(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সিডনি হারবার মুলতঃ একটি উপসাগর, প্রশান্ত মহাসাগরের অংশ। এটি উপকুলের ভিতরে ঢুকে যাওয়া একটি অংশ, গভীরতা ১৩ মিটার থেকে ৪০ মিটার পর্যন্ত। ৪০ মিটার মানে ১৩০ ফুটের বেশি! এতো গভীর একটি সাগর বা নদীতে কোন কারনে টুপ করে যদি পড়ে যায় তাহলে শেষরক্ষা সলিল সমাধিতে! কিন্তু সাগরের ছোট ছোট ঢেউ এবং স্বচ্ছ নীল জল এমন মুগ্ধ করছিলো যে, পানিতে নেমে সাঁতার কাটতে ইচ্ছে করছিলো। আমরা ক্রুজিং জাহাজ থেকে কখনো সিডনি অপেরা, কখনো হারবার ব্রিজ আবার কখনো বা দূরের প্রকৃতি নিয়ে পাগলের মতো ছবি তুলছিলাম। কী পরিমান মুগ্ধতা যে আমাদের বিশেষ করে আমার ভিতরে দোলা দিচ্ছিলো তা লিখে বুঝানো অসম্ভব। এই সিডনি অপেরা দেখার জন্য কী পরিমান আকুতি যে কত বছর ধরে লালন করছিলাম তা বলে বুঝানো অসম্ভব। প্রতিবছর থার্টি ফাস্ট নাইটে এই অপেরা এবং ব্রিজ বর্ণিল হয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। এখানে এতো বেশি ফায়ার ওয়ার্কস হয় যে, পুরো বিশ্ব চমকে চমকে দেখে। আর ওই চমকে চমকিত হতাম আমিও। অবশেষে সেই সিডনি অপেরা এবং হারবার ব্রিজ চোখের সামনে! পুলকটি কী অনুভব করা যায়!
আমাদের ক্রুজ শেষ হলো। আমাদেরকে আবারো ঘাটে এনে নামিয়ে দেয়া হলো। জাহাজ থেকে সারিবদ্ধভাবে নেমে আসলাম আমরা। আমাদের ট্যুর অপারেটর নেতৃত্ব দিয়ে মাথা গুনে আমাদের নামিয়ে বাইরে বের করে আনলেন। প্রচুর পর্যটক, জাহাজে উঠার অপেক্ষায় বহু মানুষ। জাহাজটি এখন আবারো একই পথে যাত্রা করবে, এভাবে পর্যটকের বান সামলাতে জাহাজটিকে দিনভর ভাসতে এবং পর্যটকদের আনন্দে ভাসাতে হয়।
ট্যুর অপারেটর আমাদেরকে গোল করে দাঁড় করালেন। বললেন, এখানে আমরা আরো দুইটি জিনিস দেখবো। বিখ্যাত অপেরা হাউজ এবং হারবার ব্রিজ। তিনি প্রথমে হারবার ব্রিজ দেখে পরে অপেরা দেখার পরামর্শ দিয়ে বললেন, তাহলে ওখানে রয়ে সয়ে সময় কাটাতে পারবেন। আমরা সায় দিলে তিনি সামনে হাঁটতে লাগলেন।
সিডনি শহরের জলরেখা জুড়ে যে বিশাল স্টিলের খিলান দূর থেকে চোখে পড়ে, সেটিই সিডনি হারবার ব্রিজ। ১৯৩২ সালে উদ্বোধন হওয়া এই সেতুটি শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম জাতীয় প্রতীক, অনেকটা সিম্বল অব সিডনি। ১ হাজার ১৪৯ মিটার বা এক কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এবং ১৩৪ মিটার উচ্চতার এই স্টিল আর্চ ব্রিজ নাকি বিশ্বের বৃহত্তম আর্চ সেতুগুলোর একটি। ব্রিজটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৯২৩ সালে। একশ’ বছরেরও বেশি আগে! ব্রিজটি নির্মাণে সময় লেগেছিল আট বছর। হাজার হাজার শ্রমিক ও প্রকৌশলীর পরিশ্রমে সিডনি হারবারের বুকে সৃষ্টি হয়েছিল অনন্য এই ব্রিজটি। ব্রিটিশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডরম্যান লং ব্রিজ নির্মাণের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। ব্রিজটির নকশা করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান প্রকৌশলী জন ব্র্যাডফিল্ড।
