ঘুরে দাঁড়ানো ও মুক্তি কোথায়?
আমি জন্মেছিলাম পূর্ব পাকিস্তানে। পাকিস্তান বলতে এখন যা বুঝি বা একাত্তরে যা দেখেছি তার সাথে তখনকার সময়ের কোন মিল নাই। নামে পাকিস্তান হলে ও আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি। যার নাম, সংস্কৃতি , ভাষা ধর্মচারণ সব ছিলো স্বতন্ত্র। এটা এখন বেশ বুঝতে পারি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা মানুষগুলো দেখতে বড় সড় আর ফর্সা টাইপের বলে কখনোই তাদের নিজের কেউ বলে মনে হতো না। কাউকে কাউকে রেসপেক্ট কাউকে কাউকে অপছন্দ করলেও দূরত্ব ছিলো সবসময়। আর অন্যদিকে বাঙালি মানেই ছিলো আত্মার আত্মীয়। তখনকার রাজনীতি চাইতো সবাই বাঙালি হয়ে উঠুক। স্লোগান ছিলো, এক একটি বাংলা শব্দ এক একজন বাঙালির জীবন। একাত্তর পর্যন্ত এই ধারা অব্যহত ছিলো। তারপর আমরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে বদলে দিলাম বাঙালির ইতিহাস। ভীতু নামের পরিচিত বাঙালি জাতি সে একবার ই রুখে দাঁড়িয়েছিল । বদলে দিয়েছিল পরাধীনতার কলংক।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুক্তি আর স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু চার জাতীয় নেতা কিংবা অন্যান্য দলের নেতরা ও চাইতেন বাঙালি নিজের মতো করে বাঁচুক। কিন্তু তা কি আসলেই হয়েছে? আজকে আমরা যেদিকে তাকাই ইতিহাসের কোন জায়গায় সবার কথা বলার নিয়ম নাই। একাত্তর কেবল আওয়ামী লীগের একার কিছু না। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ মুজিব বাহিনী মুক্তি বাহিনী যতো নাম যতো পরিচয় থাকুক না কেন মূলত এক প্রাণ এক আত্মার বাঙালি চাইছিলো মুক্ত জীবন। দেশ স্বাধীন হলো মাটি দেশ মুক্ত হলো। কিন্তু মনের মুক্তি মিললো না। প্রথম দু বছর সে মুক্তি আকাশে আকাশে থাকলেও এরপর থেকে মাটিেেত নেমে আসে বিভীষিকা। শারদীয় দুর্গাপূজার পর শুরু হয় মূর্তি ভাঙ্গার খেলা। ধারণা করা হয়েছিল এটা তখনকার ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতার দুশমনদের কাজ। হয়তো তাই। কিন্তু তারপর থেকে এসব অনাচার আর থামে নি।
সবদেশে সব জাতিতে দ্বন্দ্ব থাকে। মারমারি থাকে। সংঘাত থাকে। কিন্তু এমন জাতি দেখি নি বা শুনি নি যারা লাখো মানুষের মৃত্যু আর মা বোনের ইজ্জত যাবার পর ও ভুলে যায় সবকিছু। যে পূর্ব পাকিস্তানের নিন্দা বা পাকিস্তানের বদনামে আমরা মুখর, স্বাধীন দেশের ৫০ বছর পর কি আমরা সে গর্ব আসলেই করতে পারি? না করা উচিৎ? আজকের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম পাকিস্তানের নামে পাগল। এ প্রবণতা না নতুন না সাময়িক। বরং দিন দিন বাড়তে বাড়তে এখন এটা ছোঁয়াচে রোগের মতো। অথচ প্রজন্মের পর প্রজন্ম জন্মেছে স্বাধীন দেশে। এরা না পরাধীন না কোন দাস। আমাদের মতো পরাধীন দেশে জন্মায় নি এরা। ছেলেবেলা থেকে নিজেদের পতাকা গান ভাষা নিয়ে বড় হয়ে ওঠা এই প্রজন্ম নিজেদের ক্রিকেট টিম দেখছে। তাদের জয় দেখছে। আমাদের দেশের কতো গুণি মানুষ আজ বিশ্বনন্দিত। আমাদের দেশে আছেন নোবেল জয়ী। বছরের পর বছর বই মেলা হয়। হয় কালচারাল উৎসব। শান শ ওকতের কোন অভাব নাই। অথচ এ দেশের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এগুলো টানে না। তাদের দিলে পাকিস্তান। তাদের কানে মুক্তিযুদ্ধের কথা ঢোকে না। তাদের ভালো লাগেনা ইতিহাস। তাদের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা এখন আর কিংবদন্তী নয়। যারা এ কথাগুলো উড়িয়ে দেবেন বা বলবেন এটা একটা অংশের জন্য সত্য তাদের বলি জেগে ঘুমালে কেউ আপনাদের জাগাতে পারবে না।
