। এছাড়া তামাক চাষ নিষিদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয় এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বা গোপন তামাক রোপণ রোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হয়। জেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট তামাক কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করা হলে তারা হালদা পাড়ে তামাক চাষ থেকে বিরত থাকতে সহযোগিতার আশ্বাস দেয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

গতকাল হালদার উজানের গোরখানা, আছারতলী ও বড়বিল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীর চর ঘেঁষে কৃষকরা বেগুন, বরবটি, লাউ, আলু, মরিচ, গম ও কাঁকরোল চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ কেউ শীতকালীন সবজি তুলে ইতোমধ্যে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ শুরু করেছেন। স্থানীয় কৃষক মো. নূর আলম বলেন, বিগত ১২১৪ বছর ধরে আমরা তামাক চাষ করেছি। বিকল্প চাষাবাদে উৎসাহ পেয়ে এবং তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জেনে এখন তামাক চাষ ছেড়ে দিয়েছি। সরকারি সহযোগিতা পেলে হালদাচরে বড় ধরনের কৃষি বিপ্লব সম্ভব।

গম চাষি আবদুল মজিদ বলেন, হালদা পাড়ের মাটি খুব উর্বর। তামাক ছেড়ে এবার প্রথমবার গম চাষ করেছি। আমার ২০ শতক জমিতে ফলন ভালোই মনে হচ্ছে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের নানা কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে হালদা পাড়ে তামাক চাষের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করা হয়েছে। সরকারি গেজেট অনুযায়ী তামাক চাষ নিষিদ্ধ বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে এবার হালদা পাড়ে তামাক চাষ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। এতে হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃষকরা লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প চাষাবাদে যুক্ত হচ্ছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জহির রায়হান বলেন, এক সময় হালদা চরের প্রান্তিক কৃষকরা তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছিলেন। এখন তামাক চাষ নিষিদ্ধ হওয়ায় হালদাচর তামাকমুক্ত। কৃষকদের আধুনিক ও লাভজনক চাষাবাদে সম্পৃক্ত করতে সরকার প্রণোদনাসহ নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশকে কোনো জরিমানা বা নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে না আইসিসি
পরবর্তী নিবন্ধলোহাগাড়ায় শ্বশুরবাড়িতে যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