সেতুটির প্রস্থ প্রায় ৪৯ মিটার বা ১৬০ ফুট। এতে আটটি সড়ক লেন, দুটি রেললাইন, একটি সাইকেল লেন এবং একটি পথচারী চলাচলের পথ রয়েছে। একশ’ বছর আগে ৮ লেনের সড়কসহ রেল সেতু! চিন্তা করা যায়! কী পরিমাণ দূরদৃষ্টি ছিল প্রকৌশলীদের। সাইকেলের পথ এবং হাঁটার পথ রাখার কথাও তারা ভুলেননি। একশ’ বছর আগে এমন দূরদৃষ্টি! সিডনির সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্টকে শহরের উত্তর তীরের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই ব্রিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্থানীয়রা স্নেহ করে এই ব্রিজকে ‘কোটহ্যাঙ্গার’ নামেও ডাকেন। কারণ দূর থেকে দেখলে ব্রিজটির আর্চ আকৃতি অনেকটা জামা ঝোলানোর হ্যাঙ্গারের মতো মনে হয়।
পর্যটকদের কাছে সেতুটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা হলো ‘ব্রিজ ক্লাইম্ব’– যেখানে বিশেষ নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরে দর্শনার্থীরা ব্রিজের চূড়ায় উঠে পুরো সিডনি শহর ও নীল জলরাশির অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। ব্রিজের ডেক থেকে উপরে উঠে যাওয়া লোহার খিলানগুলোতে চড়ার এই বিশেষ আয়োজনকে বলা হয় ব্রিজ ক্লাইম্ব– ব্রিজে চড়া। নববর্ষের রাতে এই ব্রিজকে ঘিরে আকাশজুড়ে যে বর্ণিল আতশবাজি ফুটে ওঠে, তা দেখতে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ভিড় জমান।
আমরা ব্রিজের উপর হাঁটাহাঁটি করলাম, ছুঁয়ে দেখলাম, ছবি তুললাম। একশ’ বছরের পুরানো লোহালক্কর এখনো এবং ঠাসা! কী পরিমাণ যত্নে যে ব্রিজটিকে রাখা হয়েছে। ব্রিজের খিলানে খিলানে লাগানো বিশালাকৃতির নাট বল্টু দেখে ভিমরি খাওয়ার উপক্রম হলো। এতো বড় বড় নাট বল্টু কি করে বানানো হয়েছিল, লাগানো বা হলো কি করে! ব্রিজে ঘোরাঘুরি শেষ করার তাগাদা দিলেন ট্যুর অপারেটর। বললেন, এবার সিডনি অপেরা দেখতে হবে। সিডনি অপেরা ব্রিজের কাছেই। পাথরের সাদা পালতোলা নৌকাটি দেখা যাচ্ছিলো।
সিডনি অপেরা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার ভাষা আমার নেই। এটি সিডনির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক– সিম্বল অব সিডনি। সাদা পাল–আকৃতির ছাদের এই ভবনটি আধুনিক স্থাপত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে বিশ্বব্যাপী খ্যাত। এটার নির্মাণকাজের মধ্যেও ছিল চমক। একটি অপেরা হাউজের ডিজাইনের জন্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। দুনিয়ার নানা দেশের শত শত আর্কিটেক্ট নিজেদের মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করা ডিজাইন জমা দেন সেই প্রতিযোগিতায় জমা দেন। বিজয়ী হন ডেনমার্কের স্থপতি ইয়র্ন উটজোন। তার নকশায় নির্মিত এই স্থাপনার কাজ শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। কিন্তু কাজ শুরুর পরও নানা সংকট লেগে থাকে। নানা প্রযুক্তিগত জটিলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে প্রকল্পটি বহুবার থমকে যায়। এমনকি উটজোন নিজেই মাঝপথে প্রকল্প ছেড়ে চলে ডেনমার্ক চলে যেতে বাধ্য হন। তবুও সব বাধা পেরিয়ে ১৯৭৩ সালে অপেরা হাউজের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। প্রায় ১৪ বছরের দীর্ঘ নির্মাণযাত্রা শেষে দাঁড়িয়ে ওঠে এই অপূর্ব স্থাপত্যওই বছরের ২০ অক্টোবর ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ আনুষ্ঠানিকভাবে সিডনি অপেরা উদ্বোধন করেন।