আজকে যে সংস্কৃতি দেখছি তা কি পাকিস্তান আমলের চাইতে ভালো? যে সংস্কৃতির জোরে মুক্তিযুদ্ধ জেতা সে আজ মৃত। আমি নিজে দেখেছি পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্র ছিলো সামপ্রদায়িক কিন্তু মানুষজন ছিলো উদার। মানুষের অন্তর জুড়ে ছিলো মায়া। সে মায়া আজ নাই। আজকের বাংলাদেশে মানুষ এতো নিষ্ঠুর এতো হৃদয়হীন ভাবাই যায় না। সমাজে ধর্ষণ বলৎকার চুরি ডাকাতি রোজকার ঘটনা। তাও আবার হাজার হাজার কোটি টাকা। যে আশা আর সম্ভাবনা নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তার নমুনা কোথায়? পাকিস্তানের সময়কালে আমরা দু একজন মানুষকে টাকা পাচার করতে দেখতাম। আর এখন? ভারত ইউরোপ তো বটেই কানাডায় লুটের টাকায় গড়ে উঠেছে বেগম পাড়া। সাহেবদের পিছে ফেলে সামনে চলে আসা বেগমরাই এখন দেশের স্ট্যাটাস সিম্বল। তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে সমাজের এলিট ক্লাশ । যেখানে চুরির টাকায় বাড়ী গাড়ি বিলাসিতা ছাড়া আর কোন কিছু নাই জীবনে । না রুচি না বোধ না জ্ঞান।
দেশের ভেতরে ও কঠিন পরিবেশ। বিজ্ঞান প্রযুক্তি চর্চা করে না কেউ। ধর্ম বলতে যা বোঝায় তাও নাই। আছে কিছু ওয়াজের নামে হৈ চৈ। আছে কুৎসা আর অন্য ধর্মের বিশেষত হিন্দুদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো। দেশ ও সমাজে এই যে আক্রমণ অপরের বিরুদ্ধে ঘৃণা আর অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ এর জন্য এসব ওয়াজ কম দায়ী না। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে সরকার আশ্চর্য জনক ভাবে নীরব। মাঝে মধ্যে দুএকজনকে গ্রেপ্তার করলেও তার কারণ নিজেদের ওপর এসে পড়া। অর্থাৎ নিজেদের গায়ে না লাগলে সরকারের টনক নড়ে না। অথচ কথাছিলো সরকার দেশ বাঁচাবে জাতিকে আগলে রাখবে। সেটা যখন লাগাতার ভাবে হয় না তখন এরা মাথার ওপর উঠে বসবে এটাই স্বাভাবিক। আজ তারই মাশুল দিচ্ছে প্রগতিশীল মুসলমান আর হিন্দু জনগোষ্ঠী। এদিকে ভালো করে তাকালে মনে হবে একাত্তরে আসলেই কোথাও ভুল ছিলো।
রাজনীতি যখন থেকে তাজ উদ্দীন আহমদের মতো মানুষদের দূরে সরিয়ে রাখলো তখন থেকেই পতনের শুরু। এখন সব মিলেমিশে একাকার। এখানে চেতনা আদর্শ বা যুদ্ধ এগুলো স্রেফ ধান্দা কিংবা স্বার্ধ হাসিল। সবকিছু এতোটাই এককেন্দ্রিক আর একমুখি যে আর কারো কোন দান অবদান কেউ বলেই না। পাকিস্তান আমলের সাথে তুলনা করলে আমরা কুমীরের ভয়ে বাঘের মুখে এসে পড়েছি। আর সে বাঘ এখন আমাদের জাতির পরিচয় ও অস্তিত্ব গিলে খেতে হা করে আছে।
এই মাটি ও দেশ ভারত থেকে পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হয়েছে। ধরে নিয়েছি এটাই তার শেষ যুদ্ধ ছিলো। কিন্তু এখন একথা বলা যায় না নতুন প্রজন্ম বা ভবিষ্যতের রূপরেখার নকশাকারীরা কি চায়? তারা যদি পপুলার অপশান বা মেজরিটির কথা শোনে তাহলে আবারো পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। নাম পতাকা গান এসব রেখেই বদলে গেছে মনোজগত। সে জগতে মুক্তিযুদ্ধ নাই। নাই কোন অসামপ্রদায়িকতা। মন ও মননের চিন্তা নাই। লালন নাই রবীন্দ্রনাথ নাই নজরুল নাই সিনেমা নাই থিয়েটার নাই বাউল নাই ফকির নাই সাধু থাকবে না দরবেশ ও না। থাকবে থোকা থোকা অন্ধকার । এমন দেশ করার জন্য ই কি পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাথীন হয়েছিল বাঙালি? নতুন ভাবে চিন্তা করে সময় শেষ না হতেই কাজ শুরু করতে হবে। নয়তো মুক্তি নাই উপায়ও নাই।
লেখক : কবি. প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট












