শুধুই এই জীবনে না জীবনের যে কোন পর্বের যে কোন সময়েই একজন ভাল মানুষের সংশ্রব, বন্ধুত্ব হারানোকে বড় ধরনের পাপ মনে করি। কপাল ভাল ফারুকের মতো ছেলেমিসুল্ভ আত্মতুষ্টিতে ভোগা তরুণের অবিমৃষ্যকারিতার কারণে আমিনের আর আমার মাঝে যে বরফ জমেছিল তিন দিন আগে গলেছে সে বরফ!
ফলে আজ ঘুম থেকে উঠার পর ঠিক করেছিলাম সেই বরফ গলানোর জন্য সময়ের কিছু আগেই, আগ বাড়িয়ে নিজেই চলে যাবো আমিনের বাসায়, আমাদের শুক্রবারের রুটিন মেনে তার গাড়িতে জুম্মার নামাজ পড়তে যাওয়ার জন্য। তবে ঘটনা যা ঘটেছে, তাতে মনে হচ্ছে সম্ভবত সেও একই কথা ভেবে নিজেও কিছু আগেই রওয়ানা করে এসেছিল গাড়ী নিয়ে আমার বাসার সামনে। সম্ভবত সেও ছুতা খুঁজছিল আমার উপর রাগ করেছিল সেটি ভেঙ্গে সহজ হওয়ার। আর এসেই বাসার সামনের রাস্তায় আমাকে দেখতে পেয়ে, হড় বড় করে আগে রওয়ানা করার কারণ হিসাবে বলেছিল
“বুঝলা না ভাবছিলাম আজ মসজিদের আশেপাশে ফলফলাদি নিয়ে বসে হকারেরা তাদের কাছ থেকে আম কিনব। গত সপ্তাহে বেশ ভাল আম দেখেছিলাম, কিন্তু কিনি নাই। সেজন্যই একটু আগেই যাই চল আজ।”
হুম ঠিক বলেছ চল চল, মান ভাঙ্গার পর নতুন করতে ভাব করতে গিয়ে ছোটবেলায় যে অস্বস্তিতে পড়তাম, এ বয়সেও আমাদের দুজনের মধ্যেই সে ভাবের উপস্থিতি দেখে, উত্তরে ঐ কথা বলতে বলতে বসেছিলাম উঠে তার ড্রাইভিং সিটের পাশে।
অতঃপর জুম্মা শেষে ঘরে ফিরে খাওয়া দাওয়া করার পর, এ ক’দিনের একটানা কাজের ক্লান্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠায়, পেয়েছিল তুমুল ঘুম। ভাঙল সেই ঘুম একটু আগে, এই শেষ বিকেলে। এখানে আমার একমাত্র সৌদি বন্ধু ও সহকর্মী খলিল মানে আমাদের হেড অব সেলসের ফোনে। জানিয়েছে সে সন্ধ্যায় নিয়ে যাবে আমাদের কোন একটা গ্রামে, একদম সৌদি ট্র্যাডিশনাল ক্যাবসা খাওয়াতে। গ্রামটির নাম নজদ। তবে এ হবে শুধুই আমাদের তিনজনের পার্টি। মানে গিউসি খলিল আমি এই তিনজনই থাকবো এই পার্টিতে।
এই মরুতে আসার পর থেকে, বেশ অনেকবারই মনে হয়েছিল, মরুগ্রাম দেখতে যাবো একদিন। এই রিয়াদ শহর তার চরিত্রে কসমোপলিটান হতে না পারলেও, পদচারণা এ শহরে বারো জাতের মানুষের। ফলে এই শহরের চরিত্র যা দাঁড়িয়েছে, এর জীবনযাপনের সংষ্কৃতি যা দেখছি ও অনুভব করছি, সেটিকে ঠিক সৌদি সংষ্কৃতি বলা মুশকিলই মনে হচ্ছে। মোতাওয়া মানে শরিয়াহ পুলিশের ছড়ি ঘোরানোর কারণে এখানে বারো দেশের আঠারো জাতের মানুষকে যাপন করতে হয় যে নিয়ন্ত্রিত জীবন, এবং একই সাথে নিজে নানান সময়ে মিসকিন হিসেবে যে তুমুল বৈষম্যের শিকার হই, ওটাই কি সৌদির আসল সংস্কৃতি? ধন্দে পড়ি এ নিয়ে প্রায়শই। আজ যেহেতু খলিল গ্রামে নিয়ে যাচ্ছে, তাহলে অল্প সময়ের জন্য হলেও সামান্য কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারবো সৌদিজীবন যাপনের সংষ্কৃতি।
