জুম্মা থেকে ফিরে খাওয়া দাওয়া সেরে, দিয়েছিলাম যে ভাতঘুম, ভাঙল তা এখন। বিকেল ৫টার জন্য এলার্ম দিয়ে রেখেছিলাম ফোনে। এমনিতে ছুটির দিনে বিশেষত এই মরুতে, এলার্ম দিয়ে ঘুমানোর কোন দরকার না থাকলেও আজ ছিল তা। কারণ সাড়ে পাঁচটার দিকে আমাদের স্নায়ুরোগ ও চক্ষুরোগ টিমের ফার্স্ট লাইন ম্যানেজার মোহাম্মেদ আল গার, আমার সাথে দেখা করতে আসবে বলে জানিয়েছিল, আজই সকালে ফোনে। কিন্তু ঘুম কি না ভেঙ্গে গেল এলার্ম বাজার আগেই! আচ্ছা বাজে কয়টা এখন? বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে দেখি টেলিফোনের পর্দা জ্বলজ্বল করছে ৪:৫১।
অতঃপর প্রাকৃতিক ক্রিয়াদি শেষে চোখে মুখে জলের ছিটা দিয়ে, ড্রয়িং রুমে এসে মনে হল, আচ্ছা এখনই চড়িয়ে দেব নাকি চা? নাহ এখন থাক। আগে তো আসুক আল গার। আচ্ছা আমার ঘরেই আসছে যখন গা’র, তাকে কী ডিনার করে যেতে বলব নাকি? বাঙালীর ঘরে অতিথি এসে, তাও আবার বিদেশী অতিথি! না খেয়ে যাবে? তা তো হতেই পারে না। এ নিয়ে চিন্তারও তো কিছু নাই। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে, এমনিতেই গোটা সপ্তাহের জন্যই তো রাঁধি তিন চার পদ তরকারি। সেই সূত্র মোতাবেক গতকাল আর আজ মাছ, মাংস, চিংড়ি আর ডাল এই চার পদ তো রান্না করেই রেখেছি। গা’রের সাথে গল্প করতে করতে প্রয়োজনে চড়িয়ে দেব আলুসিদ্ধ চুলায়। মিশরিরা আলুভর্তা খায় কি না? জানি না। তবে গা’র নিশ্চয় ইউরোপিয়ান আম্রিকান রেস্টরেন্টের ম্যাশট পটেটু নামের বিস্বাদ বস্তুটি খেয়েছে। আজ আলুভর্তা খেলে বুঝতে পারবে, এ কোন অমৃত বাঙালীর!
ডিভানে কাত হয়ে সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে মনে হল, সেই যে বুধবার সন্ধ্যায় এসে ঢুকেছিলাম ঘরে ,তারপর আজ জুম্মার আগে বরাবরের মতো আমিনের সাথে ৩/৪ কিলোমিটার দূরের জামে মসজিদে যাওয়া ছাড়া , গোটা সময়টাই ছিলাম মূলত ঘরেই। ওহ হ্যাঁ গতকাল দুপুরে গিয়েছিলাম কমপাউন্ডের সুইমিংপুলে। আর সন্ধ্যার পর, মানে এই জুলাইয়ের শেষের দিকে গনগনে মরুরোদের তেজ কমে গেলে, বিরাট এই কমপাউন্ডের নানান রাস্তায় হেঁটে হেঁটে দিয়েছি চার পাঁচটা চক্কর। মরুগ্রীষ্মের হল্কা থেকে বাঁচার জন্য নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়া রিয়াদবাসিদের অনেকই ফিরেনি এখনো। ফলে গতকাল হাঁটতে হাঁটতে এমনিতেই শুনশান এ কমপাউন্ডকে মনে হয়েছিল, আরো বেশী নৈঃশব্দে ভরপুর।
গতকাল বিকেলে জিয়ার আসার কথা ছিল। আত্মীয়পরিজনবান্ধবহীন এ মরুতে জীবন যাপনের আমার খুটিনাটি মুশকিলের আসানকারি আছে যে দুজন, তাদের একজন হল, এককালের সহকর্মী থেকে ছোটভাই হয়ে উঠা জিয়া। দ্বিতীয়জন হল এখানে আসার পর প্রথম কিছুদিনের জন্য আমার জন্য বরাদ্দ হওয়া অফিসিয়াল ড্রাইভার, সুদানের সাইফ।
