না তা না। আমি কে এফ সি চিকেন খাবো না, বার্গার কিং এর বার্গারই খাবো। এখানকার এরা ইংরেজি একটুও বোঝে না। আমি ওদের জিজ্ঞেস করছিলাম ওয়াই ফাই এর পাসওয়ার্ড কী? ওরা কিছু না বলে শুধু তাকিয়েছিল আমার দিকে। তারপর আইপ্যাড নিয়ে, ওটাতে যে ওয়াই ফাইয়ের নাম দেখাচ্ছিল সেটা ওদের সামনে ধরে রেখে বেশ ক’বার জিজ্ঞেস করার পর, একজন আঙ্গুল দিয়ে আমাকে ঐ কে এফ সির দিকে দেখিয়ে দিয়েছিল। তাই ওখানে গিয়েছিলাম, বলতে বলতে টয়লেটের একটা বুথে ঢুকে দীপ্র বন্ধ করে দিল দরজা।
এইমাত্র বলা পুত্রের বয়ানের মানে কিছুটা আঁচ করতে পারলেও, যাকে বলে পুরোপুরি হৃদয়ঙ্গম করা, তা করতে পারলাম না। কিন্তু তা নিয়ে এ মুহূর্তে মাথাব্যথা নেই মোটেও। কারণ ঐ প্রাকৃতিক ক্রিয়ার ঘর থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক কর্মটি শেষ করেও বেরুলেইতো তার মীমাংসা করা যাবে। এক্ষণে যা নিয়ে বরং বেশ অবাক হলাম তা হলো, ও এই আম্রিকান ত্বরাখাবারের মানে ফাস্ট ফুড চেইনের আউটলেটের যে রকম তড়িঘড়ি দৌড়ে ঢুকেছিল সবার আগে, তাতে ভেবেছিলাম নিশ্চয় ওর ক্ষুধা লেগেছে জবর। আর সেটাই তো স্বাভাবিক। কারণ একে তো সময় গড়িয়ে দুপুরের খাবারের সময়ও যাই যাই করছে এখন! তার উপর যোগ হয়েছিল পায়ে হেঁটে পাহাড়ে চড়ে মহাপ্রাচীর দর্শনের ধকল। অতএব আউটলেটিতে ঢোকার পর, পুত্রকে খাবারের অর্ডার দেবার নেবার কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভেবেছিলাম, বেচারা হয়তো খিদের জ্বালায় অর্ডার দিচ্ছিল বুঝি খাবারের। মেন্যু তো আগেই ঠিক করা হয়ে গিয়েছিল দু ভাইয়ের, সেই মহাপ্রাচীরের উপরেই। অতএব সেটাই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু এখন তো দেখছি ঘটনা অন্য! খিদে ওর যতোই পেয়ে থাকুক, তার চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে ও ছটফট করছিল সেই সকাল থেকে ইন্টারনেটের মহাসড়ক থেকে বিচ্ছিন্নতাজনিত কারণে! ফলে এই আউটলেটে ঢুকে, খাবারের অর্ডার দেয়ার আগে তার দরকার পড়েছে ওয়াই ফাইয়ের পাসওয়ার্ড! হায়রে কী যে এক আচনক অমোঘ আকর্ষণ এই অন্তর্জালিক মহাসড়কের, যে কি না ভুলিয়ে দেয় আজ ক্ষুধার্ত বালকের ক্ষুধাও। আমাদের সমাজের প্রাচীনপন্থিয়ের মধ্যে যারা মুসলিম, এই কথা শুনলে তারা নির্ঘাত রায় দিত যে এ হল আখেরি জমানা। কেয়ামত যে নজদিক। আর এ হচ্ছে তারই পরিষ্কার নমুনা। আর সনাতনধর্মী কেউ হলে গেয়ে উঠতেন গান, ছাগলে চাটে বাঘের গাল, হায়রে কি কলিকাল! মোটকথা হচ্ছে জাত কূল ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের সমাজের প্রাচীনপন্থীরা, আধুনিকতার বা বিজ্ঞান মনষ্কতার ব্যাপারে আছে দাঁড়িয়ে একই সমতলে। অথচ ন্যূনতম ছুতাতেই তারা ভিন্ন ধর্মীদের কোপানোর জন্য হয়ে উঠে জেহাদি।
