দেশ ও জাতি দুটি ভিন্ন শব্দ হলেও উদ্দেশ্য ও ব্যবহারগত এক ও অভি ন্ন। দেশের সেবা মানে জাতির সেবা, জাতির সেবা মানে দেশের সেবা। জাতির উন্নতিতেই দেশের উন্নতি। দেশ নিরাপদ তো জাতি নিরাপদ। ‘দেশ-জাতির সেবা’ আকারে ছোট হলেও অর্থগত পরিধি ব্যাপক। সুশিক্ষা দান, সুনাগরিক গঠন, সৎপথ প্রদর্শন, সৎ ও যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের সমর্থন প্রদান, সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে আপন দায়িত্ব পালন, পরস্পর সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহার, অভাবীদের প্রতি সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ, নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানো, অত্যাচারীদের প্রতিহত করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানো, সত্য কথা বলা, সত্যের সমর্থন করা এবং জনকল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতা প্রদান সহ আরো বহু শাখা প্রশাখা।
প্রত্যেক ভালো কাজের অবশ্যই ভাল প্রতিদান রয়েছে। তবে সে সমস্ত ভাল কাজের পরিধি নিজকে অতিক্রম করে দেশ ও জাতির মধ্যেও বিস্তৃতি লাভ করে তার পরিনামও সূদুর প্রসারী। মরেও যেমন অমরত্ব লাভ করে, তেমনি মৃত্যুর পরেও পূণ্য অর্জন হতে থাকে। একদিকে দেশ তার নাম স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করবে , অন্যদিকে জাতির হৃদয়ে তার প্রতি ভালবাসার যে ভাস্কর্য স্থাপিত হবে তা কালের বিবর্তনে ভেঙ্গেও যাবেনা, মুছেও যাবেনা বরং হৃদয় থেকে হৃদয়ে থাকবে চিরকাল।
ঐশী গ্রন্থ পবিত্র কুরআন করিম ও হাদিসে রাসূলে দ. দেশ ও জাতির সেবার বিষয়ে এতবেশি গুরুত্ব ও পূণ্যের আলোচনা হয়েছে তা তুলনামূলক অনেক বেশি। স্রষ্টার ভাষায় সৃষ্টির সেবা তাঁরই সেবা। একালে সৃষ্টির ছোট খাটো সমস্যা দূরকারীর বড় বড় সমস্যা পরকালে স্রষ্টা নিজেই দূর করবেন। স্রষ্টাকে খুব সহজে পাওয়া যায় সৃষ্টির সেবায়। নবীজীর পুরা জীবনটায় দেশ জাতির সেবায়।
দেশ ও জাতির সেবায় অনন্য আধ্যাত্বিক মহাসাধক সুলতানুল আরেফিন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী র. ৭৪৫ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান ইরানের বোস্তাম শহরে জন্মগ্রহণের পর থেকে ৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ১৩০ বছরের দীর্ঘ হায়াতের সিংহভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন জ্ঞান পিপাসুদরকে দৃশ্য অদৃশ্য জ্ঞান বিতরণ, পথহারা মানুষদেরকে সত্যপথের দিশা প্রদান, অসহায় ও দুঃস্থ মানুষের দুঃখ-দূদর্শা দুরীকরণ, দেশ-জাতির সেবায় আত্মনিয়োগসহ এ জাতীয় অসংখ্য মহৎ ও গুরত্বপূর্ণ কাজে। বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এ জাতীয় প্রবন্ধে একেবারে অসম্ভব। সংক্ষিপ্ত আকারে সামান্য চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। হযরত বায়েজিদ বোস্তামী র. বলেন, জাহান্নামীদের পরিবর্তে আমাকে জাহান্নামে দেয়া হলে আমি তা আনন্দচিত্তে গ্রহণ করবো। আমাকে যদি সুপারিশ করার ক্ষমতা দেয়া হয়, প্রথমে আমাকে যারা কষ্ট দিয়েছে তাদেরকে করবো, এরপর যারা আমার উপকার করেছে তাদেরকে।
এক সুশ্রী পতিতার রূপ-লাবণ্যে আৃকষ্ট হয়ে বোস্তামের যুবকগণ টাকার বিনিময়ে নিয়মিত তার সাথে কু-কর্মে লিপ্ত হতে থাকে। ধর্মভীরু প্রবীণ লোকগণ অনেক চেষ্টা করেও তাদের সংখ্যাগরিষ্টের কারণে প্রতিরোধ সম্ভব হয়নি। একদিন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী র. সন্ধ্যার পূর্বে পতিতার নিকট একরাতের সম্পূর্ণ টাকা এই শর্তে দিলেন, আজ রাত পতিতা শুধু তাঁর এবং তাঁর কথাই শুনতে হবে তাকে। নির্দেশ মতে পতিতা গোসল করে জায়নামাজে দু’রাকাত নামাজ আদায় করলেন। এরপর হযরত বায়েজিদ বোস্তামী র. আল্লাহর দরবারে দু’হাত উঠায়ে দোয়া করলেন, আমার দায়িত্ব ছিলো তাকে তোমার দুয়ারে নিয়ে আসা, এখন তুমি তাকে পরিবর্তন করে দাও। পতিতা শুধু নিজে পরিবর্তন হয়নি বরং তার কাছে আসা যুবকদেরও হযরত বায়েজিদ বোস্তামী র.’র সান্নিধ্যে এনে পরিবর্তনের ব্যবস্থা করলেন।
এক নিতান্ত গরীব ইহুদী পরিবার বোস্তামে বসবাস করতো। তারা প্রায় অনাহারে দিন অতিবাহিত করতো। হযরত বায়েজিদ বোস্তামী র. জানার পর নিয়মিত তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন। তাঁর এই চরিত্রে মুদ্ধ হয়ে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
হযরত বায়েজিদ বোস্তামী র. নফল হজে¦র উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। এক গরীব অসহতায় পরিবারের স্বাক্ষাত হলো, যাদের দিন-রাত দুঃখ-কষ্টে ও অনাহারে যায়। তারা বললো, আপনার হজে¦র টাকাসমূহ দয়া করে আমাদেরকে দিয়ে দেন। আমরা খুবই অভাবের মধ্যে আছি। আল্লাহ আপনাকে হজে¦র সওয়াব দান করবেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে হজের টাকা দু’শ দিনার তাদের দিয়ে দিলেন।
হযরত বায়েজিদ বোস্তামী র.’র দরবারে প্রতিদিন অসহায় নির্যাতিত মানুষের ভীড় লেগে থাকতো। তিনি সকলের কথা মনযোগ দিয়ে শুনতেন এবং সমস্যা সমাধান করতেন। কখনো বিরক্তিবোধ করতেন না।
দেশের সীমানা পাহারা দেয়া, যাতে বহি:শত্রু প্রবেশ করে দেশ ও জাতির ক্ষতি সাধন করতে না পারে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে অতি সওয়াব ও পূণ্যের কাজ এবং স্রষ্টার নির্দেশ। একদিন একরাত সীমান্ত পাহারা দেয়া একমাস দিনের বেলায় রোজা রেখে রাত্র বেলায় এবাদত করা এবং পার্থিব জগতের যাবতীয় ধনসম্পদের চেয়েও উত্তম। হযরত বায়েজিদ বোস্তামী র.’র জীবনীতে দেখা যাচ্ছে, তিনি অনেক সময় রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সীমানার প্রাচীরের উপর উঠে এবাদতরত অবস্থায় সীমান্ত পাহারা দিয়েছেন। একদিকে এবাদত, অন্যদিকে রাষ্ট্র ও জনকল্যাণ মূলক কাজে সীমান্ত পাহারা দেয়া হাদিসের ভাষ্য মতে দু’টি চক্ষুকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারবেনা, যে চুক্ষুদ্বয় আল্লাহর ভয়ে পানি প্রবাহিত করেছে এবং জাগ্রত থেকে দেশের সীমান্ত পাহারা দিয়েছে। পথহারা মানুষদের সঠিক পথের দিশা দানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে তিনি অতীব কষ্টসাধ্য ভ্রমণ করেছেন এবং অগণিত মানুষের হৃদয়ে হেদায়তের মশাল জ¦ালিয়েছেন। ৩১ জানুয়ারি শনিবার এ মহান আধ্যাত্মিক সাধকের পবিত্র বার্ষিক ওরস শরীফ চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার নাসিরাবাদে অবস্থিত হযরত বায়েজিদ বোস্তামী র. দরগাহ শরীফে সম্পূর্ণ শরীয়ত সম্মত পন্থায় অনুষ্ঠিত হবে। আল্লাহ তায়ালা এই মহান মনীষীর জীবনাদর্শে আমাদের জীবন সাজানোর তৌফিক দান করুক, আমিন।
মাওলানা সৈয়্যদ মুহাম্মদ আজিজুর রহমান
আরবি প্রভাষক, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া, চট্টগ্রাম।












