দৃঢ়তার জয় গান: বিবিসি হানড্রেড উইম্যান ২০২৪

সুমাইয়া বিনতে রশিদ | শনিবার , ৫ এপ্রিল, ২০২৫ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ

(শেষ পর্ব)

নারী অধিকার কর্মী ফাওজিয়া আলওতাইবি, সৌদি আরব/যুক্তরাজ্য

ফাওজিয়া আলওতাইবি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে পুরুষ অভিভাবকত্ব ব্যবস্থার অবসানের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে ডেকে নেওয়ার পর তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তার বোন মানাহেল আলওতাইবিও একজন নারী অধিকার কর্মী যিনি গত বছর গ্রেপ্তার হন এবং অনলাইনে প্রকাশিত মতামত এবং পোশাক সংক্রান্ত অভিযোগে ১১ বছরের কারাদন্ডে দণ্ডিত হন। আলওতাইবি তার বোনের মুক্তির জন্য নিরলস প্রচারণা চালিয়েছেন। সামপ্রতিক সময়ে, সৌদি আরবে মতামত প্রকাশের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করার কারণে অনেককেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এথলেট এলিসন ফেলিক্স যুক্তরাষ্ট্র

রেকর্ড কুড়িটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ পদক এবং এগারটি অলিম্পিক পদক সহ, এলিসন ফেলিক্স ট্র্যাক এন্ড ফিল্ড ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পদকপ্রাপ্ত এথলেট। প্রসবজনিত জটিলতা প্রিএক্লাম্পশিয়া হওয়া এবং প্রি ম্যাচিউরড সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তিনি মাতৃস্বাস্থ্যের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। এখন তিনি মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবাকে এগিয়ে নিতে ২০ মিলিয়ন ডলার অনুদান পেয়েছেন। কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবার প্রচারে তিনি ভূমিকা রাখছেন। অবসর নেয়া এ ক্রীড়াবিদ প্যারিস ২০২৪ গেমসে প্রথম অলিম্পিক ভিলেজ নার্সারির উদ্বোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এছাড়াও গত বছর, তিনি আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির এথলেটস কমিশনে যোগদানের জন্য নির্বাচিত হন এবং শুধুমাত্র নারীদের খেলাধুলার উপর জোর দিয়ে করে তার নিজস্ব ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা সংস্থা চালু করেন।

সুপারহিউম্যানস সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ওলগা রুদনিভা, ইউক্রেন

রাশিয়ার ইউক্রেনে আক্রমণের পর, ওলগা রুদনিভা অনুভব করেছিলেন যে তাকে এই সংঘর্ষে আহতদের সাহায্যার্থে কিছু করতে হবে। সেসময়, যুদ্ধে অঙ্গহানি হওয়াদের অনেককেই ভুক্তভোগী হিসেবে করুণার দৃষ্টিতে দেখত। কিন্তু রুদনিভার মতে তারা ‘সুপারহিউম্যান’ বা অতিমানব, যারা তার সর্বোচ্চ সহায়তা পাওয়ার যোগ্য। তিনি লাভিভে সুপারহিউম্যানস ট্রমা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। সিইও হিসেবে একটি বিশেষজ্ঞ দল সঙ্গে নিয়ে তিনি সেটা পরিচালনা করেন। এই সেন্টার রোগীদের জন্য প্রতিস্থাপন অঙ্গ সরবরাহ করে এবং সমপ্রতি একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু করেছে। প্রথম দুই বছরের মধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষ এই প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা পেয়েছে।

মনুমেন্টাল ওয়েলশ উইমেন’এর সহপ্রতিষ্ঠাতা হেলেন মলিনিউ, যুক্তরাজ্য

২০২১ সালের আগে, ওয়েলসএ ওই নামে উৎসর্গ করা মূর্তি স্থাপন করার চল ছিল না। এই বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ করে আইনজীবী হেলেন মলিনিউ ‘মনুমেন্টাল ওয়েলস উইমেন’ নামে একটি অলাভজনক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এর লক্ষ্য ছিল জনপরিসরে ওয়েলস অঞ্চলের নারীদের অবদান ও অর্জনকে উদযাপন করা। জনগণের ক্রস্তাবিত নামের ভিত্তিতে, মলিনিউ এবং তার দল মোট পাঁচটি মূর্তি স্থাপনের পরিকল্পনা করেন, যাতে এই নারীদের অবদানের গল্প হারিয়ে না যায়। এখন পর্যন্ত তারা চারটি মূর্তি স্থাপন করেছেন। প্রথমটি কার্ডিফে ওয়েলসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রধান শিক্ষিকা বেটি ক্যাম্পবেলের, এরপর মাউন্টেন অ্যাশএ ইলেইন মর্গান, ল্যাংগ্রানগএ ক্রানোগউয়েন এবং নিউপোর্টে লেডি রন্ডার মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

চলচ্চিত্র পরিচালক ক্লোয়ি ঝাও, যুক্তরাজ্য

অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখক ক্লোয়ি ঝাও প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী এবং ইতিহাসের মাত্র তিনজন নারীর একজনযিনি একাডেমির সেরা পরিচালকের পুরস্কার লাভ করেছেন। বেইজিংয়ে জন্মগ্রহণকারী ঝাও, প্রথমে যুক্তরাজ্য এবং পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হন। তিনি নিজেকে ‘যাযাবর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র নোম্যাডল্যান্ড (২০২০) ওই থিমের উপর ভিত্তি করে তৈরি। তার প্রথম দিককার চলচ্চিত্রে আদিবাসী সমপ্রদায়কে প্রতিনিধিত্ব করা থেকে শুরু করে মার্ভেল ইউনিভার্সের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় কাস্ট পরিচালনা পর্যন্ত, সবখানেই তিনি মানবিক বিষয়ে সংযোগের ব্যাপারে গভীরভাবে অনুভব করেন। এই বছর তিনি ম্যাগি ও’ফ্যারেলের শেঙপিয়ারযুগের উপন্যাস হ্যামনেটের রূপান্তরে চলচ্চিত্র পরিচালনা করছেন, যা ২০২৫ সালে মুক্তি পাবে।

খ্রিষ্টান নান ইউজেনিয়া বোনেত্তি, ইতালি

সিস্টার ইউজেনিয়া বোনেত্তি ১০০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেছেন এবং আফ্রিকার খ্রিষ্টান সন্ন্যাসিনীদের সঙ্গে একটি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা মানব পাচার এবং শোষণের শিকার অভিবাসী নারীদের সহায়তা দিয়ে থাকে। রোমে যৌনকাজে বাধ্য করা নারীদের সাহায্য করতে কাজ করে চলেছেন তিনি এবং ‘স্লেভস নো মোর’ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা মানব পাচার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে। তিনি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে কেনিয়ায় মিশনারি হিসেবে কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন দেশে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন যাতে তারা মানব পাচার প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিতে পারে। অবসর গ্রহণের আগে, পোপ ফ্রান্সিস তাকে ২০১৯ সালের ‘ওয়ে অফ দ্য ক্রস’ রচনার দায়িত্ব দেন, যা ক্যাথলিকদের জন্য গুড ফ্রাইডে উপলক্ষে রোমের কলোসিয়ামে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক অনুষ্ঠান।

সংগীতশিল্পী ও গীতিকার হাদিকা কিয়ানি, পাকিস্তান

পাকিস্তানের সঙ্গীত জগতের অন্যতম আইকন হাদিকা কিয়ানি তার কণ্ঠ এবং মানবিক কাজে অবদানের জন্য পরিচিত। নব্বইয়ের দশকে খ্যাতি অর্জনকারী কিয়ানি দক্ষিণ এশিয়ার নারী পপ সঙ্গীত জগতে একজন সুপরিচিত কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির শুভেচ্ছা দূত হিসেবেও কাজ করেন। পাকিস্তানের ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার পর, তিনি ‘ভাসিলারাহ’ প্রকল্প চালু করেন, যা বেলুচিস্তান এবং দক্ষিণ পাঞ্জাবে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য নিবেদিত। তিনি জনসাধারণকে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলিকে সহায়তার জন্য আহ্বান জানান এবং গত বছর প্রকল্পটি ঘোষণা করে যে তারা ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলে ৩৭০টি বাড়তি এবং অন্যান্য সুবিধা নির্মাণ করেছে।

টেবিল টেনিস খেলোয়াড় ঝিয়াং (তানিয়া) জেং, চিলি

চীনাচিলির টেবিল টেনিস খেলোয়াড় ঝিয়াং জেং উরফের তানিয়া, ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে ৫৮ বছর বয়সে অভিষেক ঘটান! ছোটবেলায় তার মা তার টিটি’র কোচ ছিলেন, এবং মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি চীনের জাতীয় টিমে সুযোগ পান, কিন্তু পরে চিলিতে অভিবাসী হয়ে যান এবং তিন দশকের খেলোয়াড় জীবন ছেড়ে ব্যবসায় মনোযোগ দেন। কোভিড১৯ মহামারী তাকে আবার টেবিল টেনিসের জগতে ফিরিয়ে আনে। ২০২৩ সালে, তিনি চিলির সেরা নারী টিটি খেলোয়াড় নির্বাচিত হন এবং দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ ও প্যান আমেরিকান গেমসে চিলির প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০২৪ সালের অলিম্পিকে খেলে তিনি তার ‘‘আজীবনের স্বপ্ন’’ পূরণ করেন।

সাংবাদিক হিন্দা আবদি মোহাম্মদ, সোমালিয়া

ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহী হিন্দা তার নিজের শহর সোমালিয়ার হারগেইযায় বসে সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা লোকজনের গল্প ডায়েরিতে লিখতেন। এখন তিনি বিলানএর প্রধান সম্পাদক, যেটি সোমালিয়য়ার প্রথম এবং একমাত্র নারী সাংবাদিকদের দল। এই দলটি কর্মক্ষেত্রে সোমালি নারীদের লিঙ্গবৈষম্য ও হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই করতে কাজ করে যাচ্ছে। বিলানএর লক্ষ্য হল সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশের একটিতে সামাজিক সমস্যাগুলির উপর আলোকপাত করা। এইচআইভি’র মরণ ছোঁয়ায় আক্রান্ত সোমালি মানুষ, নির্যাতিত অনাথ শিশুকিশোর এবং সংসার পরিত্যক্ত মানুষদের গল্প প্রকাশ করে থাকে এই নারী সাংবাদিক দলটি ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতারেক রহমানের ৩১ দফা বেঁচে থাকার দফা
পরবর্তী নিবন্ধনারী বিষয়ক সংস্কার: বাস্তবায়ন এবং আশঙ্কা