শামালের ধকল সামলে স্বরূপে ফিরতে ফিরতেই নেমেছিল রোজা রিয়াদে। আক্ষরিক অর্থেই ক্ষণজন্মা কালবোশেখির দেশের মানুষ এ অধম। জানা ছিল না, শামাল একবার ক্ষেপলে, শান্ত হতে সময় নেয়। তবে হ্যাঁ, প্রথম দিনের বিকেলের তুমুল আঘাতের পরই রাতের দিকে সকল অর্থেই শীতল হয়ে পড়েছিল দৈত্য। কিন্তু পরদিন সূর্য উঠার পর থেকে যতোই তেতে উঠছিল মরুসূর্য, ভাঙছিল আড়মোড়া ততোই ঐ দানো। তবে ছিল না প্রথম দিকের হম্বিতম্বি আর।
আমার প্রথম শামাল অভিজ্ঞতার বিকেলে যে তড়িঘড়ি ঢুকেছিলাম ঘরে, বেরুইনি বাইরে আর পরদিন সকালের আগে। সকালে ঘুম থেকে উঠে পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে বুঝেছিলাম কমেছে বাতাসের তোড়। গিয়াছিলাম তাই পার্কিং শেডে।
দেখি, এক কী দেড় সেন্টিমিটার বাদামি কম্বলে আপাদমস্তক ঢেকে চুপচাপ গুটিসুটি মেরে আছে টয়োটা অ্যাভালন সিডান। মনে হচ্ছিল বিরাটাকায় এক উট হাঁটুমুড়ে বসে আছে একতলার জানালার পাশে। তবে দিচ্ছে না উঁকি গ্রীবা বাড়িয়ে, জানালায়। নামিয়ে রেখেছে।
সাথে সাথেই খাসআরব গিউসি ও খলিলকে ফোন করে জেনেছিলাম, খুলবে অফিসে যথাসময়েই। শুনে সামনে মজুদ পানির পাইপটি তুলে শুধু চোখ দুটো পরিষ্কার করেছিলাম আমার উটের। অফিসে তো যেতে হবে। পুরো শরীর ওর ধোয়ামোছা তো, আমার কর্ম নয়। এছাড়া শামাল একদম বিদায় না হওয়া পর্যন্ত পুরো ধোয়ামোছা করাও তো অরণ্যে রোদনের সামিল!
ঘরের দরজা জানালা সব দাঁতমুখ খিঁচে থাকলেও, নানান ফাঁক ফোঁকর গলে ফেলেছে নিঃশ্বাস ঘরের ভেতরেও শামাল। সকল আসবাবে, খোলা জায়গায় এমনকি ঘরের কোনাকাঞ্চিতেও বেঁধেছে বাসা তিনদিনে দূর মরু থেকে উড়ে আসা মিহিন ধূলারা। বাইরের এবং ঘরের বাতাসে ভাসছে বালির গন্ধ।
সব কিছু শান্ত হবার পর, আমার ঘরকেই আগের চেহারায় ফেরাতে, গুনে গুনে দেড়দিন, ঘাম ঝরাতে হয়েছিল খন্ডকালিন গৃহসহকারী আরিফের সাথে আমার। অতএব গোটা রিয়াদের জন্য তা যে কেমন হুলস্থুল ব্যাপার বোধগম্য সহজেই ।
মরচেধরা রোদ ও বালির গন্ধভরা বাতাসের কারনে রিয়াদকে লাগছিল ঘোলাটে ও এলোমেলো এ কয়দিন। অফিস খোলা থাকলেও, পড়েছিল সেই আছর কাজের গতিতে। ঠিক সেই সুযোগটাই লাগিয়েছিলাম কাজে। নতুন যে দায়িত্ব উঠেছে কাঁধে, সেটিকে সুসংহত করার ব্যয় করলাম ঐ ক’দিন।
ফিলের ঘোষণা চাউর হবার পরপরই ছুটে এসেছিল রুমে প্রথম ঐ টিমের তালাত আদ দিব। প্রগলভ তালাতের শুভেচ্ছা মোবারকবাদের তোড়ের মধ্যেই হয়েছিল হাজির হায়দারবাদি সৈয়দ রাজবি। শুধু বদহজমিতে ভুগেছে প্যালেস্টাইনি ইসাম। একদম না পারতে, এসেছিল সে দিন শেষে।
এবার দেশ থেকে ফেরার পর থেকেই তো আনঅফিসিয়ালি ঐ টিমটাকে গাইড করেছি। জানি তাই তাদের ছেড়াবেরা অবস্থার কথা। ভাবেসাবে সব, গায়ে মানে না আপনি মোড়ল। অথচ পড়ে না চোখে কাজের ব্যাপারে তাদের ইংরেজিতে যাকে বলে ওউনারশিপ, তা কারোই। ওদের ভূতপূর্ব বস, বাদাউয়ির লেইসিজ ফেয়ার স্টাইলের কারণেই, বোধ করি হয়েছে এমন।
শাব্দিক অর্থেই পঞ্চজাতির এক মিটিং ডেকেছিলাম শামালের দ্বিতীয় দুপুরে। শুরুতেই তালাত আর রাজভি ফের মোবারকবাদের হল্লা তুলেছিল। স্মিত হেসে, এই দুর্যোগে অফিসে আসায় ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলাম, আসা যাক কাজের কথায়। তোমাদের কথাতো এতদিন নানান সময়ে নানানভাবে শুনেছি অনেক। পরিপূর্ণ বিশ্বাসও আছে আমার, তোমাদের সক্ষমতায়। বলি এবার আমার কথা। টার্গেট মাত্র তিনটা
এক, কোম্পানিতে তোমাদের যার যার তার তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো। (রাজভি আর ইসামের জন্য প্রযোজ্য হলেও এটি, মিটিংএ ছিল তা উহ্য) দুই, কর্ম সম্পাদন। তবে যেনতেন ভাবে না। কোয়ালিটি অবশ্যই চাই। তারপর যত ইচ্ছা জোরে আওয়াজ করবে। সমস্যা নাই। তিন, দৈনন্দিন আলাপ আলোচনায় ভাবনায়, চিন্তায়, কথায় আচরণে হতে হবে সমাধানমুখী। সমস্যা আছে বলেই তো আছি আমরা।
ইচ্ছে করেই ছোট্ট সেই মিটিংটাতে টান টান ও পেশাগতভাব রেখেছিলাম। তারপরও স্বভাবগতভাবেই কাটছিল নানান ফোঁড়ন, তালাত ও রাজভি। অন্যদিকে একদম স্পিকটি নট ইসাম ও বাসেম। ইসামের নীরবতা বোধগম্য হলেও, সর্বক্ষণ তালাতের মিশরি মিলিটারি শাসনে থাকা জর্ডানি বাসেম বোধ করি গিয়েছিল ঘাবড়ে । বেচারাতো এমনিতে ভিড়তেই পারে না অফিসের ত্রিসীমানায়। অথচ ওর চোখেমুখে দেহভঙ্গিতে তো বটেই, এমনকি বাজেটের কাজ করতে গিয়ে পেয়েছিলাম কথায়ও তার বুদ্ধিমত্তার ঝিলিক। দরকার তো তারই কথা শোনার। তাতেই দেয়া হবে শান নিজেরও, বুদ্ধিতে।
এরপরের দুই দিন বসেছিলাম চারজনের সাথেই আলাদা আলাদা। রাজভির সাথের মিটিংয়ে, বলেছিলাম অচিরেই তার কাছে সৌদি রোগীমানসের উপর একটা মার্কেট রিসার্চ চাই। কতদিনে সে পারবে দিতে?
শুনে আটাশ বছর সৌদি মার্কেটের অভিজ্ঞতার বহর নিয়ে সর্বক্ষণ কলরব করা রাজভি হয়ে গিয়েছিল এক্কেবারে ফাঁটা বেলুন! ভাষ্য তার, এই কাজ তো সে কখনোই করে নাই। করবে তা কেমনে?