তবে একটা ব্যাপারে সেই শুরু থেকে খটকা আছে মনে; তা হল ঐ যে খলিল বলল, সৌদি ট্র্যাডিশনাল ক্যাবসা খাওয়াবে, সেটা আবার কী রকম? এতদিন যে কয়বার ক্যাবসা খেলাম, এমন কি একবার যে ক্যাবসা পার্টিতে গেলাম ঐগুলো তা হলে কী ছিল? আবার ক্যাবসা তো হল আমাদের বিরিয়ানির মতো ভাত সমৃদ্ধ খাবার। এই ভাত ব্যাপারটাকে তো ঠিক সৌদি সংষ্কৃতির বলে মনে হচ্ছে না আমার। ছোটবেলায় বইপুস্তকে মানে বিশেষত পাঠ্যপুস্তক পড়ে সৌদি সম্বন্ধে যৎসামান্য যা জেনেছিলাম, তা থেকে তো জানতাম যে সৌদিদের প্রধান খাদ্য হল যবের রুটি, খেজুর, উট, দুম্বার মাংশ ও দুধ। থাকে তারা খেজুর পাতার ছাউনি দেয়া পাথুরে ঘরে। কিন্তু এখানে আসার পর এদের খাদ্য সংস্কৃতির যে হাবভাব দেখেছি, মনে হচ্ছে তাতে এই ক্যাবসাই হচ্ছে এদের জাতীয় খাবার! কিন্তু সৌদি মরুভূমিতে ধান হয় বা এরা ধান চাষ করে এমন তো শুনিনি। যার মানে হচ্ছে চাল তো তারা আমদানি করে। মরুবালি খুঁড়ে তেল বের করার পর রাতারাতি ধনী হয়ে যাওয়াতেই না এই গ্রহের যে কোন জায়গা থেকে এরা যে কোন কিছুই আমদানি করতে পারছে। সেই তথ্য ও যুক্তি বলছে ক্যাবসা তাদের জাতীয় খাবার হয়ে উঠার কথা তেলপ্রাপ্তির পর থেকেই। তার আগে তো এরা যতদূর সম্ভব যাপন করতো উট দুম্বা পালকের বেদুঈন জীবন। আর ম্রুদ্যান গুলোতে জন্মাতো নানান জাতের খেজুর। তবে এদের অর্থনীতির চাকায় তেল যোগাতো সে সময় মূলত পবিত্র মক্কা ও মদিনা শহর।
বিছানা ছেড়ে, হাত মুখ ধুয়ে রেডি হতে হতে এসব ভাবতে ভাবতে একবার মনে হয়েছিল চা বানিয়ে খাই। কিন্তু সাথে সাথেই মনে হয়েছিল, নাহ এখন আর একাকী চা না খাই। ফোনে খলিল জানিয়েছিল যে আসবে না সে এদিকটায়। বরং গিউসিই এসে তুলে নিয়ে যাবে আমাকে। প্রথমত গিউসি চেনে গ্রামটা, দ্বিতীয়ত এই কমপাউন্ডের কাছাকাছি আরেকটা কমপাউন্ডে যেহেতু থাকে গিউসি, সেজন্য তার পক্ষেই আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়াই ভাল। এছাড়া মূলত ইউরোপিয়ান আমেরিকানদের জন্য বানানো এসব কমপাউন্ডে সৌদিদের তো প্রবেশ নিষিদ্ধ।ভাবছিলাম তাই গিউসি এলেই চা বানিয়ে, একসাথে দুজনে চা খেয়ে বের হবো।