কিছুদিন ধরেই, বেগুন দিয়ে ইলিশ মাছ রান্না করে খেতে ইচ্ছে করছিল খুব। জানি যে ইলিশসহ বাঙ্গালী রান্নার যাবতীয় সরঞ্জামই পাওয়া যায়, রিয়াদ শহরে উপমহাদেশিয়দের এলাকা, হারা বাথায়। কিন্তু চিনি না তো রাস্তা। যদিও সাইফ বলেছিল, ছুটির দিনেও আমার যদি কোথাও যাওয়ার জন্য তাকে দরকার পড়ে, ফোন করলেই হবে সে বান্দাহাজির। কিন্তু গন্তব্য যেহেতু হারা, বাথা, সেজন্যই নিয়েছিলাম জিয়ার শরণ। তিন/চার বছর ধরে রিয়াদবাসী জিয়ার, হারা বাথার কোন বাংলাদেশী দোকানে কোন দেশী বস্তু মিলে, আছে তার নখদর্পণে।
কিন্তু হঠাৎ করেই অফিসের কাজে গতকাল সকালে দাম্মাম চলে যাওয়াতে আসতে পারে নি জিয়া। আর আমিও ফোন করিনি দ্বিতীয় হাতের পাঁচ, সাইফ কে। ভেবেছি, অসুবিধা কী? রোজার তো আছে আরো ১০ /১২ দিন বাকী। এর মধ্যে কোন একদিন জিয়াকে নিয়ে হারা বা বাথা থেকে রোজার প্রস্তুতি হিসেবে দেশী বাজার করে আসলেই হবে।
নাহ, যে কঠিন সময় বা অবস্থার সাথেও যে মানুষ খাপ খাইয়ে উপভোগ করতে পারে জীবন, বন্ধুপরিজনহীন এই মরুতে, মোটামুটি মানবসংশ্রবহীনভাবেই অক্লেশে যে কাটিয়ে দিলাম সেই বুধবার সন্ধ্যা থেকে এই এখন পর্যন্ত, সেটাই তো তার একটা সাক্ষাৎ প্রমান। হ্যাঁ গতকাল আরিফ এসে ঘরদোর পরিষ্কার করেছে। আর আজ জুম্মায় গিয়েছিলাম আমিনের সাথে। ঐ সময়গুলোতে তাদের সাথে টুকটাক কথাবার্তা বললেও, বাঁচাল আমার আড্ডা তো আর মারা হয়নি।
মজার ঘটনা হচ্ছে এরকম একটা মোটামুটি নিঃসঙ্গ সময়েও ডিজিটাল টেকনোলজির ভেল্কিতে, মেরেছি আড্ডা প্রচুর এই সময়টাতে, কাজের ফাঁকে ফাঁকে। হ্যাঁ, বেশ কিছুদিন হল, অনলাইনে টেড মানে টেকনোলজি, এন্টারটেইনমেন্ট এন্ড ডিজাইন নামের একটা আম্রিকান প্লাটফর্মের ঘোরাফেরা করছিলাম। বেশ কিছুকাল থেকেই ঐ প্লাটফর্মে, নানান ক্ষেত্রে বিখ্যাত সব লোকজনের দেয়া বক্তৃতা শুনতাম । কিছুকাল আগে, ঐ প্লাটফর্মে কনভারসেন মানে কথোপকথন, বিতর্ক ও আইডিয়া মানে নতুনচিন্তা বা ধারণা, নামের একটা অংশ খুলেছে দেখে সামিল হয়েছিলাম তাতে। নিজে যেহেতু জানি খুবই কম, তাই ওখানকার কঠিন কঠিন বিষয়ের নানান আলোচনায় বা বিতর্কে ঢুকে বোদ্ধাদের প্রতি বেকুবের মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে শুরু করেছিলাম। মাঝে মধ্যে নাবালক মন্তব্য। জমেছে তাতেই ভার্চুয়াল আড্ডা বেজায়। সময় যে কোন দিক দিয়ে যায় উড়ে টেরই পাওয়া যায় না। না হয় ঘরে বসে টিভিতে মিশরি, জর্ডানি সিরিয়াল, নয়তো একটা চ্যানেলে যে হিন্দি ছবি বা আরেকটায় যে প্রায়শই এক্স রেটেড ছবি দেখায়, ওগুলো আর কাঁহাতক সহ্য করা যেত। রিয়াদ ম্যারিয়ট হোটেলের মতো এই কমপাউন্ডেও যে এক্স রেটেড সিনেমার বড়ই কদর, তা বুঝেছি। তবে এ তো আমার কৈশোর বা নবতারুণ্যের সময় তো নয়, যখন উদগ্রীব হয়ে থাকতাম এইসব দেখার জন্য। আর খুঁজতাম সুযোগ। কিম্বা বুঁদ হয়ে দেখতাম হিন্দি কমার্শিয়াল ফিল্ম। এমতাবস্থায়, ভার্চুয়াল জগতের ডিজিটাল আড্ডাবাজির এই সুযোগ, শুধু বাঁচিয়েই দেয় নি, এক্কেবারে মজিয়েও ফেলেছে আমায়!