আরে ধ্যাত। কোত্থেকে মন যাচ্ছে কোথায়! নিজের মনের লাগাম নিজেই তো পারি না সামলাতে দেখছি। ছিলাম কোথায় ক্ষুধার্ত পুত্রের খাবারের অর্ডার দেবার বদলে ওয়াই ফাইয়ে সংযুক্ত হওয়ার ব্যাকুল আকুলতা নিয়ে, সেটিরই লেজ ধরে কী না মন আমায় নিয়ে গেল আমাদেরই সমাজের গভীর অসুখ, হীন কূপমণ্ডূকতাপ্রসূত সামপ্রদায়িকতায়! নাহ বাদ থাকুক ঐ চিন্তা আপাতত।
আচ্ছা বলতো দীপ্র, ব্যাপারটা ঠিক পরিষ্কারভাবে বুঝলাম না। ঐ কাউন্টারে গিয়ে খাবারের অর্ডার দাও নি কেন তুমি? আর ওদের কাছে ওয়াই ফাইয়ের পাসওয়ার্ড জানতে চাওয়ার পর, সে কথা যদি তারা না বোঝে তবে তো চুপ থাকার কথা ওদের। কে এফ সি দেখিয়ে দেবে কেন ওরা তোমাকে? এরই মধ্যে টয়লেট থেকে বেরিয়ে দীপ্র হাত মুখ ধোয়া শেষ করতেই ওকে নিয়ে টেবিলে ফিরতে ফিরতে জিজ্ঞেস করলাম।
‘ওহ বুজতে পারছ না। ওয়াই ফাই আছে কি না দেখার জন্য আমি আইপ্যাড খুলে চেক করতেই দেখি আছে একটা ওয়াই ফাই। তবে খুব স্ট্রং না সিগনাল। আর সেই কানেকশনের নামটা চায়নিজে লেখা। আমি মনে করলাম ওটা বার্গার কিং এরই হবে, তাই ওদের বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম পাসওয়ার্ড কী। প্রথমে তো বুঝতেই পারেনি ওরা, কী বলছি আমি! পরে আই প্যাডের কানেকশন দেখিয়ে যখন আবারো জিজ্ঞেস করলাম, তখন ওরা ঐ কে এফ সির দিকে দেখিয়ে দেয়ায় বুঝলাম ওটা ওদের ওয়াই ফাই। তাই তো ওখানে গিয়েছিলাম, যদি দেয় ওরা পাসওয়ার্ড’।
ঠিক এটাই ভেবছিলাম আমিও। আমার সেই ভাবনাটি যে সঠিক ছিল, দীপ্রর এই বিস্তারিত বয়ানে তা প্রমাণিত হতেই, পেটের ক্ষিধের চেয়ে এখনকার প্রজন্মের কাছে ডিজিটাল ক্ষুধার গুরুত্বই যে সমধিক সে ব্যাপারে অনেকটা পাকাপোক্তভাবেই নিশ্চিত হওয়া গেল। সাথে সাথেই মনের দ্বিতীয়জন জানালো যে পরিসংখ্যানগতভাবে স্যাম্পল সাইজ বলতে যা বোঝায়, এখানে তো তেমন কোনো স্যাম্পলই ছিল না। মাত্র একজনের আচরণের উপর ভিত্তি করে এরকম নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসা ঠিক না। এদিকে ততোক্ষণে টেবিলের কাছে পৌঁছে যেতেই, মনের ভেতরের এ বিষয়ক সম্ভাব্য বাকবিতণ্ডা কে ধামাচাঁপা দিয়ে, চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললাম, কে এফ সি নিশ্চয় তার ওয়াই ফাই শুধু তাদের কাস্টমারদের জন্য রেখেছে। তুমি খাবে বার্গার কিং আর ব্যবহার করবে কে এফ সির ওয়াই ফাই, এরকম তো নিশ্চয় তারা হতে দেবে না। চায়নিজরা কিন্তু জাত ব্যবসায়ী।
‘হ্যাঁ জানি। কিন্তু তারপরও চেষ্টা করলাম আর কী। কিন্তু ওরাও মনে হলো ইংরেজি আরো কম বোঝে। তাই চলে এসেছি’। বলতে বলতে দীপ্র টেবিলে রেখে যাওয়া তার হাত যন্ত্রটি ওর পিঠ ব্যাগের যথাস্থানে রাখতে রাখতে বেশ বিরক্ত হয়েই বলল, ‘এরা এতো দেরী করছে কেন খাবার দিতে। এখানে তো আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। চল তো অভ্র যাই কাউন্টারে ’।
‘না না কী দরকার ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার। আমরা তো এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি সব। খাবারের ট্রে কাউন্টারে রাখলেই গিয়ে নিয়ে আসলে চলবে। এখন এদিকে আস তুমি। তোমার হাতে মুখে লোশন লাগিয়ে দেই’। মায়ের এই কথায় একটু আগে লেগে যাওয়া মা পুত্রের খিটিমিটির ব্যাপারে সন্ধি করার জন্যই হোক কিম্বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক, বিনা বাক্যব্যয়ে দীপ্র গিয়ে মায়ের গা ঘেঁসে দাঁড়াতেই, একটু আগে কাউন্টার থেকে তুলে আনা সেই লিফলেটটি টেবিল থেকে তুলে মনোযোগ দিলাম তাতে আমি নিজে।
তিন ভাজের দ্বিভাষিক এই লিফলেটটি এই মুতিয়ানু গ্রেটওয়াল কর্তৃপক্ষের নাকি কোন ট্রাভেল এজেন্সির বুঝতে পারলাম না ঠিক। এটির প্রথম তিন পাতায় যা লেখা আছে, তা মোটামুটি জেনে গেছি এর মধ্যে। হোটেল থেকে সকালে রওয়ানা দেয়ার আগে যে লিফলেটটি ধরিয়ে দিয়েছিল হাতে মিস ইনা, সেটিতে এ বিষয়ে যা লেখা ছিল, অনেকটা তাই লেখা আছে এটিতেও। তবে লিফলেটটি আমুল উল্টে সেদিকটায় নজর দিতেই, ছবি দেখেই বুজে গেলাম, আমার জন্য না হলেও পুত্রদের জন্য একটা মজার বিষয় যে ছিল এখানে, তা জানলামই এই মাত্রই।
হ্যাঁ লিফলেটটির উল্টা দিকের তিন অংশে কেবলকার, চেয়ার লিফট আর টবোজ্ঞান নামের তিনটা মজার রাইডের সচিত্র বর্ণনা আর সেসবের টিকিটের দাম লেখা আছে। এতেই বুঝতে পারলাম যে আসলে কেন এই দিকটা এতোটা জনবিরল। সাথে এও মনে পড়ল যে টিকিট কাটার সময় লি খাঁ, ঐ যে ব্যাটারি গাড়িগুলো দেখিয়ে কী যেন বলছিল আমাকে, যার দিকে মোটেও পাত্তা দেইনি তখন; এখন এই লিফলেট পড়ে বুঝতে পারছি যে , টিকিট ঘর থেকে এক দেড় কিলোমিটার দূরে গেলেই দেখা মিলতো ওসবের। আর বেশির ভাগ দর্শনার্থীর কাছে সেটাই হল এখানকার মূল আকর্ষণ। অতএব এদিকটা ফাঁকা রেখে গেছে বেশিরভাগই ঐদিকে।
আহা কী যে মিস হয়ে গেল। কেবল কারে করে যদি উঠানামা করতাম মহাপ্রাচীরে একদিকে তাতে বাঁচতো যেমন অনেক সময়, অন্যদিকে মজাও পেতো সবাই। হেলেন বাদে আর সবার সিঙ্গাপুরে কেবল কারে চড়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও, ওর জন্য এটা হতো এক নতুন অভিজ্ঞতা। তবে বেশি উত্তেজনাকর হতো যদি মহাপ্রাচীরের উপরে চেয়ার লিফটে উঠে, ঐ টবোজ্ঞান দিয়ে ছেঁচড়ে নামা যেত নীচে। অবশ্য এই লিফলেটে পরিষ্কার লেখা আছে টবোজ্ঞান দিয়ে ছেঁচড়ে নামতে হলে খুব দুঃসাহসী না হলেও মহাপ্রাচীর অভিযাত্রীর বুকে মোটামুটি সাহস থাকতে হবে !
টবোজ্ঞান নামের এই রাইডটির নাম নিজেই আমি এই প্রথম শুনলাম। না শুনলাম তো না, পড়লাম এইমাত্র এই লিফলেটে। সাথে যদি ছবি না থাকতো তবে ইহা যে কী বস্তু, তা বুঝতে কষ্টই হতো। ছবি দেখে যা বুঝতে পারছি তা হলো, এ হলো পাহাড়ের উপর থেকে ছোট্ট ট্রলিতে বসে, স্টিলের পাত দিয়ে ড্রেনের মতো করে বানানো সরু পথ দিয়ে ছেঁচড়ে নীচে নেমে আসা। আর এতে উপর থেকে নীচে নামতে নাকি লাগতো মোট পাঁচ মিনিট। এ নিয়ে যা বর্ণনা দেয়া আছে এই লিফলেটের চিংলিশে, তা পড়ে এর মাথামুণ্ডু কিছু না বুজলেও; ছবি দেখে এ পথ দিয়ে নিম্নগমনের যে ধারনা পেলাম, তাতে নিশ্চিত বলতে পারি, এ নিয়ে দীপ্রর তুঙ্গ উৎসাহ থাকলেও অভ্র অবশ্যই ভয়ে উঠতে চাইতো না এতে। এছাড়া এটি তাদের মা আর ফুপ্পির কাছে মোটেও অনুমোদিত হতো না।
এমনকি চেয়ার লিফট নামের খোলামেলা উড়াল চেয়ারে করে পুত্রদের নিয়ে ঐ রোপ ওয়ে দিয়ে উপরে উঠার ব্যাপারেও নির্ঘাত প্রবল আপত্তি থাকতো লাজুর। সেদিক থেকে কেবলকার নিয়ে কারোই আপত্তি থাকার কথা ছিল না, বরং মজাই পেত সবাই। তদুপরি পায়ে হেঁটে উঠানামা করতে গিয়ে অল্পবিস্তর যে বেচাইন অবস্থা হয়েছে সকলের, তা থেকে বাঁচতো সবাই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, এতে বাঁচতো অনেক সময়। এ ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম–
আহা, সকালে হোটেল থেকে যে লিফলেটটা দিয়েছিল তাতে যদি এ খবরটা থাকতো, তাহলে এরকম কষ্ট করতে হতো না কারো। বরং খুবই মজা হতো
‘কেন ?’
‘দেখি, দেখি?’
‘কী লেখা আছে এটাতে?’
‘কী হয়েছে?’
একই সাথে চার জনের মুখ থেকে এই চার প্রশ্ন একই সাথে আমার দিকে ছুটে আসতেই, দীপ্রর হাতে লিফলেটটি হস্তান্তর করে জানালাম যে, এখান থেকে আরো এক দেড় কিলোমিটার দূরে গেলেই কেবলকারে করে উঠা নামা করা যেতো মহাপ্রাচীরে।
‘আরে তাইতো! আহা কী মিস হয়ে গেল বাবা! ‘লিফলেটের ছবিতে নজর দিয়েই দীপ্র হাহাকার করে উঠতেই তুমুল আগ্রহে অভ্র যোগ দিল ভাইয়ার সাথে সে ছবি দেখায়।
‘ইস! ওটাতে যে টিকিট কিনেছিলি তাতেই ওঠা যেতো নাকি?’ হেলেনের এই জিজ্ঞাসার সাথে সাথে লাজু বলে উঠল–
‘তুমি আগে খোঁজ নেবে না। এভাবে এরকম পা নিয়ে যে উঠানামা করে তো অবস্থা এখন খারাপ আমার !’
‘না না , মা আলাদা টিকিট লাগতো। এখানে লেখা আছে ওয়ান ওয়ে ১০০ রেন মেন বি। আর টু ওয়ে ১৪০। তবে বাবা, আমি কিন্তু কেবল কার না, চেয়ারলিফটে উঠে ঐ টবোজ্ঞানেই নামতাম তোমার সাথে। একই তো টিকিট প্রাইস।’ দীপ্রর এ কথায় বুঝা গেল ওর মা ও ফুপ্পি দুজনেই উৎসুক হয়ে উঠেছে, ঐ চেয়ারলিফট আর টবোজ্ঞানের নামে। ফলে ওর হাত থেকে লিফলেট টা নিয়ে দুজনেই এক নজরে ছবি দুটো দেখেই সোজা বাতিল করে দিল দীপ্রর প্রস্তাব।
সাথে সাথে দীপ্র জানাল কেবলকারে তো আগে উঠেছেই সে। এখন তাই অন্য কেউ কেবল কারে গেলেও আমাকে নিয়ে ও ঐ চেয়ার লিফটে উঠে টবোজ্ঞানেই করেই নামতো।
‘থাক, থাক ভালই হয়েছে ওটার খবর আগে না জানায়। টাকা তো বাঁচল বেশ। কী দরকার অতো খরচ করার’ রায় এলো লাজুর কাছ থেকে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণ সাহিত্যিক







