মাতৃভাষা হল মানুষের আবেগ–অনুভূতির প্রকৃত প্রকাশ মাধ্যম। তার জিয়নকাঠির স্পর্শেই নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হয়, বোধের গভীরে চিন্তার বুদবুদ কারার দ্বার ভেঙে বাইরে এসে বাক্মূর্তি ধারণ করে। আর অন্যদিকে শিক্ষা হলো মানব জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
মানুষের সকল ধনসম্পত্তি মানুষকে ছেড়ে চলে গেলেও অর্জিত শিক্ষা ও জ্ঞান কখনো মানুষের সঙ্গ ছাড়ে না। তাই সেই অর্জিত শিক্ষার সঙ্গে মানুষের অন্তস্থলের আবেগের যোগ থাকা একান্ত আবশ্যক। সেকারণে শিক্ষার সঙ্গে মানুষের অন্তরের আবেগকে যুক্ত করার জন্য প্রয়োজন মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের। প্রাণের ভাষা ও প্রানের জ্ঞান একত্রিত হলে তবেই একজন সার্থক মানুষরূপে পৃথিবীর বুকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হবে।
একুশে আমাদের অহংকার। এটা সবাই জানি। আজ এত বছর পর একুশে ফেব্রুয়ারি কোথায় দাঁড়িয়ে? যে ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমরা গর্ব করি সে ভাষার কি অবস্থা এখন? এসব বিষয় বিবেচনা না করলে আবেগের নদীতে ডুবে মরার বিকল্প থাকবে না। আমি মধ্য ষাট বয়সী। আমার জীবনে আমি ভাষার যে সম্মান আর গৌরব দেখেছি তার সাথে আজকের বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলে হতাশ হই। মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি, এজন্য ই কি আত্মাহুতি দিয়েছিলেন ভাষা সৈনিকেরা? আজ অবধি আমাদের দেশের শিল্প সংস্কৃতি ইতিহাস ও রাজনীতিতে একুশের মতো কোন স্মরণীয় দিন নাই। মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা বিজয় দিবসের পাশাপাশি এই দিনটি আমাদের অহংকারের প্রতীক।
বলছিলাম ভাষার গৌরবের কথা। মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নে দেয়ালে দেয়ালে একটি পোস্টার চোখে পড়তো। যাতে লেখা থাকতো, একটি বাংলা বর্ণ একেকটি বাংলা অক্ষর একজন বাঙালির প্রাণ। আহা! কী আবেগ আর কি আকুতি। সে আবেগ আজ নিস্তব্ধ। পথহারা বেগের কাছে আকুল ভাবে আত্মসমর্পিত। কেন এই দশা? যে বাঙালি ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল তার কপালে এই দুর্ভোগের কারণ কি?
তার আগে বলব, আমাদের দেশটি স্বাধীনতার পর এই সেদিনও ভাষার ব্যাপারে ছিল সচেতন। যে সব আন্দোলন সর্বজন স্বীকৃত যে দিবসটি দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই পালন করে তার নাম একুশে। অথচ সেটি ই এখন আক্রান্ত। ভাষা দিবসের মহান দিনটিতে আমাদের দু:খ করে বলতে হচ্ছে, তারুণ্য মাতৃভাষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আসলেই কি এজন্য তারা দায়ী?
বলতে হবে মূল সমস্যার শুরু আগে হলেও সবচেয়ে বদ আছর পড়েছে ডিজিটাল দুনিয়া খুলে যাবার পর। যেই না এই দুয়ার খুলেছে অমনি হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছে বেনো জলের মত যাবতীয় জন্জাল। একদিকে ধর্ম অন্যদিকে আগ্রাসন। এই আগ্রাসনে পাশের দেশের হিন্দী মধ্যপ্রাচ্যের আরবী বা পাশ্চাত্যের ইংরেজি কিছু ই পিছিয়ে নেই। ধর্মের ভাষা বলে হিন্দু সংস্কৃতকে মুসলমান আরবীকে বৌদ্ধেরা পালিকে গুরুত্ব দেবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে গুরুত্ব আমরা দিচ্ছি না। দিচ্ছি আমাদের যুক্তিহীন আবেগকে প্রশ্রয়। অথচ শুদ্ধ আরবী জানা বা হিন্দি জানা ইংরেজি লিখতে পারা একটি গুণ। সে কাজে নাই আমরা। আছি নিজের ভাষার বারোটা বাজানোর জন্য নানা রকম ধান্দায়। যখন থেকে এসব চালাকি আমাদের ভাষাকে আক্রমন করতে শুরু করলো তখন থেকেই বিপদের শুরু। এখন তা এমন এক পর্যায়ে তারুণ্যের কথা শুনলে আপনি বুঝতেই পারবেন না তারা কি আদৌ বাংলায় কথা বলছে না অন্য কোন ভাষায়।
