আজো পাইনি ফেরত গাড়ি, টয়োটার ওয়ার্কশপ থেকে। দেখা যাক পাই কিনা আগামীকাল । গত দুইদিন আমিনের গাড়িতে বাসা অফিস বাসা করেছি।বেশ আগেই আজ সে বেরিয়ে গেছে, কী এক কাজে । দাঁড়িয়ে আছি তাই অফিস বিল্ডিঙয়ের সামনের ফুটপাতে, ট্যাঙি ধরার জন্য।
বাজে প্রায় পৌনে ছয়টা। রিয়াদের বুকে সন্ধ্যা নামবে আরো ঘণ্টা দেড়েক পর। সে সময়ে ডানে ও বাঁয়ে দূরের ঐ মামলাকা ও ফয়সালিয়া টাওয়ারে যোগ হবে ঝলমলে আলোর মুকুট। শুধু ঐ টাওয়ার দুটোই কেন? এই তাহলিয়া স্ট্রিটে, ফয়সালিয়া টাওয়ারের ওলায়া ডিসট্রিক্টে এবং মামলাকা টাওয়রের কিং ফাহাদ স্ট্রিটের সব স্ট্রিট লাইটের সাথে ভবনে ভবনে সামান্য আগু পিছু করে জ্বলে উঠবে নানান রঙ্গয়ের আলো। আলোয় আলোয় মোহন হয়ে উঠবে গোটা পরিবেশ। তখন আর বোঝার উপায় থাকে না, এখানে এক সময় ছিল ধু ধু বালির মরু। অবশ্য শুধু আলো নয়, তপ্ত জুনের বিকেলের এই সময়টায় মরুভাস্করের তেজও যায় কমে ঢের। না হয়, মিনিট দশেক হল যে দাঁড়িয়ে আছি স্যুটেড বুটেড অবস্থায় ট্যাক্সি ধরার জন্য তা তো সম্ভব হতো না। দাঁড়িয়েছি এমন জায়গায় তাতে অবশ্য ট্যাক্সিচালকদের বোঝার উপায় নেই যে অপেক্ষা করছি আমি ট্যাক্সির।
হ্যাঁ, আমার বর্তমান অবস্থান থেকে দশ কি বিশ মিটার দূরেই এই রাস্তার ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের মতো জায়গাটা। সারক্ষণই ওখানে ট্যাক্সি মজুদ না থাকলেও, খালি ট্যাক্সি এই এলাকা পার হওয়ার সময় , দাঁড়ায় ওখানে কিছুক্ষণের জন্য যাত্রীর আশায়। কিম্বা কেউ ট্যাক্সিতে তাহলিয়া স্ট্রিটে এলে যে সব জায়গায় ক্যাব ড্রাইভার যাত্রীদের নামায়, সেগুলোর মধ্যে ঐটি অন্যতম।
দশ মিনিটে মোট তিনটা ট্যাক্সি এসে ওখানে দাঁড়ালেও, সেগুলো সৌদি ড্রাইভারচালিত হওয়ায় এগুইনি। ঠিক ঐ জায়গায় দাঁড়ালে তো এড়ানো যেত না তাদের। ক্যাব যদি না ই নেই, তবে কেন দাঁড়িয়েছি ঐখানে এ নিয়ে ঐ ড্রাইভারদের গালাগালি শোনার সম্ভাবনা প্রচুর। সেজন্যই ওখানে না দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়েছি একটু দূরে, এমন ভাবে যেন বা আমি বুঝি তাহলিয়া স্ট্রিটের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করছি।
কপাল ভাল। এইমাত্র ওইখানটায় এসে যে ক্যাবটি দাঁড়িয়েছে সেটির ড্রাইভারের পোশাক আশাক, চেহারা গড়ন, গঠন সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে তাকে হবে সে উপমাহদেশিয়। অতএব হাত তুলে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত এগুতেই, উৎসুক ড্রাইভার কাঁচ নামিয়ে এদিকে তাকাতেই, জানলাম গন্তব্য। তাতে হাতের ইশারায় সে গাড়িতে উঠার ইঙ্গিত দিতেই বসলাম গিয়ে গাড়ির দেহ শীতল করা আবহের পেছনের সিটে।