বাহ ভালোই সিনক্রোনাইজেশনই হয়েছে তো দেখছি গিউসির আর আমার। এইমাত্রই প্রথমবারের মতো কোন মরু গ্রাম দেখতে নজদ নামের গ্রামের যাওয়ার জন্য পুরো তৈরি হয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসতে না বসতে ঘরের ফোন বেজে উঠতেই, কমপাউন্ডের সিকিউরিটি পোস্ট থেকে ফোন করে জানালো গিউসির আগমনের খবর। আমার কাছ ছাড়পত্র পেয়ে সিকিউরিটি এতক্ষণে নিশ্চয় গিউসির গাড়ীর জন্য গেইট খুলে দিয়েছে। গেইটের একদম কাছাকাছি যে বাংলোগুলো তার একটিতে যেহেতু আমার বাস, সেহেতু অচিরেই চলে আসবে গিউসি। অতএব তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য নীচে নেমে আসতেই দেখতে পেলাম গিউসির প্রাডোর নাক।
অচিরেই সেই প্রাডো আমার সামনে এসে দাঁড়াতেই জানালা নামিয়ে– “সালামালাইকুম সেলিম, উঠে পড়, উঠে পড়। ভালই হয়েছে তুমি তো দেখছি একদম রেডি হয়ে আছ। অতএব দেরী করার তো আর কারণ নাই।”
আরে নাহ সেজন্য তো নামি নাই। নামো তুমি বরং গাড়ী থেকে। একটু বস আমার বাসায়। আমি তোমাকে বাংলাদেশী স্টাইলে দুধ চা বানাইয়া খাওয়াই। তারপর যাওয়া যাবে। গিউসির দেয়া তাড়ার জবাবে তাঁকে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতেই বলল– “না না, আজ না। অন্য কোনদিন খাবো তোমার বাংলাদেশী চা। আমার ধারণা এরই মধ্যে খলিল পৌঁছে গেছে। অতএব এখানে আর দেরী না করি । দুইজন না তিন জনেই একসাথে চা /কফি খাওয়াটা আরও জম্পেশ হবে না? অতএব চল।” হুম, ভালই বলেছ। ঠিক আছে আমি তাহলে ঘরে তালা মেরে আসি। এই ফাঁকে তোমার গাড়ী ঘোরাও এই বলে, দ্রুত দোতালায় উঠে ঘরের ড্রইংরুমের টেবিলে থাকা চাবিটি পকেটস্থ করে ঘর থেকে বেরিয়ে মূল দরজাটি টেনে লক করে নীচে এসে, ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা গিউসির পাশে উঠে বসতেই, গাড়ির এক্সেলেটর চেপে বলল গিউসি–
“তোমাকে তো মনে হচ্ছে এক যুগ পরে দেখলাম। সেই যে দেশ থেকে ফিরে প্রথম দিন সকালে দেখা হয়েছিল, তারপর আজ দেখলাম।”
তা ঠিক। জানোই তো এই বাজেটের সময়ে কী রকম চাপ থাকে। তদপুরি এই মার্কেটে তো আমি নতুন। আবার কয়দিন পর তো তুমিও চাইবে, আমার নিজেরসহ টিমের সবার যেন মিড ইয়ার পারফর্মেন্স রিভিউ শেষ করি।আচ্ছা হেডকোয়ার্টারে তুমি যখন এইচ আর কনফারেন্সে যাবে, তখন একটু বলো তো বাজেট পিরিয়ডে যেন মিডইয়ার পারফরমেন্স রিভিউর ডেডলাইন না দেয়। কথাটা অবশ্য আমি বেশ কয়েক বছর ধরেই বলছি। দেশে বলেছি, সিংগাপুরেও বলেছি কাজ হয়নি। এখন দেখি তোমাকে বলে কাজ হয় কি না ।
“আরে ওটা বাদ রাখো। জানোই তো, আমি বললেও কাজ হবে না। ওখানে তো এখন উলটপালট অবস্থা। নতুন রিজিওনাল হেড তো সাথে করে নতুন রিজিওনাল এইচ আর হেড ও নিয়ে আসছে। তারে তো এখনো চোখে দেখি নাই। পরিচয় যা হয়েছে, হয়েছে তো তা টেলি কনফারেন্সে। মিডইয়ার তো সব ডিপার্ট্মেন্টের জন্য একই সময়ে পরে। আগেও যখন একই সময় দুইটাই করতে পারছ, এবারও পারবা। তা ফিল কি তোমাকে কিছু বলেছে বাসেলের খবর?”
