দেশ হতে দেশান্তরে

সেলিম সোলায়মান | রবিবার , ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ

ভাইয়েরা কী আমাগো চানপুরের নাকি? দাম্মাম এয়ারপোর্ট নামাংকিত ও কোন এক কোম্পানির লোগো সমৃদ্ধ পোশাক পরা চারজন এইমাত্র এরাইভাল লাউঞ্জ থেকে আমার পিছু পিছু বেরিয়ে, পেছনে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে টানে শুরু করছে যখন, তখনই যোগ দিল তাদের সাথে পঞ্চমজন। ইনি আবার লম্বা চওড়ায় বাকীদের ছাড়িয়ে আছেন। এসেই হাতের লম্বা ডাঁটের ব্রাশ মেঝেতে ঠুকে উচ্চকণ্ঠে কারো উদ্দেশ্যে গালি ছুঁড়ে দিতেই বাকী চারজন একযোগে জোর গলায় হেসে, নানান মন্তব্য জুড়ে দিলে আর তা থেকে চাঁদপুরের মেঘনা নদীর ইলিশের সুঘ্রাণ এসে নাকে লাগায়, তুমুল উৎসাহে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছিলাম, দলটির উদ্দেশ্যে।

সাথে সাথেই এলো নীরবতা তাতে দলটির মধ্যে। অতঃপর ক্ষণিকের সেই নীরবতা ভেঙ্গে ঐ ঢ্যাঙ্গামত নেতা গোছেরজন ঘাড় ঘুরিয়ে চোখমুখ কুঁচকে সরাসরি এদিকে তাকালে কপালের ভাঁজে ও মুখভঙ্গিতে তার মিলল দেখা, কিছুটা অবাক হওয়ার সাথে বিরক্তির ছটা! বেশ অনিচ্ছায় উনি এইদিকে অবলীলায় “না” শব্দটি ছুঁড়ে দিয়ে নিজের সিগারেটের মুখাগ্নি করে বাকীদের সাথে কথা বলতে লাগলেন গলা নামিয়ে!

বুঝলাম না, সমস্যা কী? দেশী ভাইদের কাছ থেকে এরকম উপেক্ষা তো আশা করিনি। কিন্তু সেটাই ঘটল যখন, মনে হল নাহ এবারের দাম্মামের শুরুটা, মোটেও ভাল হলো না। আন্তরিক প্রশ্নের এলো উত্তর এমন উপেক্ষায়!

চাঁদপুরে জন্ম হলেও, ৭১ এর বাঙ্গালী জাতির একইসাথে ভয়ানক ও হিরণ্‌ময় সাহসের সেই সময়টাতেই থেকেছিলাম কিছুকাল চাঁদপুরে। এরপর শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য তো কেটেছে কুমিল্লার জাঙ্গালিয়া ওয়াপদা কলোনিতে। অবস্থান সেটির কুমিল্লায় হলেও, ওখানকার বাতাসে উড়াউড়ি করতো বাংলার বারো রকমের এক্সেন্ট। তাতে আমার বোল হয়ে গেছে কসমোপলিটান বাংলা বা নানান এক্সেন্টের খিচুড়ি। তারপরও পরিষ্কার ধরতে পারি ইলিশগন্ধি ঐএক্সেন্ট। আর কানে গেলেই তা হয়ে উঠি উৎকর্ণ। তাতে যখন আমার শ্যমাল কোমল বাংলাতেই মনে হয় পেলাম দেখা বুঝি খুবই আপনজন কারুর, সেখানে এ তো হল ঘোরতর খড়খড়ে মরু! কিন্তু ঐ লোকটা অস্বীকার করলো কেন তা? আচ্ছা চাঁদপুরের আশেপাশের মানে মাদারিপুর, শরিয়তপুরের লোকজনও তো মনে হয় প্রায় এই এক্সেন্টেই কথা বলে। তা হলে আমারই ভুল হল নাকি? নাহ, ঐরকম ভুল হবার তো কথা নয়। ঐ লোক চাঁদপুরেরই আসলে। এখানে সে ক্লিনারের চাকুরী করলেও তার যা ভাবভঙ্গী দেখলাম চকিতে, মনে হয় তাতে, হয়তো সে নিজগ্রামে গলাবাজি করেছে যে সৌদিতে সে এক হোমরা চোমরা। সেজন্য যেই না সে বুঝতে পেরেছে আমিও চাঁদপুরের, অস্বীকার করেছে বেমালুম। চোরের মন যেমন পুলিশ পুলিশ, সেই সূত্র ধরে হয়তো ভেবেছে সে, আমি বুঝি চাঁদপুরে গিয়ে মাইক লাগিয়ে অচিরেই ফাঁস করে দেব গোমর তার!

