দেশ হতে দেশান্তরে

সেলিম সোলায়মান | রবিবার , ৫ জুন, ২০২২ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

বাইরে খাঁ খাঁ, ভেতর লোকারণ্য

আমার কথায় লি খাঁ কী বুঝলো, কে জানে ? যা ই বুঝে থাকুক, উত্তরে সে হাত নাড়িয়ে কিছু একটা বলে গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দিকে এগিয়ে যাওয়াতে মনে হল বলছে সে যে, আপাতত তাকে গাড়িই সামলাতে হবে। এখানে গাড়ি বেশিক্ষণ পার্ক করে রাখা যাবে না। তখন, ঠিক আছে গাড়ি যেখানে রাখার সেখানে রেখেই না হয় এসো, বলেই রাখলাম পা সিঁড়িতে।

ঝটপট সিঁড়ি ভেঙে সামনের কাঁচের দরজাটি ধাক্কা দিয়ে খুলেই, খেলাম এক জোর ধাক্কা! বাইরের জনমানববিরল খাঁ খাঁ অবস্থা দেখে ধারণা করেছিলাম, ভিতরে বাহিরে অবস্থা বুঝি একই হবে! তাই মনে হয়েছিল ইতোমধ্যে ভেতরে ঢুকে পড়া ওরা সবাই নিশ্চয়ই যুৎ মতো একটা টেবিল দখল করে বসে পড়েছে। কিন্তু এ তো দেখছি এক্কেবারে মুনাফেকি অবস্থা! এ এলাকার বাইরে খাঁ খাঁ অবস্থা হলেও ভেতর এক্কেবারে লোকে লোকারণ্য! গেইটের পাশে ওদের সকলের জট পাকিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকাটি পরিষ্কার বলছে যে, ওরাও এই গমগম করা ভিড় দেখে যাকে বলে এক্কেবারে তব্দা খাইয়া গেছে! পুত্রদ্বয় দেখছি কাতর নয়নে জরীপ করছে অনতিদূরের তিন তিনটা কাউন্টারেরই সামনেকার লম্বা লাইন। ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে এই এলাকায় যারাই এসেছে গত দু’য়েক ঘণ্টায়, তারা সবাই বুঝি ঢুকে পড়েছে এই ম্যাকের ভেতর। এখানকার এই ভিড়কে ঢাকার ফার্ম গেইট বা ঢাকা কলেজের সামনের মার্কেটের চাঁদ রাতের ঈদের ভিড়ের সাথেই তুলনা করা যায়। তবে আশার কথা হল যে লাইনগুলো নড়ছে দ্রুত।

‘এখানে তো জায়গায় নাই। বসবো কোথায়’? লাজুর কণ্ঠে বেজে উঠা এই হতাশার উত্তরে সবাইকে তাড়া দিয়ে বললাম চল চল, আগে তো ভেতরের দিকে যাই। একটা বসার জায়গায় তো খুঁজে বের করি আগে। যদিও ঢোকার মুখেই এইরকম ভিড় দেখে ভির্মি খেয়ে বড়ই সন্দেহ মনে যে আদৌ জায়গা আছে কি না ভেতরে! দেখে শুনে তো মনে হচ্ছে না যে ম্যাকের এই আউটলেটটা খুব একটা বড় কোনো আউটলেট। সামনের এই অপরিসর অংশটা দেখে তো মনেই না যে হচ্ছে ভেতরে আদৌ কোনো বসার জায়গা আছে।

আশা নিরাশার দোলচালে তারপরও সবাইকে নিয়ে ভেতরের দিকে এগুতেই, ভাঙলো ভুল। ইংরেজি এল আকৃতির এই আউটলেটটির সামনের এই অংশটি, মানে এল এর দণ্ডের অংশটি ততোটা প্রশস্ত না হলেও, এল এর নীচের দিকের ভূমিটি বা আনুভূমিক অংশটি বেশ চওড়া। নানান আকারের আর আকৃতির টেবিল টুল আর চেয়ার পাতা আছে বেশ চওড়া ঐ অংশটায়। কিন্তু হা হতোম্মি ওখানেও অবস্থা হলো ‘ঠাই নাই ঠাই নাই ছোট সে তরী’। ‘বাবা, ঐ যে একটা সিঁড়ি’। নিজেদের বসার জায়গা খোঁজায় আমাদের বাকী সকলের চোখ চাতকের মতো ব্যস্ত থাকায়, সিড়িটি কারোই নজরে পড়েনি। এরইমধ্যে জায়গা খুঁজে না পাওয়ার হতাশা যখন জেকে বসতে যাচ্ছিল সকলের উপর তখনি সবাইকে সচকিত করে আশান্বিত করল অভ্রর এই ঘোষণা! যদিও নিশ্চিত না কী আছে সিঁড়ির ওপাশে? মানে উপরে আর কী।