আরে, তার সাথে সময় করে বসতে পারলাম কই একান্তে আর। যেদিন আসলাম সেদিনই তো বাদাউয়ির স্ট্রাটেজি টিমের কাছ থেকে বাজেট বিষয়ক আজ করিয়ে নেবার দায়িত্ব দিয়ে চলে গেল বস জেদ্দায়। শুধু বলেছে হেডকোয়ার্টার নিয়ে মাথা না ঘামাতে। ওটা সে দেখবে। আমি যেন বাজেটের কাজে মনোযোগ দেই। তো সেই কাজ শেষ করে, যেই না একটু দম নিব ভাবছিলাম, তখনই ফিল অফিসে ফিরে এসে তার রুমে আমিন আর আমাকে ডাকলেও, আলোচনার বিষয় তো ছিল সেই বাজেট। তদপুরি ফিনান্সিয়াল ডকুমেন্টস ধরা পড়লো ভুল, সে সময়। ফলে আমিন আর আমি মিলে ফারুককে নিয়ে বসে গত কয়দিন একটানা কাজ করেই তো সব ঠিক করলাম।
“হুম জানি তা। আচ্ছা বলোতো, আমিন শুধু পাকিস্তান থেকে লোক আনছে কেন? নিজে পাকিস্তানি বলে শুধু পাকিস্তান থেকেই লোক আনলে তো চলবে না। কী বল তুমি?”
নাহ সরাসরি দেয়া যাবে না গিউসির এই প্রশ্নের উত্তর। জানি না তো মতলব কী তার? এমনিতেই সে মাঝে মাঝে, আমিন আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলে খোঁচা দেয়। বললাম তাই, শোন যাকে যেখান থেকেই আনুক আমিন, তা তো আর তোমার অগোচরে হয়নি। তুমিই তো মানব সম্পদ বিভাগের প্রধান।
“এই ফারুককে কিন্তু আমার বেশ ফানি মনে হয়। আচ্ছা ওটা থাক। সৈয়দ রাজভি আর ইসামের ব্যাপারে বল। তুমিতো ওদের নিয়ে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছ কয়েকদিন। কী মত তোমার ওদের ব্যাপারে?”
হ্যাঁ মাত্রই তো তিন দিন একটানা তাদের সাথে কাজ করেছি। আমার আগেই জাহাতু তুমি এসেছো, আর এইচ আর হেডের কাছেই তো থাকে নানান ডিপার্টমেন্টের হাড়ির খবর। অতএব তোমার মতই বল না শুনি?
দেখো, আমি তো তাদেরকে বাইরে থেকে দেখি, তাই তাদের কমপিটেন্সি নিয়ে তো কিছু বলতে পারবো না। তাদের বস বাদাউয়ি বলতো দুজনই নাকি খুব ত্যাঁদড়। অবশ্য বাদাউয়ির কথা আর না বলি, সে তো চলেই গেছে। এমনিতে কোম্পানির বেশীরভাগ মানুষই এই দুজনকে খুব একটা পছন্দ করে না এটা বলতে পারি।
কমপিটেন্সির কথা যদি বল, আমি বলবো তারা অত্যন্ত দক্ষ। সমস্যা হল মূলত তাদের কমিউনিকেশন স্টাইল। যেমন শুরুতে আমাকেও বেশ হিল্লি দিল্লি দেখানোর সাথে নানান জনের ব্যাপারে তারাও নানান অভিযোগ করলেও, শেষ পর্যন্ত কাজ যা দিয়েছিলাম তা কিন্তু করে দিয়েছে এবং বেশ ভালই করেছে। অবশ্য একইসাথে নানাভাবে বেশ ঘামিয়েছে আমাকেও। “সেটাই তো শুনলাম। শোন আমরা কিন্তু চলে এসেছি। ঐ যে দেখছো না লেখা নজদ ভিলেজ”
আরেহ এই গ্রাম তো দেখি গ্রাম না। এই তো দেখি আরবি স্টাইলে বানানো মেটে আর সাদা রঙ্গয়ের দুই বা তিন তলার এক দুর্গ টাইপের অনেকখানি জায়গা দখল করে দালান! সামনের বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে এর পার্কিংস্পেস। এরই মধ্যে বেশ কিছু গাড়ি পার্ক করা আছে দেখছি। বাহ গোটা দুয়েক ফেরারি ও হামার ওতো দেখছি। এ তো গ্রাম না, হল আসলে রেস্টুরেন্ট। এরই মধ্যে গিউসি, খলিলের বিশালাকায় জিএমসি এস ইউভিটি দেখতে পেয়ে, সেটির পাশে তার গাড়ী পার্ক করতেই, গাড়ী ছেড়ে নেমে এগুলাম দুজনে “নজদ ভিলেজ” নামের রিয়াদ শহরের উপকণ্ঠের সম্ভবত বেশ জনপ্রিয় এই ট্র্যাডিশনাল স্টাইলের রেস্টুরেন্টের প্রবেশ পথের দিকে।
লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক।