সাথে সাথেই ড্রাইভার গাড়িটি একটু পিছিয়ে এই রাস্তা থেকে বের হয়ে কিং ফাহাদ রোডে উঠার মানসে, গাড়ির নাক ঐ বরাবর নিয়ে সামনে এগুতে শুরু করতেই ভাবছিলাম, যে কোন শহরে গেলে ওখানকার ট্যাক্সিতে উঠলে ড্রাইভারদের সাথে আলাপ জমিয়ে বুঝতে চেষ্টা করি ওখানকার হাল হকিকত। তা তো হয়ে উঠেনি এখানে এখনো। সেই যে প্রথমবার এসেছিলাম, সেবার সারারাত ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার তুমুল দুর্ভোগ পার হবার পর সেই একবারই তো উঠেছিলাম ট্যাক্সিতে। তাও সেবার আবার পড়বি পর মালির ঘাড়ের মতো, পোশাকের ধাঁধায় উঠেছিলাম এক সৌদির গাড়িতেই অবশেষে। এরপর আর ট্যাক্সি ব্যবহার তো করতে হয় নি। সুযোগ যখন এসেছেই আজ, করি ওটার সদ্ব্যবহার। এ ভাবনার লেজ ধরে তখনি খাস বাংলা কথা আসতেই চমকে যাই– “হ্যালো, হ্যালো হ্যাঁ হ্যাঁ। হ কেরায়া আছে। তোর লগে পড়ে কথা ক্মু।”
ড্রাইভারের মুখে বাংলা শুনে যতো না, তারচেয়ে বেশী চমকেছি তার উচ্চারিত ঐ “কেরায়া” শব্দে। বহুকাল আগের ছোটবেলায় নৌকার মাঝিদের ও রিকাসাওয়ালাদের মুখে চাঁদপুর আর কুমিল্লায় এই শব্দ শুনলেও তারপর বহুদিন আর তা না শোনায় ভুলতেই বসেছিলাম শব্দটা! বাংলাদেশের কোন জেলা ভাই? নাম কী?
তুমুল চমকে চকিতে পেছনের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে কপালে চোখ তুলে উত্তর আসে, ‘আপনি বাংলাদেশি স্যার!”
অতপর একই রকম দ্রুততায় ঘাড় ঘুরিয়ে গাড়ী চালনায় মনোনিবেশ করে আওড়ায়, “স্যার সৌদিতে বিদেশকরণের ১৮ বছর হইলো। এর মধ্যে আইজকাই প্রথম একজন সুট টাই পরা কান্দে কম্পিউটার ঝুলানো দেশি মানুষ পাইলাম! বাড়ি আমার চৌমোহিনী,নাম শাহ সুলতান।” আরেহ নামটা তো বেশ! এক্কেবারে ডাবল রাজা বাদশা নাম। শাহআলম নাম অহরহ শুনলেও এই নাম তো নতুন শুনলাম, ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করি, তাহলে আঠারো বছর ক্যাব চালাইতেছেন রিয়াদে? “না, না প্রথম ১৪/১৫ বছর কফিলের গাড়ি চালাইছি। তিন চাইর বছর আগে কফিল একদিন কইলো, তুই দেশে যা গিয়া। আমি সৌদি ড্রাইভার নিমু। শুইন্না মাথা এক্কেরে ঘুইরা গেছিল পত্থমে। হাতে পায়ে ধইরা কইছিলাম, দেশে গেলে করুম কী? আমারে মাইরেন না। কপাল ভাল যে কফিলডা অতো বদ না। গালাগালি করলেও গায়ে হাত তুলে না। কথা কইলেও শুনে। তো কইল কফিল, ঠিক আছে দেখি তোরে অন্য কারো কাছে দিতে পারি কী না। জানে পানি আইল শুইন্না। দুই দিন পর আমারই মনে হইছিল আরে নতুন কোন কফিলের গাড়ি না চালাইয়া, ক্যাব কোম্পানির গাড়ি চালাইলেই তো হয়। আয় রোজগারও ভাল হইবো। স্বাধীনও হইলাম।ইচ্ছা হইলে কোন দিন, দিন রাইত চালামু। ইচ্ছা না হইলে চালামু না।” গাড়ি চালাতে চালাতে একটানা ঐ কথাগুলো বলে বিরতি দিতেই কাটলাম ফোঁড়ন বাহ! ভালই বুদ্ধি তো আপনের। তাতেই কফিল রাজী হইছিল? “বুদ্ধি তো আরো বাকী আছে। খাড়ান কইতাছি। আমার কথা শুইন্না কফিলে কতক্ষণ দম ধইরা থাইক্কা কইছিল, তাইলে তো তোরে প্রতিমাসে আমারে ১৫০০ রিয়াল দিতে হইবো ইকামার খরচ বাবদ। আর তোর পাসপোর্ট কিন্তু আমার কাছেই থাকবো। দেশে যখন যাবি তখন তোর সব দেনাপাওনা কিলিয়ার থাকলে দিমু পাসপোর্ট। শুইনা প্রথমে মনে হইছিল আরে কয় কী? কতো বছর চাকরি করার পর বেতন হইছিল আমার ১২০০ রিয়াল। এখন ধইরাই দিতে হইবো তারে ১৫০০! তারপর অনেক বইলা কইয়া, ১৩০০ রিয়ালে রফা হইলো। চিন্তা করলাম দামটা একটু বেশি হইছে। তয় অসুবিধা কী? স্বাধীন তো!”