এল আকৃতির এই আউটলেটটির এলের লম্বটি যে জায়গায় মিশেছে ভূমিতে সে জায়গা থেকে মিটার পাঁচেক দূরে আমাদেরই নাক বরাবর, চিলেকোঠায় উঠার মতো সরু, মানে প্রায় দেড় মানুষ চওড়া কাঠের এই সিঁড়িটা সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও, কপাল ভাল এড়াতে পারেনি তা দলের কনিষ্ঠতম সদস্যের চোখ!
এদিকে প্রয়োজনের মুহূর্তে ছোটভাইয়ের এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার, সাথে সাথেই বড় ভাইয়ের মনে উস্কে দিল দু’ভাইয়ের মধ্যকার দ্বৈরথটিকে। অতএব এ মুহূর্তে সে আর পিছিয়ে থাকে কেন ? দীপ্র তাই ছুটে গেল ঐ সিঁড়ির দিকে ; ভাবটা এরকম যদি সে আগেভাগে উপরে গিয়ে সবার জন্য একটা বসার জায়গার খুঁজে নিতে পারে, তবেই একটু আগে ছোট ভাইয়ের যে হারটির হয়েছে তার, সেটার একটা সুরাহা হয়।

এরকম অবস্থায় সাধারণত বড় ভাইকে ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সুচাগ্র মেদিনি’ মার্কা চ্যালেঞ্জ দিলেও এ মুহূর্তে দেখছি এ নিয়ে মোটেও গা করল না অভ্র। দৌড়ঝাপ বাদ দিয়ে বরং ধীরেসুস্থে সবার সাথেই ঐদিকে এগুবার মনস্থ করেছে সে। ফলে দীপ্রর ঐ প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাবার উৎসাহে কিছুটা ভাটা পড়তেই সিঁড়ির মাঝামাঝি পর্যন্ত উঠে, কিছুটা দমে গিয়ে থেমে পেছন ফিরে ‘এই অভ্র আসছো না কেন’? বলে তাড়া দিলেও এ পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না মিলায় যখন হতাশার ভঙ্গি ফুটে উঠলো দীপ্রর চেহারায় ও শরীরী ভাষায়, তাতে দু ভাইয়ের আবার নতুন কোনো দ্বৈরথের যাতে অবতারণা না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য ওকে উৎসাহ দিয়ে বললাম, বাবা তুমি উপরে উঠে দেখো তো, আসলে কোনো বসার জায়গা আছে কি না উপরে ? যদি বসার কোনো জায়গা না থাকে তবে শুধু শুধু সবাইকে নিয়ে আর সিঁড়ি ভেঙে উঠছি না উপরে।

এরই মধ্যে দ্রুত সবাইকে নিয়ে সিঁড়ির গোঁড়ায় হাজির হতেই, দীপ্র বাকী সিঁড়ি গুলো ভেঙে উপরে উঠেই, গলা উঁচু করে জানান দিল যে হ্যাঁ আছে ওখানে বসার জায়গা। উত্তরে সিঁড়িতে পা রাখতে রাখতে ওকে বললাম ও যেন সবাই একসাথে বসতে পারি এরকম একটা টেবিল খুঁজে তাতে বসে, দখল নিয়ে নেয় ওটার। এ কথা বলতেই সিঁড়ির মুখ থেকে দীপ্র হয়ে গেল হাওয়া।

