মানুষ কেন বাঁচে? একজন ব্যক্তি মানুষের বাঁচার তাগিদ তার জীবন। তার পরিবার। সমাজের মানুষ বাঁচে সামাজিক জীব হয়ে। আর যূথাবদ্ধ মানুষ বাঁচে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে। রাষ্ট্র ব্যবস্থার গোড়াতেই মানুষ সীমানা নির্ধারণ করে বাঁচার পথ খুঁজে নিয়েছিল। এই সীমানা নির্ধারণ কেবল ভৌগলিক ভাবলে ভুল হবে। এর পেছনে থাকে জাতির ইতিহাস আর সংস্কৃতি। তবে মূল বিষয় তার ভাষা। ভাষা ভিত্তিক ঐক্য বড় বেশী জরুরি। মানুষই একমাত্র জীব যে কথা বলতে পারে। লিখতে পারে। এই কারণে সে সংস্কৃতি নির্ভর। যে দেশ বা জাতির সংস্কৃতি নাই তার বাঁচার আনন্দ কম। জীবন ধারণ আর জীবন যাপনের যে তফাৎ সেটাই বুঝতে পারি এখান থেকে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাঙালি কি শুধু বাঁচবে না জীবন যাপন ও উদযাপনে বাঁচবে? এতদিন পর্যন্ত এ নিয়ে সংশয় থাকলেও প্রশ্ন ছিল কম। বরং মনে করা হতো বাঙালি বাঁচতে শিখেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান গতিপ্রকৃতিতে বাঁচার আনন্দ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এর মূল কারণ মব। মবকে কেন কালচার বলে জানি না। সংঘবদ্ধ কিছু মানুষের দৌরাত্ম্য কখনো কালচার বা সংস্কৃতি হতে পারে না। আশংকার বিষয় হচ্ছে এটা বাড়ছে আর ক্রমাগত আমাদের সমাজকে ধ্বংস করে ফেলছে। যেমন বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম তেমনটা পাই নি কিন্তু আশার রেখা কখনো এভাবে মুছে যাবে ভাবে নি কেউ। হঠাৎ করে দমকা হাওয়ার তোড়ে নিভু নিভু বাঙালি সংস্কৃতি। অথচ অনেকে অবাক হন যে কেন প্রতিরোধ নাই। প্রতিরোধের শক্তি যারা নিঃশেষ করে দিয়ে গেছেন তারা বিদেশে আরাম আয়েশে থাকলেও দেশের সাধারণ মানুষ তাদের কারণে চরম অস্বস্তিতে আছে। বলছিলাম প্রতিরোধের কথা। অচলায়তন বানিয়ে নিজেকে বা নিজেদের কে কিছু কাল আরাম আয়েশে রাখা গেলেও আখেরে সময় ছেড়ে কথা বলে না। আজ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি সংস্কৃতির যে দুর্ভোগ তা থেকে উত্তরণ সহজ হবে না। একটা ছোট অভিজ্ঞতার কথা বলি। তৈল নিমজ্জিত সময়ে এক প্রবীণ বুদ্ধিজীবী আমাকে জানিয়েছিলেন কোন এক সভায় মহামান্যের কৃপা পাওয়ার আশায় আমার একটি লেখা থেকে কোট করে ভাষণ দিয়ে রাণীকে তুষ্ট করলেও আসল লেখকের নাম বলেন নি। আমি প্রতিবাদ করতে পারি ভেবে আমাকে খুশি করেছিলেন এই বলে, এই ভাষণটি না কি লেখা আকারে ছাপা হবে আর তখন সৌজন্যে নাম লিখে তার দায় মুক্ত হবেন। যা কোনদিন হয় নি এবং হবার কথাও ছিল না। ঘটনাটা বললাম এই কারণে বয়োবৃদ্ধ এসব মানুষেরা পরের মাথায় কাঠাল রেখে খাবারের নেশায় তারুণ্যকে অবহেলা করতেন। ধর্মে আছি জিরাফেও আছি টাইপের লোকজন এখন উধাও। কারণ এখন যারা মাঠে তারা সংঘবদ্ধ।