আহ হা, প্যান্টের পকেটে থাক ব্ল্যাকবেরি ভাইব্রেট করছে দেখছি।নিশ্চয় ফোন করেছে হাইতাম ফের। মিনিট বিশেক আগে দাম্মাম এয়ারপোটের্র অভ্যন্তরীণ অংশে নেমে, লাগেজ কনভেয়র থেকে নিজের ট্রাভেলব্যাগটা সংগ্রহ করে এখানে বাইরে এসে সিগারেট টানার এই সময়টুকুর মধ্যে এ হবে তাহলে হাইতামের কাছ থেকে আসা তৃতীয় ফোন। আচ্ছা, খুব টেনশনে আছে নাকি বেচারা? তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে ফোন বের করতেই পর্দায় আসলেই হাইতামের নাম দেখে তা ধরতেই, বিনয়ে বিগলিত হয়ে জানতে চাইল সে আছি কোন গেইটে। উত্তরে তা জানাতেই একই বিগলিত স্বর বলে উঠলো

সরি ডক্টর সেলিম, প্লিজ ফরগিভ মি, কামিং উইথ ইন এ মিনিটস”ডোন্ট ওয়ারি! নাথিং টু বি সরি এন্ড নো নিড টু হারি। এভের‌্যথিং ইজ ফাইন উইথ মি, বলে ফোন কেটে সিগারেটে শেষ টান দিয়ে গোঁড়াটি পেছনের ডাস্টবিনে ফেলার জন্য ঘুরতেই দেখি, এরই মধ্যে হাওয়া হয়ে গেছে, কাজের ফাঁকে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে সুখদুঃখের আলাপ করতে আসা দেশী ভাইয়েরা আমার। “আস সালামুয়ালাইকুম ডক্টর সেলিম, সাব্বা এল খে’র। হাও আর ইউ? হোপ এভরিথিং ফাইন? সরি আই এম লেইট!”

আমার কাছ থেকে হাত তিনেক দূরে এইমাত্র টয়োটা রেভ ৪ এসইউভিটি এসে থামতেই, সেটির ড্রাইভিং সিট থেকে, একদম কামানো মাথা, মুখে এক গোছা সযত্নে লালিত ফ্রেঞ্চ কাট দাড়িসমৃদ্ধ গাট্টাগোট্টা ধরনের লোকটি দুহাত বাড়িয়ে এদিকে এগুতেই বুজলাম এই হল হাইতাম আজ্জম। নাহ অফিসিয়াল ছবিতে দেখেছিলাম যেমন, সেটির সাথে চেহারার আদলের মিল থাকলেও, সেই চেহারার সাথে শারীরিক গঠনের যে কল্পনা করেছিলাম, মিল নাই সেটির। লম্বায় সে তার বস মোহাম্মেদ আল গারের মতো গড়পড়তা মিশরিদের চেয়ে বেশ খাটো হলেও, চওড়ায় সে মিশরি হওয়াতে কেমন যেন গোলগাল নাদুসনুদুস দেখাচ্ছে তাকে। আচ্ছা মাথাটি কি একদম কামানো তার, নাকি এ হলো আমাদের সফদার ডাক্তারের টাক! সবচেয়ে দর্শনিয় বিষয় হল, গোলগাল মুখটি তার হাসছে সারাক্ষণই। আর সেই মুখই পুনরাবৃত্তি করছে বারংবার, উপরের ঐ কথাগুলোর। আচ্ছা চেনা কার মতো জানি লাগছে একে দেখতে?