উপরে উঠে এক ঝলকে উপরের এই গোটা অংশটায় চোখ বুলিয়ে বোঝা গেল, নীচের তলাটা এল আকৃতির হলেও, এটা একটা বড়সড় আয়তাকার কক্ষ। চমৎকার ভাবে নানান রকমের টেবিল চেয়ার, টুল বেঞ্চিতে সাজানো এটি। তাইতো ভাবছিলাম, বেইজিং শহরের এরকম সম্ভাব্য জমজমাট একটা শপিং এলাকায়, নীচে যেমন দেখলাম তেমন ছোটখাট আর অপরিসর আউটলেট তো ম্যাকের ব্যবসায়িক স্ট্রাটেজির সাথে যায় না। এখন বুঝলাম নীচের দিকে নিজেদের পছন্দ মতো আকারের জায়গা না পাওয়াতে, যতটুকু জায়গা পেয়েছে নীচে আগে তার দখল নিয়ে পরে এই স্টোরের সমপ্রসারণ ঘটিয়েছে উপরের দিকে, ম্যাক। না বুদ্ধি খারাপ নাহ।
তবে বড়সড় আকারের এই ঘরটিও বলা চলে মোটামুটি ভর্তিই। এদিকে ঐদিকে চারিদিকেই নানান টেবিলে নানান বয়সী লোক বসে আছে, যাদের কেউ কেউ খাচ্ছে এক মনে। কেউ কেউ খেতে খেতে চুং চাং ফুং ফাং বলে গুলগাপ্পি মারছে। আবার অপেক্ষাকৃত কমবয়সীদের দেখছি এ দুটোর কোনোটাই না করে, নিজ নিজ হাতযন্ত্রে এক মনে চোখ ফেলে আছে! যার মানে হল এরা এই আউটলেটের ফাও ওয়াই ফাইয়ের সুবিধা নিয়ে বিচরণ করছে ভার্চুয়াল জগতে।

‘বাবা, বাবা, কোথায় বসবো আমরা’? হাত ঝাঁকিয়ে দীপ্রর করা এ প্রশ্নে ফের গোটা রুমটাতে চোখ জরীপ করে দেখলাম, এই রুমের ভিড়ের ফাঁকে ফাঁকে নানান টেবিল নানান জায়গায় খালি থাকলেও সে গুলোতে বড় জোর বসা যায় দু’জন। একসাথে পাঁচজন এক টেবিলে বসা যায় এমন কোনো জায়গা পায়নি খুঁজে দীপ্র, তাই সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না কোন দিকে এগুবে। অতএব দখলও নেয়নি কোনো টেবিল সে এর মধ্যে।

‘ঐ তো, ঐখানে একটা ছোট গোল টেবিল দেখা যাচ্ছে, ওখানে তিন জন বসা যাবে। আর তার পেছনেই আরেকটা টেবিল ফাঁকা আছে দুইজনের। চল যাই ঐদিকে’। বলেই হেলেন এসময় ঐ সিঁড়িমুখটির ডান দিকের সরু জায়গাটির দিকে অগ্রসর হতেই, আমারও নিলাম পিছু।

প্রথমেই গিয়ে গোল ঐ টেবিলটার পাশে থাকা চেয়ার তিনটির দখল পেতেই দলের অগ্রগামি তিনজন মানে অভ্র হেলেন আর লাজু ওগুলোতে যেভাবে ধপাস করে বসে পড়লো, বিশেষত হেলেন আর অভ্র যেরকম সামনের দিকে উপুর হয়ে টেবিলে মাথা রেখে হাত পা ছেড়ে দিলো, তাতেই পরিষ্কার হয়ে গেল সেই সকাল থেকে এই পর্যন্ত হিমসাগরে ডুবে থাকা তিয়েন আন মেন স্কয়ারের অভিযানে যে ধকল গেছে ওদের উপর, এতোক্ষণে একটা যুৎমতো আরামদায়ক বসার জায়গা পেতেই, সে ধকল এক্কেবারে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে ওদের।

নাহ, ঐ রকম কিছু হতে দেওয়া যাবে না নিজের আর অন্তত দীপ্রর ক্ষেত্রে। তাহলে নীচ থেকে একা আমি তো পাঁচজনের খাবারের ট্রে নিয়ে আসতে পারব না! এই ভেবে বড় পুত্রকে বললাম চলো বাবা, ঐ পেছনের টেবিলের চেয়ার গুলো সরিয়ে কোনো মতে এই টেবিলের সাথে রেখে দেই, যাতে কেউ আর ওগুলোর দখল না নিতে পারে। তারপর তুমি আর আমি নীচে গিয়ে লাইনে দাঁড়াই। এমনিতেই লম্বা লাইন দেখেছি, এখানে বসে সময় নষ্ট করলে আরও দেরী হয়ে যাবে। বলতে বলতে পকেট থেকে ছোঁয়াফোন বের করতেই দেখলাম সেটির পর্দায় জ্বল জ্বল করছে ২টা ৫০ মিনিট!