শাহ সুলতানের এই স্বাধীনতা বাবদ, মাসে ১৩০০ রিয়াল কেন গুণতে হচ্ছে? বুঝলাম না ব্যাপারটা। তবে আপাতত থাক, পরে বুঝে নেয়া যাবে কখনও ওটা। এই ভেবে জিজ্ঞেস করি, সেই থেইক্কাই আপনি ক্যাব চালান?
“না তারপরেও ঘটনা আছে। আমারে ছাইড়া দেওনের মাস দেড়েক পরেকফিলে ফোন কইরা কয়, তুই আয়; সৌদি ড্রাইভার যে রাখছি ডিউটি করে না ঠিক মতো। ঐ শালারে বাইর কইরা দিছি। শুইন্না তো মাথাত বারি পড়লো। এরমধ্যেই তো ক্যাব চালানোর মজা পাইয়া গেছি। কফিলরে ১৩০০ দেওনের পরও কামাই অনেক ভাল। আবার তার কথা না মানলেও তো অইবো না। এর মইধ্যেই আরেকটা বুদ্ধি আইতেই পরের দিন কফিলের কাছে হাজিরা দিয়া কইলাম, আপনে আরেকটা ভিসা বাইর করেন । আমার শালা আছে দেশে, ভালা গাড়ী চালায়। তারে আপনে ১০০০ রিয়াল দিলেই অইবো। আমারে ক্যাব চালাইতে দেন আমি তো ১৩০০ দিমুই। তয় যতদিন শালায় আইসা না পৌঁছাইব, ততদিন আমিই চালামু গাড়ী।”
শাহ সুলতানের এই বিত্তান্ত শুনে ভাবি, আরে এ তো দেখি বিরাট চেইঞ্জ ম্যানেজার! বসের দেয়া চেঞ্জড্রাইভের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এর মধ্যে যাদের নিয়ে টিম বানিয়েছি, তাতে তো এর মতো মানসিকতার লোক দরকার ছিল। দুই দুই বার ঝুকিতে পরে কি রকম ঘুরে দাঁড়ালো! এসব ভাবতে ভাবতে বলি এরপর কী?
“আর কি অইব? আড়াই মাসের মতো আবার তার গাড়ী চালাইলাম। এর মধ্যে শালা চইলা আসার পর আমি আবার ক্যাব চালাইতে শুরু করলাম। আছি এখন শালা দুলাভাই এক লগে।” দারুণ বুদ্ধি করছিলেন তো আপনে। কফিলরেও তো ভালই মনে হইল। এখন একটু বলেন তো এইখানে আমাগো দেশীদের নাম এতো খারাপ কী জন্য?