ওহ হো! এ তো দেখছি বলিউডের তুখোড় অভিনেতা অনুপম খেরের সাক্ষাৎ মিশরি ভার্সন। ভাবতে ভাবতে সদাহাস্য ঐ মুখের তাকিয়ে পাল্টা হাসিমুখে এগিয়ে হাত মেলাতে মেলাতে ওয়াআলাইকুম। এভরিথিং ফাইন। হাও আর ইউ। ইজ এভ্রিথিং ফাইন উইথ ইউ। থ্যাংক্স ফর টেকিং দ্য ট্রাবল অব পিকিং মি। বলতেই “ইতস মাই প্লেজার, মাই প্লেজার ডক্টর সেলিম। নো ট্রাবল, নট এতল।’ বলেই অত্যন্ত তমিজের সাথে আমার হাত থেকে ট্রলি ব্যাগটি নিয়ে দ্রুতই সেটি গাড়ীর পেছনে তুলে, ফের দেখা হওয়ার পর থেকে বলতে থাকা ঐ কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করতে করতে, দ্রুত এসে গাড়ীর পেছনের দরজা খুলে সবিনয়ে উঠে বসার অনুরোধ করতে করতে জানাল হাইতাম, এখানে বেশীক্ষণ দাঁড়ালে সিকিউরিটিরা ঝামেলা করতে পারে উত্তরে আই উইল বি সিটিং বিসাইড ইউ বলতে বলতে, নিজেই ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটের দরজা খুলে এক লাফে উঠে বসতেই, একই দ্রুততায় হাইতামও ড্রাইভিং সিটে উঠে গাড়িটিকে সজাগ করতে করতে গন্তব্য জিজ্ঞেস করতেই বলি চল আপাতত, হোটেল রামাদা সুইটস দাম্মামে।

শুনে, “ওকে ওকে” বলে গাড়ী ছুটিয়ে দিতে দিতে ফের হাইতাম বারংবার সরি বলতে বলতে, ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলো কেন সে আগে থেকেই এয়ারপোর্টে হাজির থাকতে পারেনি। আর কেনই বা সে কারনে আমাকে অহেতুক অপেক্ষা করতে হল। সাথে এও জানালো যে সময়নিষ্ঠতার ব্যাপারে ঘোরতর যে অনুরাগ আছে আমার, জেনেছে সে তা তার বসের কাছ থেকে উচ্চ হেসে বললাম, শোন তোমার আমার মধ্যে এই বিষয়ে কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়েছিল কী? নাকি আমি অফিস অর্ডার জারী করেছিলাম ঠিক ক’টায় তোমাকে থাকতে হবে? তা তো অবশ্যই নয়। আরে যদি তুমি হাজির মওজুদ থাকতে, তাহলে আয়েশ করে যে সিগারেটটা টানলাম, তা তো হতো না। জীবনে কিছু কিছু সময় একটু আধটু দেরী হওয়াও ভাল বুঝলে। এখন বল, হোটেলে পৌঁছুতে কতক্ষণ লাগবে? “ফরটি টু ফিফটি মিনিটস”ঠিক আছে। হোটেলে চেক ইন করে রুমে ব্যাগটা রেখে দ্রুত পোশাক বদলে নেমে আসবো নীচে। এইফাঁকে তুমি লবিতে বসে কফি খেও। তারপর আমি যাবো কোথায়। তা জানো তো? ‘ইয়েস, মাই বস ডক্টর গা’র টোল্ড মি। আই উইল টেক টু বাহরাইন।’ হুম, তা হোটেল থেকে বাহরাইন গিয়ে ফিরে আসতে কতক্ষণ লাগতে পারে? এ সময়ে যেহেতু এপাশের রাস্তাটা ফাঁকাই পাওয়া যাবে আশা করি।সৌদিরা তো সব বিকেলের দিকে যেতে শুরু করে বাহরাইন লাইন ধরে, তাতে জ্যাম লেগে যায় ব্রিজে। এখন বরং ঐদিক থেকে আসা শুরু করেছে তারা। অতএব ফাঁকা এ পাশ দিয়ে যেতে খুব এক ঘণ্টার মত লাগতে পারে।

