দেশ হতে দেশান্তরে

সেলিম সোলায়মান | রবিবার , ৩০ এপ্রিল, ২০২৩ at ৭:০১ পূর্বাহ্ণ

হোক না পেঁয়াজ চাকা, মানে অনিয়ন রিং যতোই সোজা সাপটা খাবার, নাহ খাবার না বলে স্ন্যাকস ই বলা উচিৎ ওইটিকে। ঠিক আছে খাবার বা স্ন্যাক্স যে নামেই ডাকা হোক না কেন গন্তব্য তো তার একই মানে উদর, সেটির অর্ডার অতো সহজে চায়নিজ কিশোরকে বোঝাতে পারার সফলতায় হৃষ্টচিত্তে দীপ্র চেয়ারে বসতে বসতে অভ্রকে কি যেন একটা বলল চোখে চোখে। প্রমাদ গুনলাম এই ভেবে যে, এই না শুরু হল ফের দুই ভাইয়ের ইংরেজিতে যাকে বলে সিব্লিং রাইভালারি মানে সহদোরিয় ঝগড়া ফ্যাসাদ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা খুনসুটি !

কিন্তু না তেমন কিছু হল না। মনে হল দুজনের চোখে চোখে এরই মধ্যে যে কথা হয়ে গেছে, তা নিশ্চয়ই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক কিছু নয়। বরং পারস্পরিক সহযোগিতামূলক কোন ভাবই বিনিময় করেছে দুজনে। কারণ দুজনেরই চেহারায় দেখা যাচ্ছে হালকা খুশির ঝলক, যা নাকি আবার এরই মধ্যে জারিত হয়েছে দেখছি, তাদের ফুপ্পির মধ্যেও। ফলে সহাস্য তিনজনের চোখমুখের ইশারাবার্তায় আরো কিছু ভাববিনিময় হলো এরই মধ্যে। পরিষ্কার বোজা গেল যে, কোন একটা কিছুর ব্যাপারে, এই তিনজনের ত্রিপক্ষীয় কোন সমঝোতাচুক্তি হয়েছে, যার কোন কিছুই টের পাইনি আমরা বাকি দুজন। ভাবলাম, আরে এতো দেখছি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রও না? এক্কেবারে যাকে বলে টেবিল ষড়যন্ত্র! কিন্তু সে ব্যাপারটি যে কি? তার কোন কূলকিনারা না করতে পেরে, এবং এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না মনে হওয়াতে এ ব্যাপারে তাদেরকে আর না ঘাটিয়ে, ঐ যে বলেছিলাম রাক্ষুসে হা করতে হয় বার্গার খেতে, তাই করলাম নিজের সামনের বার্গারটিকে উদরে পাচার করার নিমিত্তে।

একমনে বার্গার চিবুতে চিবুতে এসময় ঐ লিফলেটটা, মানে যেটিতে লেখা আছে যে এখান থেকে কিছুটা দূরে গেলেই পাওয়া যেত মহাপ্রাচীরের পাহাড়ে উঠার জন্য কেবলকার, কেবল চেয়ার এসব; সেটি চোখে পড়তেই, ফের মনে হলো, আহা কি ভুলটা যে করলাম! আসলে অচেনা জায়গায় ভ্রমণ করে গেলে আগেভাগে একটু খোঁজ খবর নিয়ে যাওয়াই ভাল। ঐ রকম খোঁজ খবর না নিয়ে আসাতে এই যে সময়ের চাপে পড়ে গেলাম, তা থেকে বাঁচা যেত যদি নিতাম এখানকার খবরাখবর। আজকাল এসব খবর তো আছে যে কারোই আঙুলের ডগায়। অবশ্য যদিও চায়নায় এসে দেখছি, এখানে নাই গুগল মামার অবাধ বিচরণ; তাই আর সব জায়গায় আঙুলের ডগায় খবর থাকলেও এখানে তা প্রযোজ্য নয়। এক্ষেত্রে দরকার ছিল অবশ্য ঢাকা থেকে রওয়ানা দেয়ার আগেই আরেকটু ভাল করে খোঁজ নিয়ে আসা।

আরে দূর, কি দরকার অতো খোঁজ খবর নিয়ে আসার? তা করলে কি আর নতুন কিম্বা অচেনা জায়গায় এসে নতুন কিছু দেখার মজাটা থাকতো? বুঝলামতো এতো বছর ধরে বিদেশী কর্পোরেটে চাকরি করতে করতে, পা ফেলার আগে সব কিছু দেখে, শুনে, বুঝে নানা কিছু এনালাইসিস মানে বিশ্লেষণ করে, সবকিছু অবহিত অবগত হয়ে তাতে প্রেডিকশনের সংশ্লেষ ঘটিয়ে কাজ করাই তোমার শিরায় ধমনিতে সর্বক্ষণ বইতে থাকা রক্তে ঢুকে গেছে, তাতে হয়েছেটা কী ? রেখে দাও ঐসব দাপ্তরিক হিসাব, দাপ্তরিক কাজের জন্য। শোন, আসছো এখানে এখন বউ বাচ্চা নিয়ে ঘুরতে। এর ভেতর আর কর্পোরেট কর্ম পরিকল্পনা একশন প্লান জাতীয় কিছু আর ঢুকাইয়ো না। থাকুক না জীবন জীবনের মতো, অনেক অনিশ্চয়তা, ভুল এসব নিয়ে। কি হবে আর তাতে। মনের দ্বিতীয়জন এসময় এরকম একটা লম্বা লেকচার ঝাড়তেই, দুই পুত্রের ঐ সিব্লিং রাইভালরির মতো নিজমনের দুই সত্তার ঐ সার্বক্ষণিক মাইন্ড রাইভালরি মানে মন দ্বন্দ্ব শুরু হবার উপক্রম হতেই– “ভাইয়া, ভাইয়া ঐ যে, অনিয়ন রিংস রেডি হয়ে গেছে আমাদের’ বলেই অভ্র এসময় চেয়ার ছেড়ে উঠে দ্রুত ঐদিকে রওয়ানা করতেই থেমে গেল সেই মন দ্বন্দ্ব। এদিকে এরই মধ্যে অভ্রর অনুগামী হয়ে দীপ্রও কাউন্টার অভিমুখে দেবার রওয়ানা দেবার উপক্রম করতেই, থামালাম ওকে। বললাম থাক, ওকেই আনতে দাও। একটাই তো ট্রে। এছাড়া তেমন ওজনদারও না ঐ অনিয়ন রিং ভর্তি ট্রের ।

যে রকম দ্রুততায় অভ্র এগিয়েছিল কাউন্টারের দিকে প্রায় একই গতিতে চার প্যাকেট অনিয়ন রিংসমেত ট্রে নিয়ে ফিরতি হাঁটা দিয়ে ট্রে টিকে নিয়ে এসে টেবিলস্থ করতেই, ওখান থেকে একটা প্যাকেট তূলে নিয়ে একটা অনিয়ন রিং মুখে পুরে, কাগুজে কোমল পানিয়ের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে, সকলের ট্রে দিকে দ্রুত নজর ফেলতেই দেখলাম, দুই পুত্রেরই ভোমা সাইজের সেই ডাবল ঊফার বার্গারের এক তৃতীয়াংশ রয়ে গেছে এখনো ট্রে তে। এমনকি হেলেনের ট্রে তে তার নরমাল সাইজের বার্গারও রয়ে গেছে একই পরিমাণ। মনে মনে ফের পড়ে গেলাম এতে সময়ের চাপে। এরই মধ্যে তো আমার আর লাজুর তো খাওয়া শেষ। এখন ওদের ঐ বার্গারগুলোও খাওয়া শেষ হয়ে যেতো যদি, তবে এক্ষুণি রওয়ানা করা যেত গাড়ির দিকে। অনিয়ন রিঙয়ের প্যাকেট হাতে করে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসেই খাওয়া যেত, এ কথা মনে হতেই ঘোষণা দিলাম এই তোমরা সবাই তাড়াতাড়ি বার্গার শেষ করে নাও। অনিয়ন রিং আমরা গাড়িতে বসেই তো খেতে পারবো।

আচ্ছা, আচ্ছা। ঠিক আছে চল তাহলে” বলেই সাথে সাথেই হেলেন তার নিজের বার্গারের অবশিষ্টাংশের সাথে ভাইপোদের ট্রে তে থাকা অবশিষ্টাংশ এক করে, ট্রেতে বিছানো থাকা বার্গার কিং এর বিজ্ঞাপনের কাগজটিতে দ্রুত সেগুলো মুড়ে নিতেই, ওর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ফেলতেই

কাঁচুমাচু ভঙ্গির হাসি হেসে বলল ও, “না মানে ওরা আর আমি বার্গার খাবো না আর। এখন এই অনিয়ন রিং খেলেই পেট ভরে যাবে আমাদের। তাই এই বার্গারগুলো ঐ কুকুর গুলোর জন্য নিয়ে যাবো।“

এতোক্ষণে হৃদয়ঙ্গম করা গেল দুই ভাইপো ও এক ফুপ্পির, মানে এই ত্রয়ীর সেই টেবিল ষড়যন্ত্রের মাজেজা! ঘটনা হচ্ছে, সকালে পার্কিং লটে গাড়ী থেকে নামতেই, যে দুই নেড়ি কুকুর, না ঠিক আমাদের দেশের মতো নেড়ি ছিল না ওরা, এমনকি চায়নিজও না বরং বিলাতি বিলাতি ভাব ছিল ঐ কুকুর দুটোতে; ঐ দুটো যে আমাদের সাদরে বরণ করার জন্য এগিয়ে গিয়েছিল জিভ বের করে কুই কুই আওয়াজ করে লেজ নাড়তে নাড়তে; তারই পুরস্কার হিসাবে তাদের জন্য এই লাঞ্চ প্লান করেছিল ওরা তিনজন কোনোএক সময়ে। যার কারণেই ঐ অনিয়ন রিং এর অর্ডার দেয়ার আব্দার এসেছিল তিনজনের মুখপাত্র হিসাবে দীপ্রর কাছ থেকে।

কি আর বলা যায় এ নিয়ে? খারাপ তো কিছু করেনি ওরা। মানুষের মতো ঐ মালিকহীন কুকুরগুলোরও তো ক্ষুধা লাগে! তদুপরি আর কারো না হলেও, অভ্রর মনে নিশ্চয় সর্বক্ষণই কুই কুই করে লাফ ঝাপ মারছে, ঢাকায় ফেলে আসা তার প্রিয় কুকুরের বাচ্চা প্লুটোকে। ফলে এ ব্যাপারে কোন দ্বিরুক্তি না করে, ঠিক আছে চল তাহলে উঠি আমরা বলে নিজের এঁটো খাবার তো না এঁটো কাগজ আর টমেটো কেচাপের খালি প্যাকেট ধারণ করা এঁটো ট্রে টা তার স্বস্থানে রাখার জন্য উঠে যেতেই, বাকীরা অনুসরণ ও অনুগমন করলো আমার ।

আচ্ছা , তোমাদের কারো কি ফের টয়লেটে যাওয়ার দরকার আছে? যদি থাকে তবে তা সেরে নাও দ্রুত। এঁটো ট্রে টির সদ্গতি করে, সবার উদ্দেশে এ কথা বলে নিজেই রওয়ানা করলাম ঐদিকে, কারণ যে কোন যাত্রায় গাড়ি বা যে কোন বাহনেই উঠার আগেই বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে ঐদিকে একটু হয়ে আসাই যে বহুকালের অভ্যাস আমার।

টয়লেটে ঢুকেই বাঙ্গাল অভ্যাসের কারণে, যতোই হাতে কিছু না লেগে থাকুক, তাও হাত ধুতে ধুতে বুঝলাম, নাহ ডিজিটাল ও ফাস্টফুড প্রজন্মের প্রতিনিধি পুত্রদের , এমনকি ফাস্ট ফুডও খাওয়া শেষে আমার মতো অকারন হাত ধোয়ার বাতিক হয়নি মনে হচ্ছে। কারণ আসেনি ওরা।

প্রাকৃতিককর্মের ঘর থেকে বেরিয়ে, কাউন্টার পেরিয়ে এই আউটলেট থেকে বের হওয়ার দরজার কাছে পুত্রদের অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতে দেখে আবারো নিশ্চিত হলাম যে, খাদ্যাভাসের মতোই খাওয়া পরবর্তী আচার আচারন বিষয়েও আমাদের পাঁচজনের মধ্যে আছে পরিষ্কার দুটো ভাগ। যার এক দিকে আছি প্রাপ্তবয়স্ক তিনজন অন্যদিকে বালক পুত্ররা । মাঝখানে আছে, ঐ যে বলেছিলাম আগেও, যাকে বলে জেনারেশন গ্যাপ, তা। আমরা বড়রা যা কিছুই খাই না কেন, আর সে খাদ্য হাতে লাগুক আর না লাগুক, খাওয়া শেষে হাত ধোয়ার প্রয়োজনিয়তা অনুভব করি। কারণ ছোটবেলা থেকেই আমার যা খেয়ে বড় হয়েছি, তাতে খাওয়ার আগে তো অবশ্যই এমনকি পরেও হাত ধোয়ার আবশ্যকতা থেকে যেত। যার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না আমাদেরই পুত্ররা, এই ফাস্ট ফুড মানে ত্বরা খাবারের কারিশমায়।

ইতোমধ্যে হেলেন আর লাজু ফিরে আসতেই, বেরিয়ে পড়লাম সবাই প্রাকৃতিক পরিবেশে চমৎকার পশ্চিমা ডিজাইনে করা মুতিয়ানু গ্রাম সংলগ্ন মহাপ্রাচীর চত্বরের বার্গার কিংয়ের কাচ ঘর থেকে। লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণ সাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষার্থীরা আজ বড় অসহায়
পরবর্তী নিবন্ধগৃহকর বৃদ্ধি : সাধারণ মানুষের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, মানবিক দৃষ্টিতে পুনর্বিবেচনা করুন