ভেবে ভেবে উপরের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যখন, তখনই হারে রে রে তারস্বরে ল্যান্ডফোনটি বেজে উঠতেই, বুঝলাম কমপাউন্ডের গেইটে হাজির আমার অতিথি, মোহাম্মেদ আল গার। ফোন ধরেই দ্রুত গার্ডকে অতিথির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রবার্তা দিয়েই, গায়ে পাঞ্জাবী , পায়ে চপ্পল গলিয়ে এগুলাম নিচতলার দিকে। কারণ বাংলোটি আমার বলা চলে, একদম গেইট লাগোয়াই নীচে নামার ৩০/৪০ সেকেন্ডের মধ্যেই দেখা গেল গেইটের দিক থেকে এসে একটা গাড়ী দিচ্ছে মোচড় বা দিকে। মানে আমার দিকে। যদিও চিনি না গা’রের গাড়ী, তারপরও ওটাই হবে ধরে নিয়ে, হাত নাড়াতেই সাথে সাথেই বা মোচড় সম্পন্ন করেই, প্রায় ৫০ মিটার দূরে ঝপ করে গেল গাড়িটি থেমে। পরক্ষণেই ড্রাইভিং সিট ছেড়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে এলো, লম্বায় না হলেও চওড়ায় মিশরি, ফ্রেঞ্চকাট দাড়িসমৃদ্ধ ধবধবে না টকটকে ফর্সা আল গা’র।
হাত তুলে সালাম দিয়ে, আরবি এক্সেন্টে পুনঃ পুনঃ “হাউ আর ইউ ডঃ সেলিম? এভ্রিথিং ফাইন? অল গুড?” আওড়াতে আওড়াতে দ্রুত এদিকে এগুতে শুরু করলে– ওয়ালিয়াকুম, আই এম ফাইন বলার সাথে সাথে এরই মধ্যে রপ্ত করা আরবি কেতা মতে ঐ একই প্রশ্ন পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ করতে করতে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে গা’রের সাথে হাত মেলাতেই বলল– “ওয়াও! ইউ আর লুকিং গ্রেত স্যার!” মোটেও বিভ্রান্ত হলাম না। জানি তো ভাল করেই যে, খ্যাংরাকাঠি গড়নের ভুতো চেহারার আমি, পাঞ্জাবী পায়জামাতে হয়ে উঠি কাকতাড়ুয়ারসম। প্রশংসাটা করেছে আল গা’র, আসলে পাঞ্জাবী পাজামার। বাঙ্গালী পুরুষের এই পোশাক তার ভাল লাগুক আর না লাগুক, হয়তো সে এই প্রথম দেখেছে এই পোশাক। তাতে অবাক হলেও ভদ্রতা করে বলেছে ঐ কথা। হাসিমুখে আই ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, অতো দূরে গাড়িটা থামিয়ে নেমে পড়লে কেন? চল যাই গাড়িটা নিয়ে আসি। রাস্তায় না,পার্ক করো ওটা আমার গ্যারেজে।
“ইয়া নি, ইউ নো আই কেম টু টেক ইউ টু এন অথেনটিক ইজিপ্সিয়ান রেস্টুরেন্ট।” শোন, বাঙালীর দরজায় এসে ঘরে না ঢুকে কেউ ফিরে গেলে, বাংগালির জাত যায়। অমঙ্গলও হয় গৃহীর। তুমিতো নিশ্চয় অমঙ্গল চাও না আমার?
“ইয়াল্লা! নো, নেভার! অফ কোর্স নত!” তোতলাতে তোতলাতে কিছুটা আর্তনাদ করে বলতে বলতে ড্রাইভিং সিটে উঠে, আমার হাঁটার গতির সাথে একদম তাল না মিলিয়ে বরং কিছুটা পিছিয়ে থেকে গাড়ী নিয়ে এগুতে থাকল গা”র পার্কিং লটের দিকে– এরপর গাড়ী যথাস্থানে গাড়ী পার্ক করতেই, দোতালার সিঁড়ির দিকে দু’জনে এগুতে এগুতে বললাম, আমি তো ভেবেছি, আসছো যখন, এক্কেবারে ডিনার করে যাবে। অথেন্টিক মিশরি রেস্টুরেন্টে না হলেও এরই মধ্যে নানান রেস্টুরেন্টে চমৎকার মিশরি খাবার তো খেয়েছিই আমি। আর তুমি ভারতীয় খাবার খেলেও, বাঙ্গালীর খাবার কখনোই খাও নাই নিশ্চয়ই। হয়েই যাক না তা আজই।
বিনয়ে বিগলিত গা’র ধন্যবাদ দেয়ার সাথে মাফ চাইতে চাইতে বলল এবার, “তুমি তো বিগ বস; তোমার কথা অমান্য করি কিভাবে? তারপরও আশা করি তুমি আমার আব্দার রাখবে। বিগ বসের কাছে এরকম আব্দার করাটা কী অন্যায় হচ্ছে? আমার আশা কী পূরণ করবে না তুমি? ঠিক আছে! পূরণ হবে আব্দার। বলতে বলতে সোফার দিকে করে ইঙ্গিত বসতে বলে বললাম, দাড়াও আমি একটু চায়ের পানি বসিয়ে আসি। “আরে না না। চা / কফি তো আমি খাওয়াতে চেয়েছিলাম। ঠাণ্ডা একগ্লাস পানি হলেই হবে।“ শোন আমাদের গ্রামের দরিদ্র বাঙালিটির দরজায় দাঁড়িয়ে, অচেনা কোন পথিকও যদি পানি চায়, তবে গৃহিণী তাকে পানির সাথে, (যেহেতু গুড়, বাতাসা এসবের ইংরেজি মনে পড়ছে না) বললাম একটু ব্রাউন সুগার দেয়। বলেই মনে হল, ব্রাউনসুগার শুনে তো গা’র মনে করতে পারে যে এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের চাষিদের মতোই বুঝি, পপি চাষ করে আমাদের চাষিরাও! আর সেই পপির বীজ থেকে বুঝি ঘরে ঘরে গৃহিণীরা কুঠির শিল্পের মতো তৈরি করে ব্রাউন সুগার!
কপাল ভাল, মগজ হাতড়ে এসময় জ্যাগারি শব্দটি পেলাম। অতএব ইউ নো জ্যাগারি, বলার পরও ওটা গা’রের বোধগম্য হয়নি বুঝতে পেরে, আই মিন লোকাল সুইট বলতে বলতে, চলে গেলাম রান্না ঘরের দিকে।
লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক।