তাই নাকি? প্রতি সন্ধ্যায়ই কী দাম্মাম, খোবারের লোকজন যায় নাকি বাহরাইনে? ‘শুধু দাম্মাম, খোবার কেন রিয়াদ থেকেও অহরহই যায়। বাহরাইন হল সৌদিদের হাতের কাছের ব্যাংকক। এখন এক ঘণ্টার বেশি লাগবে না আমাদের ব্রিজের ইমিগ্রেশন পর্যন্ত পৌঁছুতে’ হাইতামের মুখ থেকে এইমাত্র ইমিগ্রেশন শব্দটি বেরুতেই পেয়ে বসলো আমায় ইমিগ্রেশন ফোবিয়ায়। সৌদিতে এরই মধ্যে দুই দুইবারই তো ভিন্ন দুই রকমের যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়েছি। ভাবছি তাই, কোন যে ঝামেলায় পড়ি এবার আবার ইমিগ্রেশনে, তা কে জানে? ঘটনা হচ্ছে আমার জন্য বেচারা হাইতামও যদি পড়ে ঝামেলায়, তবে তো হয়ে যাবে ইজ্জত ফানা ফানা। আমার ভিসায় তো নট ফোর ওয়ার্ক ছাপ্পর মারা। এমতাবস্থায় আমার সূরত মোবারক ও পাসপোর্টের রংয়ের বিবেচনায় নিয়ে ইমিগ্রেশন স্যার, আমাকে মিসকিন সাব্যস্ত করে যন্ত্রণা দিতে থাকলে, তা দেখে হাইতাম যদি আবার উঠে পড়ে লেগে যায় এটা বোঝাতে যে, আমি তার কতো বড় বস, তাহলে যে হয় কোন হাঙ্গামা? কে জানে? নাহ, আমার ভিসাটি হালালিকরনের গিউসি আবিষ্কৃত দাম্মামপদ্ধতি কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত বেশ সহজ ও চমকপ্রদ মনে হলেও, এর সাথে আসলে হাইতামকে জড়ানো ঠিক হয় নি। গিউসি যেখানে নিজেই বলেছে আমার ভিসা নিয়ে কারো সাথে আলাপ না করতে, সে জায়গায় কেন আবার সে এর সাথে হাইতামকে জুড়ে দিল? আমি নিজেই তো হোটেলের সোফার চালিত গাড়িতে বাহরাইনে ঢু মেরে আসতে পারতাম। তাতে হাইতামও বেহুদাই জানত না আমার ভিসা বিষয়ক দুর্বলতার বিষয়টি। আবার এখন হাইতামের সামনেই যদি ইমিগ্রেশন স্যার আমাকে মিসকিন সাব্যস্ত করে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, তাতেও তো যাবে ইজ্জত। আচ্ছা, ফাহাদ যে মিশরিদের মোটেও বিশ্বাস না করার ব্যাপারে প্রতিনিয়ত আমাকে সাবধান করে বলে যে, গিউসি যতোই ভাল মানুষের ভড়ং ধরে থাকলেও, আসলে সে একটা মিচকা শয়তান। ঘটনা কী তাই নাকি? “ডক্টর সেলিম, বাহরাইনের কোথায় কোথায় যেতে চাও তুমি?”

হাইতামের এই প্রশ্নে বুঝলাম, আসলে সে জানে না আমার এই বাহরাইন ট্রিপের মাজেজা। বাহরাইনে তো আমার কোন কাজই নাই। আবার আসিনি আমি ভ্রমণেও। গিউসির ব্রিফিং মোতাবেক যা করতে হবে আমার তা হল, কিং ফাহদ কজওয়ের সৌদি ইমিগ্রেশন থেকে আউট সিল নিয়ে, সামনে এগিয়ে বাহরাইনের ইমিগ্রেশন থেকে ইন সিল নিয়ে, সামনে এগিয়ে ইউ টার্ন নিয়ে, ফের যথাক্রমে বাহরাইন আউট সিল নিয়ে সৌদিতে ইন করলেই হয়ে যাবে আমার ভিসা হালাল।

লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণ সাহিত্যিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধপত্র মিতালীর সে সময়গুলো
পরবর্তী নিবন্ধমাইকেল মধুসূদন দত্ত ও মেধনাদবধ কাব্য