“আগেই তো কইছি স্যার। বুজচ্ছেনই তো আপনের মতো বাংলাদেশি কয়জন আছে এইখানে। আমি আগে হারায় থাকতাম, এখন থাকি বাথায়। ঐগুলিই রিয়াদের বাংলাদেশী, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানিগো এলাকা। যে কোনো একদিন খুব সকালে ঐখানে আইসা যদি রাস্তায় খাড়ান, তবে দেখবেন লাইন ধইরা ইন্ডিয়ানরা, পাকিস্তানিরা, ইস্ত্রি করা সার্ট পেন্ট কোট পইরা কান্ধে কম্পিউটার ঝুলাইয়া, অফিসে যাইতেছে যখন তখন আমাগো দেশিরা ময়লা জামাকাপড় পইরা গামছার ভিতর টিফিন ক্যারিয়ার বাইন্দা ঐটা হাতে লইয়া বলদিয়ার নইলে কোম্পানির গাড়িতে উঠনের লাইজ্ঞা খারাইয়া আছে। সব তো কিলিনার স্যার।” বলদিয়া? এইটা কী? “আরে স্যার আমাগো দেশেও তো আছে। শহরের ময়লা টানার গাড়ী আছে না। ঐ গাড়ী যেই অফিসের, সেইটা? ওহ মিউনিসিপ্যালিটি, মানে পৌরসভা। হ স্যার, ঠিক কইছেন। এখানে এরা ওইটারে বলদিয়া কয়। ক্লিনারের কাজ করে দেইখাই নাম খারাপ হইল? তবে সবাইতো ক্লিনার না। আপনে আর আপনার শালার মতো গাড়িও তো চালায় অনেকে। ‘ঠিক। তয় এইখানেও একটা গোমর আছে। সৌদিতে সবচেয়ে বেশি আকাম কুকাম করে ধরেন, এক নম্বরে পাকিস্তানিরা, দুই মার্সিরা, তারপর ধরেন আসে বাঙালি আর ইন্ডিয়ানরা। ব্যাপার হইলো বাঙালি ধরা পড়লেই খবরের কাগজে দেশের নাম দিয়া দেয়। বাকীগো আকাম কুকামের কথা কিন্তু দেশের নাম ধইরা আসে না। আপনে নিজে একটু চেক কইরা দেইখেন খবরের কাগজে।” তা নাইলে দেখলাম। কিন্তু খবরের কাগজের সাথে বাংলাদেশের কী এমন শত্রুতা যে তারা ঐটা করে?
“আগেই তো কইলাম, পাকিস্তানি আর ইন্ডিয়ানরা কমপিউটার জানে। তারাই তো চালায় এখানকার খবরের কাগজ। হেরাই ঐটা করে। বাংলাদেশি হইলে সোজা দেশের নাম দিয়া দেয় আর কী! তয় স্যার কিছু কিছু দেশি পোলাপান সিডি বেচতে গিয়াও ধরা খায় পুলিশের কাছে, এইটাও ঠিক। আরে কম্পিউটারে এক্সপার্ট বইলা সিডিগুলিও তো বাইর করে ঐ ইন্ডিয়ান আর পাকিস্তানিরাই। হেরা কিন্তু ঐগুলি নিজেরা না বেইচা, বেচায় আমাগো পোলাপানগরে দিয়া। তো বেচতে গিয়া ধরাও পড়ে বাঙালিরাই ”। সিডি বেচায় সমস্যা কী?
কেমনে যে কই আপনেরে, বুঝেন না খারাপ সিডি আর কী। সৌদিগো কাছে খুব ডিমান্ড ওইগুলির। আপনেরে যেখান থেইক্কা তুললাম ওইখানের সামনে একটা রাস্তা আছে; সৌদিরা ওইটারে শয়তানের রাস্তা কয়। আবার তারাই গিয়া ওইখানের ফুটপাতে থাইক্কা ঐগুলি কিনে আমাগো দেশি পোলাপাইনগো মতন। আইচ্ছা স্যার এইখানেই কি নামবেন?
এসময় ইশারা ইঙ্গিতে বলা ঐ সিডির ব্যাপারটা আঁচ করতে পারার সাথে টের পাই চলে এসেছে গাড়ি আমার কমপাউন্ডের প্রথম স্তরের নিরাপত্তা তল্লাশির গেইটে। এইরকম সুটেড বুটেড না থাকলে হেঁটেই চলে যেতাম। কিন্তু এই পোশাকে অতোটা হাঁটা পোষাবে না। বললাম তাই যেতে হবে ভেতরে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক