পৃথিবীতে আমরা যত দেশ দেখতে পাই অর্থাৎ যেসব দেশগুলো আজ উন্নতির সর্ব শিখরে অবস্থান করছে সেসব দেশ কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো সেই দেশের মানুষ। অর্থাৎ তারা সব সময় চেষ্টা করেছে যে তাদের দেশকে কী করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। যারা প্রকৃত দেশপ্রেমী তারা কখনো দেশের ক্ষতি চায় না। তারা সবসময় চায় নিজের দেশের কী করে উন্নতি করা যায় এবং দেশের মানুষের সাহায্য করা যায়। এই দেশপ্রেমী লোকেদেরকে সবাই খুব ভালোবাসে। আমাদের দেশে বিভিন্ন রকম দেশপ্রেমী ছিলেন যারা কিনা দেশের জন্য সব সময় কাজ করেছেন এবং দেশকে সবসময় উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আর এসব ব্যক্তিদের কথা এখনো আমরা ভুলতে পারি না।
দেশপ্রেম হলো নিজের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি ও প্রকাশ এবং সেই ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়া মানুষদের সঙ্গে ঐক্যের অনুভূতি। ভালোবাসার পাশাপাশি দেশপ্রেম হলো মাতৃভূমির প্রতি গর্ব, ভক্তি, ও সংযুক্তির অনুভূতি এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক নাগরিকদের প্রতিও সংযুক্তির অনুভূতি। এই সংযুক্তির অনুভূতি আরও গভীর হতে পারে জাতি বা জাতিগত পরিচয়, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, বা ইতিহাসের মতো উপাদানগুলোর মাধ্যমে। দেশের প্রত্যেক মানুষের মধ্যে এই দেশপ্রেম থাকা বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় দেশ পিছিয়ে পড়ে, ব্যাহত হয় দেশের অগ্রগতি। স্বাধীন সার্বভৌম প্রিয় মাতৃভূমি অনেক জনের আত্মত্যাগের ফসল। মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, তারকেশ্বর দস্তিদার, ইলা মিত্র, কাজেম আলী, আব্দুল বারী চৌধুরী, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, অম্বিকা চক্রবর্তী, আবু তাহের, কল্পনা দত্ত, লোকনাথ বল, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, দীনেশ–বাদল–বিনয়সহ অসংখ্য বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগ এবং তাঁদেরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীদের আন্দোলন সংগ্রামের ফসল এই প্রিয় মাতৃভূমি। বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে। ৭১–এ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী নানা আন্দোলন–সংগ্রামে অগণিত শহীদের ত্যাগ আর অসংখ্য মা–বোনের অশ্রুর বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই ভূখণ্ড। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে এসেছি। অথচ আজ প্রশ্ন জাগে আমরা কি সত্যিই দেশপ্রেমিক জাতি হয়ে উঠতে পেরেছি?
প্রকৃত দেশপ্রেম মানে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেওয়া নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজেই দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায়। ট্রাফিক আইন মেনে চলা, কর দেওয়া, মানসম্মত পণ্য তৈরি করা, সৎভাবে দায়িত্ব পালন করা–এসবই দেশপ্রেম। শিক্ষক যদি আন্তরিকভাবে পড়ান, ব্যবসায়ী যদি ন্যায্য মান বজায় রাখেন, রাজনীতিবিদ যদি সত্যিই জনগণের স্বার্থে কাজ করেন–তাহলেই দেশপ্রেম বাস্তব রূপ পাবে।
আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন আত্মসমালোচনা। আমরা কি সত্যিই দেশের জন্য কিছু করতে প্রস্তুত, নাকি কেবল নিজেদের স্বার্থেই সব আয়োজন? নিজের ভেতরের সেই নিছক নিজপ্রেমিক মানুষটাকে নিয়ন্ত্রণ করে দেশপ্রেমিক মানুষটাকে জাগিয়ে তুলতে না পারলে উন্নয়ন হবে খণ্ডিত, টেকসই হবে না। শিক্ষা, শিক্ষক এবং শিক্ষালয়গুলোই এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। শিক্ষা যদি শিশুকিশোর, তরুণদের শেখাতে পারে–দেশের স্বার্থই আসল স্বার্থ, কেবল নিজের নয়, অন্যের কল্যাণও জরুরি–তাহলেই পরিবর্তন সম্ভব। একেকজন নাগরিক যদি ছোট ছোট দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে, তাহলে সমষ্টিগতভাবে দেশ এগোবে অনেক দূর। তাই, আজ আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো–নিজস্বতার গণ্ডি ভেঙে দেশকে বড় করে ভাবা। দেশপ্রেম কোনো অলঙ্কার নয়, এটি একটি দায়বদ্ধতা। যদি আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি, তবে আমাদের দেশকে সত্যিই একটি আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।