একসময় দেশে ছোটোখাটো অনাচার বা অন্যায় হলেও সংস্কৃতি রুখে দাঁড়াতো। পারতো প্রতিবাদের বন্যায় অন্যায় ভাসিয়ে দিতে। তাদের বিষহীন করে ফেলা হয়েছিল। নানা পদ পদক আর প্রলোভনের নেশায় এরা কর্তব্য ভুলে অহরহ তৈল মর্দনে ব্যস্ত থাকায় বঊ আগেই খেলা হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। আজ একটা কথা বলতেই পারি, দেশে সবকিছু একমুখী করার নামে যে অন্যায় আর অপমান তার জবাব পেতে হবে এটাই হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম। অযোগ্য অপদার্থ আর অন্ধ মানুষদের ভীড় বাড়তে বাড়তে একসময় আসল খাঁটি মানুষেরা হারিয়ে গেলেন। এখন দুরবিন দিয়ে দেখলেও তাদের খোঁজ মিলছে না। তবে কি আমাদের আর উদ্ধার বলে কিছু নাই? খেয়াল করবেন যেসব মৌলিক বিষয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সেগুলোর ধার ও ভোঁতা হয়েছিল আগেই। আমি আমি করতে করতে আমরা শব্দটাই আসলে হারিয়ে গেছিল। চেতনা এখন হাস্যকর একটি বিষয়। এই হাস্যকর বিষয় বানানোর কারিগরেরা আসল কান্না কাঁদলেও মানুষ আর বিশ্বস করছে না। এমন কি সংঘবদ্ধ একটা প্রতিবাদও দেখা যায় না। এমন তো পঁচাত্তরেও হয় নি। যখন রাজনীতি কঠিন সময় পার করছিল যখন দেশের অস্তিত্ব নিয়ে টানা হেঁচড়া চলছিল তখন এই সংস্কৃতিই পথে নেমে আসতো। শুধু পথে নামা নয় এমন শক্তি যোগাতো যা অভাবনীয়। এমন সময়ও আমরা দেখেছিলাম যেখানে সংস্কৃতির পেছনে কাঁচুমাচু হয়ে আশ্রয় নিতো রাজনীতি। এক এক করে সব প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার সময় যারা ভেবেছিল এগুলো আর লাগবে না তারাই এখন কাঁদছে।
রবীন্দ্রনাথ নজরুল লালন হাসন বাউলেরা কতবার আক্রান্ত হয়েছিলেন তার কোন ইয়াত্তা নাই। কিন্তু তারা মনে করতো ডান্ডার জোরে সবকিছু চাপিয়ে রাখা সম্ভব। অথচ এরা শিশু কিশোর সংগঠন সহ যুবাদের স্বপ্ন ধসে কসুর করে নি। রাজনীতির হাতে সংস্কৃতির অপমান চলতো প্রতিদিন। প্রতিবছর হাস্যকর পুরস্কার আর পদকে ভূষিত মানুষগুলো এখন উধাও। অথচ তারাই রয়ে গেছেন যারা এদের চোখে আর যাই হোক বন্ধু ছিলেন না। তারাই কথা বলছেন যাদের তারা দুশমন মনে করতেন।
দাশর্নিক পল এস বার্ক মনে করতেন পরিবর্তন হচ্ছে জীবনের চিহ্ন। পরিবর্তন যুগে যুগে মানুষকে বদলে দিয়েছে এবং দেবে। কিন্তু নেগেটিভ পরিবর্তন মোকাবেলার শক্তিকে কখনো ছৌত করতে নাই। করলে কি হয় তার ফল হাতে হাতে পাচ্ছে বাংলাদেশ।
সংস্কৃতি হোক আর জীবন হোক যাই হোক না কেন তার প্রথম শর্ত নিরাপত্তা। যারা এটা বোঝেন তারা বারবারই দেশ ও সমাজকে অনিরাপদ করার কাজে ব্যস্ত থাকবেন। কারণ সেটা করা না গেলে তাদের খোয়াব পূর্ণ হবে না। বাংলাদেশের শেষ ভরসা মুক্তবুদ্ধি আর মানুষ। মুক্তবুদ্ধি বিষয়টাকে পিন্জরে ঢুকিয়ে যারা আনন্দ পেতেন এখন তারা চাইলেও দুয়ার খুলে তাকে আকাশে উড়াতে পারছেন না। মুক্তবুদ্ধির ওপর চেপে বসছে নানা সংস্কার। বলাবাহুল্য স্পর্শকাতর বিষয়গুলো যেমন ধর্ম বা নৈতিকতা যত বড় হয়ে উঠবে ততই পথ হারাবে মুক্তবুদ্ধি। বাকী থাকলো মানুষ। তারা এখন চুপ। চুপ তারা থাকতেই পারে। বারবার জীবন বিসর্জন দিয়ে তারা কোন প্রতিকার পান নি। তারা এমনটা মনে করতেই পারেন, যা হবার হোক আমার তাতে কি? অথচ সংস্কৃতি না জাগলে মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস কিছুই টিকবে না। বাংলা বাঙালি কবে তার শিকড়ে ফিরবে কে জানে? সময় বয়ে চলেছে তার নিজস্ব নিয়মে সংস্কৃতি কি ঘুমেই থেকে যাবে?
লেখক : সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক।










