দেশ হতে দেশান্তরে

রিয়াদে ট্রয়ের ঘোড়া ও বোমা

সেলিম সোলায়মান | রবিবার , ১২ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

বোমা ফুটেছে রিয়াদে। একদম আক্ষরিক অর্থেই ফুটেছে। খবরের কাগজ পড়ে তো এখানে সত্য জানার উপায় নাই। বিস্তারিত তো নয়ই। ছোট করে ছাপা হওয়া এ জাতের খবরেও মেটে না তৃষ্ণা অনেকেরই। মেলে গুজব, রটনা ডালপালা। সেসবেই করে ভরসা এখানে কৌতূহলীরা, ছিদ্রান্বেষীরা। এমনকি সত্যসন্ধানী অনুসন্ধিৎসুদেরও তাই করতে হয়। তবে তাদের হাতে থাকে পরশ পাথর। চোখে আতশ কাচ।

পাকা খবর কারো কাছে নাই এখানে এমনও নিশ্চয় নয়। তবে তারা তো হয় স্বয়ং অন্দরমহলের, নয়তো তাদের ঘনিষ্ঠ। ঐরকম কারো সাথে আমার তো পরিচয় ঘটেনি এখনো এখনো।পরশ পাথর ও আতশ কাঁচ নিয়ে ঘোরা সত্যানুসন্ধানীরও পাই নি দেখা। ফলে নানান দিকে নানান রকমের ডালাপালা মেলে ছড়িয়ে পড়া সেইসব গল্প ছেঁকে ছেনে, বোজার চেষ্টা করেছি এই আচানক ঘটনা। যা নাকি বাঘের ঘরে ঘোঘের বাসার মতোই!

গতকাল মানে ৭ম রোজার দিনে, রাজপরিবারের সদস্যদের দস্তুর অনুযায়ী, নিজ প্রাসাদে মজলিস ডেকেছিলেন, প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নাইফ। উপ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি। একইসাথে জঙ্গি সন্ত্রাস বিরোধী প্রোগ্রামের চেয়ারম্যানও। হয়েছে তার উপর আত্মঘাতি বোমা হামলা। রোজা ও ইদ উপলক্ষে আয়োজিত রাজ পারিবারের এহেন মজলিসের উদ্দেশ্যে হল প্রজাদের সাথে মোলাকাত করা। প্রজাদের কথা, অভাব, অভিযোগ, আব্দার শোনা। যদিও দুর্মুখেরা বলেন অবশেষে মজলিস পরিণত হয়, স্তুতি ও তৈলবাজির অনুষ্ঠানেই। যান যেখানে অভ্যাগতরা, নানান রকম উপহার উপঢৌকন নিয়ে। ঠিক এই সুযোগটি নিয়ে নিজেকে ট্রয়ের ঘোড়ায় পরিণত করেছিল নাকি ঐ আলকায়দা সদস্যটি। পেরিয়ে গিয়েছিল নির্বিঘ্নে যাবতীয় নিরাপত্তাবলয়। মেটাল ডিটেক্টরও ধরতে পারেনি শরীরের ভেতরে থাকা বিশেষ ধরনের প্লাস্টিকবোমাটি। বলছে অনেকে, ছিল বোমাটি পাকস্থলীতে। অজানা অভিজ্ঞ কোন সার্জন সেটা পাকস্থলীতে বসিয়ে দিয়েছিল।

তাতে আবার অন্যরা তীব্র আপত্তি তুলে বলে -“আরে না না ওটা ফিট করা ছিল মলদ্বারে! দাওয়াতে যাওয়ার আগে সার্জনের অপারেশন করার সুযোগ কই। ও নিজেই ওটা মলদ্বারে ঢুকিয়ে নিয়েছিল।” মোটের উপর কথা হল আবদুল্লাহ আল আসিরি, অত্যাধুনিক যাবতীয় নিরাপত্তা বলয় হেলায় অতিক্রম করে, নাইফের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। প্রিন্সের হাতে উপহার তুলে দেবার সময় দিয়েছিল ফাটিয়ে বোমা। তাতে আক্রমণকারী আসিরি নিহত হলেও, প্রিন্স নাইফ বেঁচে গেছেন। তবে কতটুকু, হয়েছে কী তার, তা নিয়ে কোন সুনির্দিষ্ট খবর নাই এখনো।

যতোই কম ক্ষতি হয়ে থাকুক না কেন প্রিন্সের, কঠিন যে মেসেজ দিতে চেয়েছে আলকায়েদা রাজ পরিবারকে, হয়েছে তা। বাবা নাইফ, রাজপরিবারের ক্ষমতা বলয়ের অত্যন্ত শক্তিশালী সদস্য বলে শোনা যায়। তাকেই বলেছে, “অনুভব করছো কি? নিঃশ্বাস ফেলছি যে ঘাড়ের উপর।” এ বিষয়ে সিএফও আমিনের বয়ান হল, “বুঝুক এবার সৌদি রাজা, জঙ্গি বলে কারে? খুব তো দেশে দেশে জঙ্গিদের ফান্ডিং করে বেড়ায়!”

এমতাবস্থায় মনে হল, আরে আমি কেন ভুলেও ভাবিনি, ঘটতে পারে এমনকিছু সৌদিতে! বিশেষত আছে যখন এখানে আমেরিকান সৈন্যের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি। যদিও দেখা যায় না তাদের সচরাচর। মানে আমি দেখিনি তাদের কাউকে স্বচক্ষে। তবে তাদের উপস্থিতির দীর্ঘ ছায়া যে আছে সর্বক্ষণ সৌদির নিরাপত্তার খাতিরে, তা তো সর্বজনবিদিত। এ নিয়েও আছে নানান গল্প। তবে এখনি যাচ্ছি না ঐদিকে। বলা যাবে তা অন্য কোনসময়ে, প্রাসঙ্গিকভাবে।

জানতাম যদিও, এক্সপাট কম্পাউন্ড নামের ক্যান্টনমেন্ট সুলভ আবাসিক এলাকায় থাকি, ওগুলোর ঐরম শক্ত নিরাপত্তা জাল থাকার কারণ, এই আল কায়েদা। তারপরও ভাবিনি কখনো, আছে ওরা এরকম নাকের ডগায়। বুঝেছি যা এখন।

সেই থেকে, সারাদিন ঝিমিয়ে থাকা রিয়াদের অবস্থা হয়েছে থমথমে আরো। থেকে থেকেই রাস্তায় হুঁশ হাঁস করে যাচ্ছে নানান পোশাকের নিরাপত্তাবাহিনীর গাড়ী। স্বভাবতই লেগেছে সেই আঁচ রিয়াদ বিমান বন্দরেও। একটু আগেই পৌঁছেছি এখানে। নামিয়ে দিয়ে গেছে রিয়াদ শহরে নিজ গাড়ী ব্যাতিত, যাতায়াত বিষয়ে হাতের পাঁচ হয়ে উঠা, সময় ও কর্তব্যনিষ্ঠ ট্যাক্সি ড্রাইভার, কেরালার কবির। ছুটির দিন, বৃহস্পতিবার আজ। যাচ্ছি প্রথমবারের মতো মক্কায়। বাজে এখন সকাল সাড়ে এগারোটা। ঘণ্টাখানেক পরই উড়ার কথা মক্কাগামি আমার ফ্লাইট। ব্রেকফাস্ট হবে আজ আমার পবিত্র মক্কায়!

ভাল কথা, গতকাল ফুটেছিল বোমা যখন রিয়াদে, ছিলাম আমি ও আমরা দাম্মামে। আমাদের পূর্বাঞ্চলীয় টিমের সাথে ব্রেকফাস্ট পার্টি ছিল দাম্মামে। হেডকোয়ার্টার থেকে, বস ফিলের সাথে খলিল, গিউসি আর আমি গিয়েছিলাম। ঐখানে পৌঁছে, বাহরাইনে উঁকি দিয়ে আমার ভিসাটিও, আর ২৮ দিনের জন্য হালাল করিয়ে নিয়েছিলাম। রাত দশটার ফ্লাইটে ফিরেছিলাম থমথমে রিয়াদে। রোজার কারনে অফিসের কাজকর্ম অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়লেও, বেরেছি আমার দৌড়াদৌড়ি। তাতেই গতকাল আর আজ মিলে, রাখতে যাচ্ছি পা দুই দেশের চার শহরে। ভাল কথা, ঐ যে ব্রেকফাস্টের কথা বললাম; ভুল বুঝবেন না মোটেও। অবশ্য ভুল যদি বোঝেনও কেউ, দোষ দেব না তাকে। রোজার প্রথম দিনের ফয়সালিয়ায় হোটেলের ব্রেকফাস্টের দাওয়াতের মেইল পেয়ে আমিও ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছি, বলে কী? রোজার দিনে সৌদির খোদ রিয়াদে হচ্ছে ঢাক ঢোল পিটিয়ে ব্রেকফাস্টের আয়োজন! পরক্ষণেই ভেঙ্গেছিল ভুল। আমাদের দেশে ধর্মীয় নানান শব্দের অনুবাদ তো করি না আমরা পারতপক্ষে। তা করলে এবং করার পর, বাংলা বানানে কোন হেরফের করলে, দশদিক থেকে শত মহাধার্মিক বানানবিদ হাজির হন। সে জায়গায় এরা মোটেও পাত্তা দেয় না এসবকে। তাই ইফতারকেই ইংরেজিতে এরা সরাসরি ব্রেকফাস্টই বলে। লেগেছিল খটকা প্রথমে এই অনুবাদে। ইংরেজি ব্রেকফাস্ট শব্দের সাথে, নিজ মনের ভেতরে, ঘুমের একটা গভীর যোগাযোগ ছিল। না কেউ বলেনি ঐ কথা কখনো। নিজে নিজেই ব্রেকফাস্ট শব্দের সাথে যে ছবিটি এঁকেছিলাম মনের পর্দায় ছোটবেলায়, তাতে ঘুম থেকে, উঠে হাত মুখ ধুয়ে, দাঁত মেজে খাবার টেবিলে বসেছে মানুষ। কেমন জানি খাপছাড়া লাগছিল তাই অনুবাদটা। তবে গত সাত রোজায় রিয়াদবাসীর জীবনযাপনের যে অভিজ্ঞতা হল, বলছে তা যে, অনুবাদটি হয়েছে একদম খাপে খাপ। রিয়াদবাসি সউদিরা তো কাটায় রোজা সারাদিন ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই। ইফতার থেকেই শুরু হয় তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড। ছেলে বুড়ো তরুণ তরুণী কিশোর কিশোরী নর নারী সব নেমে আসে বাইরে তখনই। রাস্তা, শপিংমল, স্টেডিয়াম, মাঠ সব গুলজার করে তোলে। হ্যাঁ এ সময় রাতেই খেলে এর ফুটবল বাস্কেটবল। চলে তা সেহেরি পর্যন্ত। সে হিসাবে ঘুম থেকে উঠেই যেহেতু ইফতার করে এরা, সেটির ইংরেজি অনুবাদ আচরণগতভাবে একদম সঠিক, মানতেই হয়েছে।

আগে থেকে খুব পরিকল্পনা করে রোজার প্রথম দিকেই যাচ্ছি মক্কায়, ঘটনা তেমন নয়। যাচ্ছি আজ প্রথম জুম্মায় মক্কায়, কারণ তার পুরোপুরিই পেশাগত। জানেনই তো কোম্পানিটি আমার ইনোভেটিব মেডিসিন মানে নব আবিষ্কৃত ঔষধ ও চিকিৎসাপদ্ধতির আবিষ্কারক, উৎপাদক ও বিপণনকারী। সে হিসেবে, এর বিপণন অন্যতম কর্মকাণ্ড হলো, চিকিৎসকদের নিয়ে নানান ধরনের বৈজ্ঞানিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালার আয়োজন করা।

রোজার আগে আগে আমার টিম, গাদা গাদা ঐ রকম মিটিং আর ওয়ার্কশপের প্রস্তাব দিয়েছিল। হঠাৎ করেই এতো এতো প্রস্তাবের তোড় দেখে কেমন কেমন লাগছিল যেন নিজেরও। তদুপরি সবগুলোরই মিটিং ভেনু মক্কা। প্রশ্নও করেছিলাম এ নিয়ে তাদের। মিলেছিল জবাব দুটো। প্রথমত, আমাদের অতি পুরাতন ব্যাথার ঔষধ ভ্‌লটারেন নিয়ে এরকম একগাদা প্রস্তাব দাখিল করা, আহমদে হাশিশের গতানুগতিক চোয়াল শক্ত করে দেয়া জবাব ছিল, “সব কোম্পানিই এ সময় এটা করে। এটাই দস্তুর এখানে। না হয় তার প্রোডাক্টের সেল কমে যাবে!” ঐরকম জবাব পাওয়ার পরো, অতো পুরানো প্রোডাক্ট নিয়ে এরকম মিটিংয়ের, আদৌ কোন প্রয়োজন বা যৌক্তিকতা দেখতে পাচ্ছিলাম না। তারপরও হাশিশকে সরাসরি মানাও করতে পারছিলাম না। সাদা চোখে কোম্পানির বিপণন নীতিমালার কোন ব্যত্যয় তো ছিল না প্রস্তাবগুলোতে।

সে যাক, তবে বুদ্ধিদীপ্ত জবাব দিয়েছিল চটপটে ও চোখা তরুণ আহমেদ নাশাত। বলেছিল রোজার সময়ে এমনিতেই তো কাজ কর্ম ঢিলেঢালা হয়ে যায় সেলস টিমের। এ সময় এসব মিটিংই তাদের চাঙ্গা রাখে। অতীব সত্য কথা! না মেনে উপায় কী? কিন্তু যেই না, বসেছিলাম ঐ প্রস্তাবগুলো নিয়ে, আমারই চালু করা কমপ্লায়েন্স কমিটির মিটিং এ প্রয়োজনীয় সকলের অনুমোদনের জন্য, ইনিয়ে বিনিয়ে আপত্তি তুলছিল বারবার, মেডিক্যাল ডিরেক্টর সামি আজমি। কোম্পানির নানান কিছুর পাঁকে, বাইন মাছের মতো বিচরণ করা দু মুখো স্বভাবের সামি কে যতই বলছিলাম, ঝেড়ে কাশতে, স্বভাবগতভাবে সে করেনি তা। বাধ্য হয়ে বলেছিলাম, এর আগে যে এতদিন এসব হল তখন তুমি কী করেছিলে? এসব মিটিংয়ের মেডিক্যাল সাপোর্টতো আসে তোমার ডিপার্টমেন্ট থেকে? সোজা উত্তর ছিল, তখন তো এই কমপ্লায়েন্স কমিটি ছিল না। তুমি এসেই তো এই কমিটির কাজ শুরু করেছ। আর আমার ডিপার্টমেন্টের কাজ তো হল চাহিবামাত্র সার্ভিস দেয়া। ওটা না দিলেও তো তোমারই লোকজন হইচই করবে। দুজনের এই বাতচিতের মাঝে কমিটির বাকীরা মানে , সি এফ ও আমিন, কমপ্লায়েন্স অফিসার মেতাওয়াল্লি এমনকি বস ফিলও, ছিল স্পিকটি নট। তারপরও তাকিয়েছিলাম বসের দিকে। তাতে স্বভাবসুল্‌ভভাবে চোখটিপে যে মুখভঙ্গি করেছিল ফিল, তার অনুবাদ হয়, ইউ আর দ্য বস অব মার্কেটিং। মোর ওভার ডেসপাইট উই হ্যাভ এ ডেজিগনেটেড কমপ্লায়েন্স অফিসার, আই মেইড ইউ টু বি দ্য কমপ্লায়েন্স চ্যাম্পিয়ন। ইটস ইউর কল।ফিলের এ ব্যাপারটা অবশ্যই হয়েছে, শিয়ালের কাছে মুরগী বর্গা দেওয়ার মতো। কিন্তু আমি তো আমার উপর তার এই তুমুল আস্থার, অসম্মান করতে পারি না কিছুতেই।

নাহ এগুতে হয় এবার। ফ্লাইটে বোর্ডিং করার ডাক এসেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠতেই কানে বেজে উঠলো মোহাম্মদ রফির দরাজ গলা। গাইছেন উনি নজরুলের গান – “তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে”।

লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধসিদ্দিক আহমেদ: কথা- কাহিনির অসামান্য রূপকার
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