অপেরা হাউসের ভেতরে রয়েছে একাধিক পারফরম্যান্স হল, যার মধ্যে প্রধান কনসার্ট হলটিতে প্রায় ২ হাজার ৭০০ দর্শক বসতে পারেন। এছাড়া অপেরা থিয়েটার, ড্রামা থিয়েটার, স্টুডিও থিয়েটারসহ আরও কয়েকটি ছোট–বড় হল রয়েছে। এই অপেরা হাউজে প্রতিবছর দেড় হাজারেরও বেশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীতানুষ্ঠান, নাটক, অপেরা ও নৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পরিবেশিত হয় চোখধাঁধানো নানা আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা এখানে এসে পারফর্ম করেন। স্থাপত্যিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে ২০০৭ সালে ইউনেস্কো এই ভবনটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রই নয়, অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক পরিচয়ের লোভনীয় মডেল।
প্রায় ১৮৩ মিটার দীর্ঘ এবং ১২০ মিটার প্রশস্ত এই ভবনের বাইরের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে এর বিখ্যাত ‘শেল’ আকৃতির ছাদ। প্রায় দশ লাখ সাদা টাইলসে মোড়ানো এই কাঠামো সূর্যের আলোয় একরকম ঝলমলে, আবার সন্ধ্যার অন্ধকারে নরম আলোয় রহস্যময়। কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি টাইলস আলাদা আলাদা করে বসানো। দশ লক্ষাধিক টাইলস দিয়ে তৈরি এই ছাদ যেন নিখুঁত জ্যামিতির এক চমৎকার উদাহরণ। সমুদ্রের নীল জল আর আকাশের রঙের সঙ্গে মিলেমিশে এটি এমন এক দৃশ্য তৈরি করে, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিডনি হারবার ব্রিজ যেনো এক অপরূপার রূপমুগ্ধ পাহারাদার!
আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম বিখ্যাত অপেরা হাউজের দিকে। সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে গেলাম, প্রবেশ করলাম ভিতরে। একটির পর একটি হল ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কী সুন্দর এবং নান্দনিক আয়োজন অপেরা হাউজের পরতে পরতে! সবচেয়ে বড় কনসার্ট হলটিতে ঢুকলাম। চেয়ারে বসে অনুষ্ঠান উপভোগের আমেজ অনুভবের চেষ্টা করলাম। কাঠের প্যানেলে মোড়ানো দেয়ালগুলো শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং নিখুঁত অ্যাকুস্টিকসের জন্য ডিজাইন করা। মৃদু শব্দও এখানে প্রতিধ্বনিত হয়ে এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা তৈরি করে। যে অভিজ্ঞতা শুধু অনুভবের, ভাষায় প্রকাশের নয়।
নানা কিছু দেখে আমরা বাইরে বেরিয়ে আসলাম। শীতের পাখি হিসেবে আমাদের দেশে আসা বড় বড় হাসগুলো অপেরা হাউজের চত্বরে, পাশের রেলিংয়ে আয়েশি ঘুরঘুর করছিলো। আমি মুগ্ধ হয়ে ভবনটি দেখছিলাম, যেনো কোন শিল্পী তার কল্পনার সব রঙ মিশিয়ে অপেরা হাউজটির ডিজাইন করেছেন। সাগরের বুক থেকে যেনো হঠাৎ করে জেগে উঠেছে একটি বড় নৌকা, সমুদ্রের ঢেউ থেকে যেন জন্ম নিয়েছে অপরূপ এক স্থাপত্য। সাদা পালকের মতো ছড়িয়ে থাকা ছাদগুলো যেন যাত্রাপথে থাকা নৌকার সারি। মনে হচ্ছিলো যে হাঁসগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন এক ঝাঁক রাজহাঁস যেনো শান্ত জলে ভেসে আছে। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।