সব কাজই এভাবে শুরু হয়, বলে আশ্বস্ত করে বলেছিলাম, যান একটু ঘাটাঘাটি করেন এ বিষয়ে। তারপর আমি তো আছিই। আর ইসামকে বলেছিলাম অচিরেই কাস্টমার রিলেসনসশিপ ম্যানেজম্যান্ট ডাটাবেজ ১০০ ভাগ শুদ্ধ করতে হবে তার। সে যেহেতু ঐ অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির অধিকর্তা, কাজটিও তাই তারই।
নিরাবেগ চেহারায় ছিল সে বেশ কিছুক্ষণ একদম চুপ! খুলেছিল খাতা এরপর আই টির নানান টেকনিক্যাল সমস্যার বিবরণ দিয়ে। এরপর তার ব্যপারে সর্বজনকথিত কিসিংগারিয় কায়দার কথা শুনি সবসময়, সেই কায়দায় উগড়ে দিয়েছিল বিশেষত সেলসটিমের উপর তার তুমুল ক্ষোভ।
উত্তরে তারই ভঙ্গিতে আমিও কিছুক্ষণ চুপ থেকে, কোন ধরনের আবেগকে কোনই আস্কারা না দিয়ে বলেছিলাম, শোন কয়দিনে কাজটা করবে? সেটাই জানিও তিনদিনের মধ্যে। আমাকে যদি নাক গলাতেই হয় তোমার কাজে, তবে যে মাই ওয়ে উইল বি হাইওয়ে এন্ড অনলি ওয়ে! মনে রেখো।
আপাতত গুরুত্বের দিক থেকে তলার দিকে থাকায়, তালাত আর বাসেমকে এক সপ্তাহ সময় দিয়েছি। বলেছি আপাতত তারা কী কাজ করছে, ওটাই বুঝতে চাই বিশদ।
ঐ একান্ত মিটিংয়ে, প্রতি সপ্তাহের কোনদিন কখন কে আমাকে নিজ নিজ অগ্রগতি জানাবে, সেটিও ঠিক করেছিলাম। মোটকথা নতুন দায়িত্ব ঘিরে শক্তপোক্ত ভিত তৈরি করা গেছে ঐ তিনদিনে। অতএব বাইরে ক্রমশ স্তিমিত হতে থাকা শামালের হাঁকডাক ঢোকেনি কানে।
এদিকে একসময় একদেহ একাত্মা হয়ে বিশাল দানবে পরিণত হওয়া শামাল, টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে যাওয়ায়, দৈত্যরা সব নিজ নিজ বোতলে ঢুকে পড়ার পরদিনই শুরু হয়েছিল রোজা। রমজানের আজ তৃতীয় দিন। তবে এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি রোজার আমেজ রিয়াদে।পরিষ্কার চোখে পড়ে যা ঢাকায়, রোজা শুরুর প্রথমদিনের ভাবভঙ্গী থেকেই। দুপুর শেষ হতে না হতেই তো চারদিকে ইফতার বানানোর পড়ে যায় ধুম, ওখানে। নানান সুখাদ্যের সুঘ্রানে তো ঢাকার বাতাস করে মৌ মৌ! রাস্তাজুড়ে বসা ইফতারের স্টল তো শেষ বিকেলে লাগিয়ে দেয় রাস্তায় তুমুল জ্যাম।
পড়েনি এসবের কিছুই চোখে। লাগেনি সুগন্ধও নাকে। মনে হচ্ছে রিয়াদ এখনো শামালের ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। আছে তাই থমকে এখনো।
অন্যদিকে রোজায় আছি সৌদিতে, এ নিয়ে তুমুল আনন্দিত দেশে আব্বা। ঘাবড়ে গিয়েছিলাম প্রথম রোজা রাখার জন্য সেহরি খেতে উঠে। ফোন এসেছিল লাজুর। আঁতকে উঠেছিলাম, ঐ সময়ে ফোন পেয়ে! ফোন ধরে বুঝেছিলাম, নাহ কোন দুঃসংবাদ নয়। নির্বোধ বেআমল পুত্র তার পবিত্রভূমির প্রথম রোজাটি যাতে তরক না করে, এনিয়ে উদ্বিগ্ন আব্বা। কথায় আছে না এমনিই তো নাচুনি বুড়ি, তার উপর পড়েছে ঢোলের বাড়ি। অতএব ফোন করেছিল লাজু। যদিও দেশে রোজা হবে একদিন পর। তাও ঠিক সময়েই ফোন করেছিল লাজু। কেন এমন জানি না। সৌদির সাথে তো আমাদের সময়ের পার্থক্য মাত্র তিন ঘণ্টার। সে যাক ঐ রকম সময়ে ফোন পেয়ে মজাই পেয়েছিলাম। তবে সহসাই পুরোটাই উবে গিয়েছিল তা সেহরি খেতে বসে। বিষয়টা একটু টের পেয়েছিলাম সন্ধ্যারাতেই। সেহরির জন্য রান্না করছিলাম যখন বাথার বাংলা দোকান থেকে সেদিন গছিয়ে দেয়া সাড়ে চার কেজি ওজনের আইড় মাছটা। দোকানির ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখে, নিজে ওটা নেড়েচেড়ে পরীক্ষা করিনি কেনার সময়। শুধু বলেছিলাম বার বার মাছটা ভাল না হলে যেন না দেয়। সেলসম্যান ১০০ ভাগ গ্যারন্টি দিয়েছিল। রান্না করতে গিয়ে টের পাচ্ছিলাম, নাহ মোটেও ভাল পড়েনি। মনে হচ্ছে বছরখানেক ফ্রিজে পড়ে থাকা অবিক্রিত মাছটাই গছিয়ে দিয়েছে আমাকে বেকুব বানিয়ে!
