দূরের দুরবিনে

বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি

অজয় দাশগুপ্ত | সোমবার , ৩০ মার্চ, ২০২৬ at ১১:০২ পূর্বাহ্ণ

উৎসব আমাদের বাঙালিদের জীবনের অপরিহার্য এক অংশ। বারো মাসে তের পার্বনের দেশ আমাদের। কালক্রমে সব ছাপিয়ে ঈদ হয়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ উৎসব। এবারের ঈদ এমন এক মাসে যে মাসে আমরা স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করি। ঈদ আর স্বাধীনতা দুটোই আমাদের পরম প্রিয়।

একটা কথা মানতেই হবে ধর্ম ভিত্তিক উৎসবগুলোই আমাদের জীবনের সেরা উৎসব। রাজনীতির বাইরে ধর্ম আমাদের ঐক্য আর সমপ্রীতির বার্তা বাহক। কিন্তু যদি মূলে হাত না দেই আর সত্য না বলি সমস্যা কখনোই যাবেনা। তাছাড়া বায়বীয় মূল্যবোধ বা বায়বীয় সামাজিক মিডিয়ার আড়ালে যে সত্য তাকে খুঁজে বের করতে না পারলে একদিন তার চরম মূল্য দিতে হবে। দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন আমি বালক। আমার স্মৃতিতে স্পষ্টভাবে গেঁথে আছে সেই দিনগুলি। যে অপার উৎসাহ আর পাকি ঘৃণায় মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার সামনে ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

মাঠে ছিলেন তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুলদের মত নেতারা। ময়দানে ছিলেন যুবক অগ্রজেরাযুবতী বোনেরা। আর পেছনে ছিলেন এদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ। এই মধ্যবিত্তই মূলত নির্ণায়ক। তারা ঝুঁকি না নিলেও মুক্তিযুদ্ধ চেয়েছিলেন বলেই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। মুনতাসীর মামুন যে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীন করে গেছেন‘- আমি এটা মানিনা। অনিচ্ছুক নয় মূলত দোদুল্যমান একটি জাতিকে তিনি সঠিক পথে আনতে পেরেছিলেন। কিন্তু এটা মানি সেই দোদুল্যমান পেন্ডুলামের কাঁটাটি আজ আবার সাতচল্লিশ বছর পর ১৯৪৭ এর দিকেই যেন ঝুঁকে আছে। যেখানে আছে পাকিস্তান ভাঙার বেদনা, ধর্ম এবং ভারত বিদ্বেষের মত কঠিন বিষয়। তারসাথে যোগ হয়েছে সংখ্যালঘু নামে পরিচিত মানুষের প্রতি অবজ্ঞা।

ঢাকায় গল্প গদ্য লিখে পরিচিত একটি তরুণী বলেছিলো তার জীবনের ঘটনা। মেয়েটি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রবল অনুগত। এইদেশ এইজাতি এই সমাজকে আলোময় দেখতে চায় সে। কখনো ধর্মে বর্ণে ভাগ করেনা কাউকে। বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খৃষ্টান, বাংলার মুসলমানআমরা সবাই বাঙালি‘, লেখা একটি পোস্টার এনে লাগিয়েছিলো ঘরের দেয়ালে। একদিন তার স্বামী প্রবল আক্রোশে সেই পোস্টারটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে। অসহায় মেয়েটি কারণ জেনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তার স্বামীর ধারণা এইসব নাস্তিক মার্কা পোস্টার ঘরে থাকার কারণে তার পাপ হচ্ছে বলেই উন্নতি হচ্ছেনা। কবে আমরা এমন বদলে গেলাম? কবে থেকে আমরা এমন জাতিতে পরিণত হলাম? এখন তো এমন অবস্থা আপনি চাইলেও অনেক কথা বলতে পারবেননা। আওয়ামী লীগের দশ পার্সেন্ট নেতা কর্মী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন কি না এই প্রশ্ন করা যৌক্তিক হলেও আপনি তা করতে পারবেননা।

এত বছর পর ও আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে মীমাংসায় আসতে পারিনি। একটি জাতি বা দেশ কেবল বাঁশির ফুঁয়ে স্বাধীন হয়, এমন আজগুবি তত্ত্বও এদেশের মানুষ খায়। শুধু খায়না, বিশ্বাসও করে। কাদের সিদ্দিকীর মত মুক্তিযোদ্ধা সবচেয়ে সেরা খেতাব পাওয়া রাজনীতিবিদও এ নিয়ে দ্বন্দ্বে ভোগেন।

অথচ আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের যৌবনে জন্মভূমি ছিলো আরেক ধরনের। আমাদের পোশাকের ঠিক ছিলোনা। একটি ব্যালবটম প্যান্ট সেলাই করতে দিয়ে সারারাত জেগেছিলাম সকালে পাবো বলে। হাতে গোণা কয়েকটি শার্ট আর দুয়েক জোড়া মাঝারি মানের জুতো। আমাদের বাবাদের চশমার কাঁচ খালি পুরু হতো। কপালের ভাঁজ হতো দুশ্চিন্তায় ঘন। যাদের বাড়িতে একাধিক কন্যা তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিলো কীভাবে মেয়ের বিয়ে হবে। চাকরী ছিলো সোনার হরিণ।

আজ যারা আমাদের দেশকে উন্নতশীল বা সমৃদ্ধ বলছে সেদিন তাদের চেহারা ছিলো ভিন্ন। তারা আমাদের শুধু তলাবিহীন ঝুড়ি বলেননি ফকির ভিখারি ডাকতেও কসুর করতেন না। তাদের ফেলে দেয়া পোশাক বর্জ্য দুধ, ব্যবহৃত প্রসাধনী দিয়ে বড়লোক বা আধুনিক সাজতে হতো আমাদের। আমাদের দেশ টিকবে কি না, এনিয়ে কত তত্ত্ব আর কত উপদেশ! বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর এমনও ধারণা করা হয়েছিল পাকিস্তানে ফেরার খুব বেশি দেরি নাই আর। অথবা ছায়া পাকিস্তান হতে চলেছি আমরা।

আজকের বাংলাদেশ আরেক চেহারার। তার গায়ে উন্নয়নের ছোঁয়া। কলকাতা গেলেই বুঝতে পারি কতটা ভালো আছে দেশের মানুষ। সুখ বা শান্তির কথা বলছিনা। তাদের পোশাক খাবার কিংবা জীবনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বাংলাদেশে আর যাই থাক টাকার অভাব নাই। যে টাকা ছিলো স্বপ্ন সে টাকা আজ বাতাসে উড়ছে। আমি এমন কাউকে দেখিনি যার হাতে টাকা নাই। তারপর ও কেন এই বাস্তবতা? কেন এখনো সামপ্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা? যে তারুণ্য আমাদের পথ দেখাতো বা দেখাতে পারে তারা মজে আছে কাওয়ালিতে। কাওয়ালি খারাপ কিছু না। কিন্তু ভাবার বিষয় হচ্ছে এর পেছনে থাকা মানসিকতা। যা আমাদের অতীতকে কলুষিত করতে চায়। আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পাকিস্তানের সাথে মিতালির ইন্ধন দেয়। যা স্বাধীনতা আর মুক্তির সাথে সংঘাতপূর্ণ। পৃথিবীর কোনো জাতি নিজের স্বাধীনতাকে অশ্রদ্ধা বা অসম্মান করার জন্য এক রাষ্ট্র এক জাতি এক পতাকাকে দ্বিতীয়বার স্বাধীনবলে চিহ্নিত করে না। অথচ তাই বলা হচ্ছে আমাদের দেশে। এটা ই প্রশ্ন এখন, আমরা আসলে কী স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী? যদি তা হয় তাহলে কূটতর্ক বন্ধ করতেই হবে। মানতে হবে আওয়ামী লীগের সরকার ষোল বছরে দেশকে কঠিন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়াতেই এই বিরূপ পরিস্থিতির জন্ম। তারা আজ নাই। তাদের পলায়ন বা চলে যাবার ভেতরেই তাদের পরাজয় । এর সাথে আমাদের অর্জন বা ইতিহাসকে মেলানো অনুচিত।

তাই কয়েকটা বিষয়তো নিশ্চিত হতে হবে। ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধ সমাজের চেহারা বা প্রগতিশীলতা এগুলো আমরা আসলে চাই কি না? চাইলে হানাহানি বন্ধ করে শান্তিতে থাকার পথ তৈরি হোক। আর না চাইলে কি তার সমাধান তা ঠিক করুক দেশের বুদ্ধিজীবী বরেণ্য মানুষেরা বা রাজনীতিবিদেরা। আমরা আমাদের দেশপ্রেম আর স্বদেশের মঙ্গল চাই। তার অপমান আর দেখতে চাইনা। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও এগিয়ে চলা নিশ্চিত করতে কেমন দেশ চাই সেটা ঠিক করা এখন জরুরি।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅটিজম আক্রান্তদের বাঁকা চোখে নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখুন
পরবর্তী নিবন্ধআবু সাঈদকে হত্যার স্থানে উপস্থিত এক পুলিশ কর্মকর্তাকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তারের উদ্যোগ