নাহ, পেছন থেকে আনা চেয়ার দুটোর একটাকেই কোনো মতে বসানো গেল গোল টেবিলে বাকী তিনজনের সাথে। অতএব বাকী চেয়ারটিকে সেটির জায়গা মতো রেখে লাজুকে ওটার উপর চোখ রাখতে বলে, জিজ্ঞেস করলাম কে কি খাবে। সাথে এও জানিয়ে দিলাম যে সবাই আমরা এক মেনু নেব। এই ভিড়ে তিন চার রকমের মেনু নিতে গেলে, চায়নিজ আর ইংলিশ বা বাংলার ভজঘটে কি যে ঘটে অর্ডার দেয়া নেয়া করতে গিয়ে, তা তো বলা যায় না ‘আমি বিগ ম্যাক মিল’। টেবিলে মাথা রেখে আধশোয়া না আধবসা অভ্র ঘোষণা করতেই, দীপ্রও জানাল তারও সেই একই মেনু। বুঝলাম যে ঘোষণা দিলাম একটু আগে, তা আর খাটছে না। কারণ বিগ ম্যাক আমার জন্য বেশিই হয়ে যাবে।

‘বিগ ম্যাক কি খুব বড় হবে নাকি রে দাদা? তুই কি নিবি? আমার জন্য শুধু চিকেন নে’। জানাল হেলেন ‘এখানে আর কী কী পাওয়া যায় তাই তো জানি না। ঠিক আছে তুমি যেটা নেবে, আমার জন্যও সেটা নাও। দেখো আবার কুকুর বা শুকরের মাংশের বার্গার এনো না’ হুকুম লাজুর!

অযথা কথা না বাড়ানোর লক্ষে দলের দুই মহাপরাক্রমশালির কথার কোনো নির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে, দীপ্রকে ডেকে নীচে যাওয়ার জন্য সিঁড়ির দিকে এগুবার আগে জানালাম যে, ঠিক আছে, বাচ্চাদের জন্য বিগম্যাক মিল, আর আমদের জন্য নেব নরমাল বিফ বার্গার মিল। তবে আমি একটা কফি নেব, তুমি কি কফি খাবে, লাজু?

‘তুমি না ম্যাকের কফি খেতে চাও না, এখন তাহলে কফি নেবে কেন’?
ঠাণ্ডায় যেরকম কাবু হয়েছি তাতে এক কাপ কফি খুবই দরকার। শুধু কফির খোঁজে এখান থেকে বেরিয়ে অন্য কোথায় যাব? হাঙ্গার ইজ দ্য বেস্ট সস বলে যে কথাটা বলতেন আব্বা প্রায়শই, সেরকম এই হিমে যে কোনো কফিতেই চলবে আমার।

‘ঠিক আছে আমার জন্যেও নিও একটা। খুব মাথা ব্যথা করছে’ লাজু জানাতেই দ্রুত এগুলাম দু’জনে সিঁড়ির দিকে।
নীচে নামতে নামতে ভাবছি, হায়রে ক্যাফেইন! এই জিনিষ চা’য়ে অল্প্ল পরিমাণে থাকলেও, কফি তে থাকে প্রচুর পরিমাণে। আর এ হলো এক আজব জিনিষ। কারো জন্য এই ঘুম হরণ করে মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠলেও কারো জন্য সেই একই জিনিষ করে মাথা ব্যথা নিবারণ।

একই ছাদের নীচে একসাথে একই মাইগ্রেন নামক মাথাব্যথা আমাদের সঙ্গী হলেও, ক্যাফেইন একদম বিপরীত ধরনের আচরণ করে দু’জনের বেলায়। তবে বড় কথা হল এ মুহূর্তে দু’জনেরই দরকার কফি, যদিও দুই ভিন্ন কারণে। আসলে যাবতীয় বৈপরীত্য আর দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও এভাবেই তো জুটিবদ্ধ মানবমানবি একজন আরেকজনকে আঁকড়ে ধরে সময়ে সময়ে, আনন্দে বেদনায়, আশায় নিরাশায়, দুঃখ কিম্বা হতাশায়! কাটে এভাবেই তাদের এক জনমের একটি জীবন।

লেখক : ভ্রমণ সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাঁচাই পৃথিবী, বাঁচাই পরিবেশ
পরবর্তী নিবন্ধপদ্মা সেতু : গৌরবের প্রতীক