আমার একলার জন্য এতো বড় মাছের মোটেও প্রয়োজন নাই। তারপরও কিনেছিলাম। মরুতে হঠাৎ অতো বড় আইড় দেখে চমৎকৃত হয়ে। ভেবেছিলাম একদিন জিয়াকে করবো দাওয়াত সপরিবারে। কিন্তু সেদিন সেহরিতে পেলাম টের, নিজেই পারছি না খেতে। দেশী মানুষ, দিয়েছে এরকম ধোঁকা! এ দুঃখ বলি কারে? রাস্তা এখন খোলা দুইটা। এক, গোটা মাছটাই ফেলে দেয়া। তবে ঐ ভাবনা কাঁটা হয়ে বিঁধছিল বুকে। দুই, বিষয়টা ব্যাখ্যা করে আরিফ যদি নিতে চায় তাকে দিয়ে দিতে পারি। সব কিছুরই ভাল দিক থাকে। ঐসূত্র মতে সেহরিতে ভাত না খেতে না পারায়, একটা ব্যাপার প্রমাণ হয়ে গেছে নিঃসন্দেহে। তা হল ৬/৭/৮ টা ডাঁশা খেজুর খেয়েও রোজা রাখতে পারি। কোনই সমস্যা হয় না। শুধু বিকেলের দিকে টের পাই বুকে, এক মরু তৃষ্ণা।
দেশের রোজার অভিজ্ঞতার সাথে, আরেকটা পার্থক্যের মুখোমুখি হয়েছি এখানে। তা হল, দেশে ইফতার পার্টির দাওয়াত শুরু হয় রোজার প্রথম সপ্তাহের পর। এখানে তো শুরুর দুইদিনই যেতে হয়েছে পার্টিতে। প্রথমদিন পার্টি ছিল, বিখ্যাত ফয়সালিয়া টাওয়ারের হোটেলে। দ্বিতীয় দিন মামলাকা টাওয়ারের ফোর সিজন্সে।
রিয়াদের সবচেয়ে উচ্চ বংশীয় ঐ দুই রেস্টুরেন্টের ইফতারের বিরাট আয়োজনে খুব একটা পার্থক্য ছিল না। রাশি রাশি স্তূপীকৃত ক্যাবসা, কুচ কুচ, মান্দি, মুজাদ্দারা, মাকলুবা, হরেক রকমের স্তূপিকৃত কোফতা কাবাব, আর বেশুমার আরবি রুটির সমাহার দেখে মনে হচ্ছিল, আরে এ তো ডিনারের আয়োজন! গোটা রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফুডস্টেশন ঘুরে খুঁজেছি ছোলা বুট, বেগুনি, পেঁয়াজু মুড়ি। ওসব তো অবশ্যই পাইনি। তবে পেয়েছিলাম ভিমটু, জাল্লাব, তামার হিন্দ, কারকাডেহ ইত্যাকার নামের আরবি মজাদার শরবত। মরুগ্রীষ্মের প্রথম রোজায়, তুমুল তৃষ্ণায় দু দিনই খেয়েছি ঐ শরবত তিন চার গ্লাস। সাথে খেজুর, বাক্লাভা, কোনাফা। মিশরি ফেলাফেল, আর ফুল মেদামেসে খুঁজেছি পেঁয়াজু ছোলা বুটের স্বাদ। ইফতারে তো ডিনার করি না আমরা। তাই কিছুটা অবাক হলেও বুঝেছিলাম, এরাবিয়ানদের কাছে ইফতার ও ডিনার হয়ে যায় একাকার। এদিকে ফিল বলছিল, ইফতার শেষে বেশী দেরী করে রাস্তায় উঠলে পড়তে পারি জ্যামে। রোজায় ইফতারের শেষ থেকেই নাকি ঘটে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা। সারাদিনের রোজা শেষে সৌদি কিশোর তরুণেরা তখনই বেরোয় গাড়ী নিয়ে। বেপরোয়া গাড়ী চালানোটাই তাদের এক ধরনের খেলা। অতএব হোটেলের বিশাল খাদ্যভান্ডারের “রাশি রাশি ভাড়া ভাড়া” খাবার উপেক্ষা করেছিলাম। মানে বাংলাস্টাইলে শুধু ইফতার করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম ঘরের উদ্দেশ্যে, দুই দিনই।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।