সংস্কৃতির বড় পরিচয় তার ভাষা ভাষার সৌন্দর্যে । যে কোন একটি ভাষা গড়ে ওঠে ও তার সঠিক রূপ নেয় কাল থেকে কালান্তরে। সে কালান্তরের আগেই আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে ভাষার টুঁটি চিপে ধরতে দেখলাম। এক সময় টেলিভিশন নাটকে সংলাপের ক্ষেত্রে ‘প্রমিত’ বাংলা ভাষার শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও এখন চলিত ও আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারই চোখে পড়ে বেশি। এ বিষয়টি নিয়ে অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে বেশ বিরোধও চোখে পড়ছে। কেউ বলছেন জাতীয় গণমাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনে একটি মান ভাষা বজায় রাখা প্রয়োজন; আবার কেউ বলছেন আঞ্চলিক ও কথ্য ভাষাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বাংলা ভাষা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বর্তমানে। ভাষা বিকৃতির মহোৎসব চলছে চারদিকে। ঘরের ড্রয়িং রুম থেকে শুরু হয় এ বিকৃতি। পথে নেমে কান পাতলে শোনা যায় আরও শত রকমের বিকৃত বাংলা উচ্চারণ। একটি দেশের প্রজন্মের বড় একটি অংশ শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে কথা বলতে পারেন না। এদের অনেকের কাছেই ইংরেজি ও বাংলার মিশ্রণে তৈরি নতুন ধরনের ভাষা প্রিয় হয়ে উঠছে।
এর ভোক্তা বা ব্যবহারকারী তারুণ্য জানে না এর মাধ্যমে তাদের কি ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। মজা করে বলতে বলতে বা নাটকে বলাতে বলাতে এটা এখন সবার কথ্য ভাষায় পরিণত হয়ে গেছে। এমন কি লিখতেও কসুর করছেনা অনেকে। মজার ব্যাপার এই যারা এর প্রবক্তা বা চালু করেছেন তারা তারুণ্যকে এগুলো গছিয়ে নিজেরা কিন্তু সৃষ্টিশীলতা চালু রেখেছেন পরিমিত প্রমিত গদ্যে। ভাষায় সামপ্রদায়িকতা বলে একটা কথা চালু আছে। আমাদের রাজধানীর কিছু কথিত ভারত বিদ্বেষীরা তার সুযোগ নিয়েছে পুরোপুরি। এরা কলকাতার কাছে আত্মসমর্পিত। অথচ কলকাতার ভাষার সাধে পার্থক্য তৈরীর নামে বিভক্তির দেয়ালে নতুন পেরেক ঠুকেছেন। যার শিকার কোমলমতি সন্তানেরা। তাদের মুখের ভাষা আজ বাংলা থেকে অনেক দূরে।
আর একটা বিষয় হলো শিক্ষার মাধ্যম। ইংরেজি জানা মনীষীদের নাম জানলেই য়োঝা সম্ভব তাঁরা যেমন ইংরেজি জানতেন তেমনি জানতেন মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় দখল আর আধিপত্য ধাকলেই অন্যের ভাষা আয়ত্ত করা সম্ভব। শুধুমাত্র ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখার নামে নির্দিষ্ট কিছু বইপত্র পড়ে মা কে মাম্মি আর বাবাকে ড্যাডি ডাকলেই ইংরেজি শেখা হয় না। কি নিদারুণ বাস্তবতা! ভাই বন্ধুকে ব্রো আর বোন কে সিস ডাকার এই কালে আমাদের ভাষা যে কোথায় মুখ লুকিয়ে কাঁদছে কেউ তা খেয়াল করে না।
ভাষা বিকৃতি ভাষা থেকে প্রজন্মকে দূরে রেখে কি আমরা আসলেই একুশের অর্জন ধরে রাখতে পারবো? আপনি দেখবেন মিডিবা জুড়ে যে আবেগ বা অনুভূতি তার সিকি ভাগ ও বাস্তবে নাই। কেন নাই? আজকাল ইউটিউবের যুগ। খুললেই পাবেন নানা ধরনের মুখরোচক খবর। তাতে দেখবেন সাংবাদিক বা প্রশ্নকারীর মুখোমুখি একজন তরুণ তরুণীও সঠিক ইতিহাস বা তথ্য জানে না। তারা একুশের দিনটি কেন কবে কোথায় হয়েছিল তা ও বলতে পারে না। এমন ই এক ভয়াবহ বাস্তবতার ভেতর এবারের একুশে আমাদের জন্য সতর্ক হবার ডাক নিয়ে এসেছে ।
কে করবে সতর্ক? কা‘রা নেবে দায়? আমি বলব এবারের একুশে আমাদের ঘরে পরিবারে সমাজে সতর্ক হবার ডাক দিচ্ছে। দেশের বাইরে বরং পরিবারগুলো সন্তানদের বাংলা শেখানোর জন্য মরিয়া। দেশে ঠিক তার উল্টো। সরকারকে মনে রাকতে হবে আধুনিক বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশ মানে সড়ক রাস্তাঘাট বা যান্ত্রিক উন্নয়ন মাত্র নয়। আত্মিক বিস্তার আর মাতৃভাষার বিস্তার না ঘটলে কোন জাতি এগুতে পারে না। আমাদের দেশটি নয় নয় করে ৫০ বছর পেরিয়ে এসেছে। অথচ এখনো আইন, বিজ্ঞান, সাহিত্য বা নানা বিষয়ে আমাদের ভাষায় কোন সুলিখিত বই নাই। নাই তেমন উদ্যোগ। ছোট একটি দেশ চেক প্রজাতন্ত্র সে দেশের এক বাঙালি জানা অধ্যাপক এসেছিলেন ঢাকা‘র বই মেলায় তিনি দু:খ করে বলেছিলেন এতো সমৃদ্ধ ভাষা আন্দোলনের পর ও আপনাদের দেশে মাতৃভাষায় বিভিন্ন বিষয়ে বই নাই অথচ আমাদের ছোট্ট দেশে যা চাইবেন তাই পাবেন নিজের ভাষায়। একুশে ফেব্রুয়ারি অমর হোক। মুক্ত হোক বাংলা ভাষা।
লেখক : সিডনি প্রবাসী প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।











