পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৮ কোটির মতো। ছোট্ট একটি দেশে এত মানুষ, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ দেশের মধ্যে অন্যতম। এ প্রেক্ষাপটে জনসংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়; এটি উন্নয়ন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। গত ২ মার্চ পালিত হলো এফপিএবি দিবস। এই দিবসটিকে একটি আত্মমূল্যায়নের দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকে। তাঁরা বলেন, যেখানে অতীতের অগ্রগতি পর্যালোচনা, বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত করণীয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জনসংখ্যা বাংলাদেশের একটি জটিল ও প্রধান সমস্যা কিন্তু জাতীয় পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে সেভাবে বিষয়টি আলোচিত ও গুরুত্ব পাচ্ছে না। বিশেষ করে বিগত ১৫–২০ বছরে এক্ষেত্রে যথেষ্ট পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। এখন সময় জনসংখ্যা এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে সার্বিক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, বাজেট বরাদ্দ ও প্রাসঙ্গিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার। পরিবার পরিকল্পনা দ্রব্যাদির সরবরাহ সংকট এ মুহূর্তে চরমে, সেদিকে দ্রুত দৃষ্টি দিয়ে কেনাকাটার ব্যবস্থা ও সারা দেশে সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার।
পৃথিবীতে অসংখ্য দেশ রয়েছে, যেগুলো আয়তনে বিশাল হলেও জনসংখ্যায় আমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের যুবদের সংখ্যাও ইউরোপের অনেক উন্নত রাষ্ট্রের চেয়ে ঢের বেশি। অথচ মাথাপিছু আয়, সেবার মান প্রভৃতিতে বাংলাদেশের চেয়ে তারা অনেক এগিয়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে দুর্বলতা কোথায়। মূলত তারুণ্যনির্ভর জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত এবং প্রশিক্ষণের অভাবকে। আজকের এ বিশাল কর্মক্ষম ও উদ্যমী তরুণ জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করার এখনই সময়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যাকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রেখে বিদ্যমান সম্পদের পরিবেশবান্ধব ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। জনসংখ্যাকে পরিণত করতে হবে জনসম্পদে। টেকসই উন্নয়নে পরিকল্পিত ও দক্ষ জনসংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। পরিকল্পিত ও পরিমিত জনসংখ্যা যেকোনো দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের আয়তন, অবস্থান, জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ, আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় পরিকল্পিত পরিবার গঠনের বিকল্প নেই। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশে জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। জাতীয় উন্নয়নে নারীদের অধিক হারে সম্পৃক্ত করতে হবে। এ ছাড়া জেন্ডার সমতা অর্থাৎ নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিতে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলেন, ‘বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বৃদ্ধি এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবুও গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে জরুরি প্রসূতিসেবা সমপ্রসারণ অপরিহার্য। অল্প বয়সে বিবাহ ও মাতৃত্ব মেয়েদের শিক্ষা ব্যাহত করে এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়। ফলে কিশোর–কিশোরীদের জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা, জীবনদক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক আচরণ পরিবর্তনমূলক কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সমপ্রসারণ জনসংখ্যা স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ১৫–২৪ বছর বয়সী তরুণ–তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। ফলে যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ও প্রজনন স্বাস্থ্য–শিক্ষা সমপ্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনমিতিক সুবিধা বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ নিতে আমরা এর মধ্যেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। আগামী বাজেটে এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট চিন্তা রাখা দরকার। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি ইত্যাদি বিবিধ কারণে দ্রুত নগরায়ণের প্রভাবে নগর এলাকায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেবার অপ্রাপ্যতা বাড়ছে। নগর বস্তিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করা দরকার।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কমছে না। কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষায় যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের চাকরির বাজারে ভালো চাহিদা আছে। কিন্তু চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনবল সরবরাহে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকারগণ ব্যর্থতা ও হতাশায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক সময় চেষ্টা ও সংগ্রামে বিফল হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজে আত্মনিয়োগ করছে, যা কেবল তার নিজের বা পরিবারের জন্য নয়, গোটা সমাজের জন্য হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর। এমতাবস্থায় করণীয় হচ্ছে, এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় বের করা।








