দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ১ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:২৪ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। চমৎকার আবহাওয়া, দুর্দান্ত পরিবেশ। সিডনি শহরের রাজপথ ধরে ছুটছে আমাদের বাস। ভিতরে আমরা ত্রিশ জনের মতো লায়ন সদস্য। আমাদের ট্যুর অপারেটরের নের্তৃত্বে সিডনির দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে বের হয়েছি আমরা। সকালে বৃষ্টি থাকলেও এখন সোনাঝরা রোদ আমাদের মন মেজাজ ফুরফুরে করে দিচ্ছে।

ঢাকার লায়ন সদস্যদের পাশাপাশি চট্টগ্রামের আমরা চারজন লায়ন সদস্য এই ট্যুর গ্রুপে যুক্ত রয়েছি। কিন্তু আমাদের মাঝে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের কোন বিভাজন ছিল না। আমরা সকলেই লায়নিজমে বিশ্বাসী, একই সংগঠনের পতাকাতলে মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি। লায়নিজমে ফেলোশিপ একটি বড় ব্যাপার। আর এই ধরনের সম্মেলনে সেই ফেলোশিপের চর্চা হয় সবথেকে বেশি। লায়নিজমের মন্ত্রে উজ্জীবিত মানুষগুলোর পরস্পরের প্রতি মমত্ব অন্যরকম। এখানে কে ঢাকার কে রাজশাহীর কিংবা কে চট্টগ্রামের তা নিয়ে মাথা ঘামানো হয় না। বার্ষিক কনফারেন্স শেষ করে সবাই নিজেদের মতো করে একটু বেড়িয়ে নেন, একটু শানিত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। কোন বাধ্যবাধকতা না থাকলেও এটিই যেনো অলিখিত নিয়ম, লায়ন সদস্যরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন উপলক্ষে যে দেশেই যান না কেন, সম্মেলন শেষে সেখানে বা ধারে কাছের অন্য কোন দেশে নিজেদের মতো কয়েকদিন বেড়িয়ে তবেই দেশে ফিরেন। মেলবোর্নে কনভেনশন শেষে এখন আমরা কেবলই ঘুরছি,ওড়ে ওড়ে বেড়াচ্ছি!

ট্যুর অপারেটর বললেন, আজ সারাদিন আমরা অনেক কিছু দেখবো। এখন আমরা সিডনি হারবারে ক্রুজ করবো। জাহাজে সবাই সাবধানে চলাচল করবেন। ছবি তুলতে গিয়ে কোন ঝুঁকি নেবেন না। মনে রাখবেন, একজনের বিপদ মানে ত্রিশজনের ভোগান্তি। ট্যুর অপারেটরের শেষ কথাটি আমার খুবই মনে ধরলো, আসলেই একজনের বিপদ মানেই ত্রিশজনের ভোগান্তি। তিনি সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে পথ চলার অনুরোধ করলেন।

সিডনি হারবারে ক্রুজের কথা শুনে আমি পুলকিত হলাম। এই ক্রুজের কথা এতো শুনেছি, এতোই বর্ণিল সব ছবি বিভিন্ন সময় দেখেছি যে, মন হাহাকার করতো। আজ সিডনি হারবারের নীল জলের বুক চিরে বহুল প্রত্যাশিত সেই সৌন্দর্য উপভোগ করবো! আমার মনটি অতিমাত্রায় ভালো হয়ে যাচ্ছিলো। সফরসঙ্গী লায়ন ফজলে করিম ভাই, ডালিয়া ভাবী এবং বিজয় দাকে বেশি উচ্ছ্বসিত দেখা গেলো। উচ্ছ্বসিত দেখা গেলো আমাদের অপরাপর সঙ্গীদেরও।

আমরা সার্কুলার কীতে পৌঁছে গেলাম। কেউ কেউ স্থানটিকে সার্কুলার কুয়েও বলে থাকেন। এখান থেকেই সব ক্রুজ সিডনি হারবারে যাত্রা করে, ক্রুজ শেষে আবারো নামিয়ে দেয়। এই সার্কুলার কুয়ে মুলত জাহাজের টার্মিনাল। শত শত ক্রুজিং ইয়ট, নৌযান। শহরের প্রাণকেন্দ্রের এই সার্কুলার কুয়ের একেবারে কাছেই নাকি বিখ্যাত সিডনি অপেরা হাউজ, সিডনি হারবার ব্রিজসহ বহু দর্শনীয় স্থাপনা। আমরা ক্রুজ শেষ করে এসে অন্যান্য স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখবো বলে জানালেন ট্যুর অপারেটর।

সার্কুলার কুয়ের নির্দিষ্ট বাস স্টেশনে আমাদেরকে নামিয়ে বাস থেকে নামিয়ে দেয়া হলো। অনলাইনে আমাদের ক্রুজের টিকেট করা আছে। এখন গিয়ে নির্দিষ্ট জাহাজটিতে চড়ে বসলেই হবে। কিন্তু বাস থেকে নামার পর আমাদের সকলেরই ভিমরি খাওয়ার উপক্রম হলো। এতো মানুষ! গিজগিজ করছে। অসংখ্য ঘাট, সাগরে ভাসছে সারি সারি সাদা রঙের ক্রুজ জাহাজ। আমাদের জাহাজ যে কোনটি কে জানে! কোন ঘাট থেকে যে আমাদের নির্দিষ্ট জাহাজটি ছাড়বে ঠাহর করা কঠিন হয়ে গেলো। আমাদের ট্যুর অপারেটর ছুটতে শুরু করেছেন, পেছনে দৌঁড়াচ্ছি আমরা। জাহাজ ছাড়ার সময় হয়ে গেছে, অথচ জাহাজের ঘাটটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই জাহাজ ছেড়ে গেলে এই টিকেট আর ব্যবহার করা যাবে না। আমরা একটির পর একটি ঘাটে ঢুঁ মারছি, নাম মিলিয়ে দেখছি, ছুটছি। অবশেষে নির্দিষ্ট জাহাজের ঘাট পাওয়া গেলো। জাহাজটি ছাড়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাত্রীদের সকলেই উঠে গেছেন, আমরাই শেষযাত্রী।

দারুণ সুন্দরী এক তরুণী আমাদের টিকেট চেক করলেন, আমাদের সকলের হাতে একটি ব্যান্ড পরিয়ে দিলেন এবং দ্রুত জাহাজে চড়ার তাড়া দিলেন। আমাদের সকলেরই বোর্ডিং হয়ে গেলো। তরুণী যতটুকুই না সুন্দরী, তার থেকে ঢের বেশি রাগী বলে আমার মনে হচ্ছিলো। অবশ্য, এতো ব্যস্ততার মাঝে চেহারা মোলায়েম করে রাখাও বেশ কঠিন!

আমরা একে একে সবাই ছোট আকৃতির জাহাজটিতে চড়ে বসলাম। দারুণ সুন্দর একটি ইয়ট টাইপের নৌযান। সবমিলে শ’ দুয়েক যাত্রী। তবে সবার মাঝে একটি উৎসবের আবহ। কেউ ক্যামেরা হাতে, কেউবা কফির কাপ হাতে নিয়ে জাহাজে চড়েছেন। কিছুক্ষণ ভিতরে থেকে আমরা ধীরে ধীরে ডেকে চলে গেলাম। সাগরের নোনতা বাতাস গা ছুঁয়ে যাচ্ছিলো।

দূরে সাদা পালতোলা নৌকার মতো ভেসে আছে সিডনি অপেরা হাউজ, আর তার বিপরীতে ধনুকের মতো বাঁকানো সিডনি হারবার ব্রিজ। স্থাপনা দুইটি দেখে আমি রোমাঞ্চিত হলাম। আমি বেশ টের পাচ্ছিলাম যে, আমার শরীর মনজুড়ে অন্যরকমের একটি অনুভূতি খেলা করছিল। ডেক থেকে চারদিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, সিডনিকে দেখার সবচেয়ে সুন্দর উপায় বোধহয় এটাই, হারবার ক্রুজ।

আমাদের ক্রুজটি ঘাট থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো। সার্কুলার কুয়ের ভীষণ ব্যস্ততা পেছনে ফেলে ক্রুজটি এগিয়ে চললো। আমাদের চোখের সামনে খলখল করে উঠলো বিশাল নীল জলরাশি, সিডনি হারবার, সিডনি উপসাগর। ডান পাশে বিখ্যাত অপেরা হাউজ ক্রমেই কাছে আসতে লাগলো। এর সাদা শেলস্ট্রাকচারগুলো সূর্যের আলোয় চকচক করছে, যেন পানির ওপর ভাসমান এক অনন্য শিল্পকর্ম। আর অন্যদিকে আকাশ ছুঁতে চাওয়া ইস্পাতের ধনুকের মতো সিডনি হারবার ব্রিজ আমার চোখে ঘোরের সৃষ্টি করলো।

আমাদের ক্রুজের ক্যাপ্টেন নিজের কি যেনো একটি নাম বললেন। তিনি আমাদের সকলকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, আমরা সার্কুলার কুয়ে থেকে যাত্রা করেছি। আমরা অপেরা হাউজ ঘেঁষে হারবার ব্রিজের নিচ দিয়ে লুনা পার্ক হয়ে ডার্লিং হারবার হয়ে ওয়ার্টসন বে হয়ে ফিরতি পথে সার্কুলার কুয়েতে চলে আসবো। আমাদের এই যাত্রায় দেড় ঘন্টার মতো সময় লাগবে বলেও তিনি জানালেন। ক্যাপ্টেন আমাদের সবার ভ্রমণ যাতে আনন্দময় হয় সেই কামনা করে মাইক বন্ধ করলেন।

হারবারের নীল পানির ওপর সূর্যের আলো চিকচিক করছে। আরো অনেকগুলো ক্রুজ, দূরে দূরে ছোট ছোট নৌকা। পালতোলা ইয়ট আর ফেরি চলাচল করছে। সমুদ্রের ঢেউ আমাদের জাহাজের গায়ে ধাক্কা দিয়ে এক ধরনের ছন্দ তৈরি করছে। জাহাজের পেছনে পানির সেই কী উচ্ছ্বাস! খেয়াল করে দেখলাম যে, শুধু আমার চোখে ঘোর লাগেনি, ঘোর লেগেছে সকলের চোখে মুখে। ডেকের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের চোখে কী অপরূপ মুগ্ধতা, বিস্ময়। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ অপেরা হাউজ ব্যাকগ্রাউন্ডে নিয়ে সেলফি তুলছেন। আবার কেউ কেউ নিরবে দাঁড়িয়ে থেকে স্রষ্টার এক অপরূপ সৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যে জাহাজ এগিয়ে গেল অপেরা হাউসের দিকে। জাহাজ থেকে অপেরা হাউজকে অনন্য লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো কোন রহস্যময় স্থাপত্য। সাদা টাইলসের উপর সূর্যের আলো ঝলমল করছে। কী দারুন স্থাপত্য!

আমাদের ক্রুজ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলো হারবার ব্রিজের দিকে। বিশাল ইস্পাতের এই সেতু যেনো আকাশ ছুঁবে। বিখ্যাত এই ব্রিজটি সিডনির উত্তর ও দক্ষিণ তীরকে যুক্ত করেছে। বহু বছর ধরে সেতুটি সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এটি কেবল যোগাযোগই রক্ষা করছে না, সিডনির পর্যটন খাতকেও যেনো ভিন্ন এক উচ্চতায় ধরে রেখেছে।

জাহাজ যখন সেতুর নিচ দিয়ে যায়, তখন মাথার ওপর বিশাল কাঠামো যেন আকাশ ঢেকে দেয়। মুহূর্তটির মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি খেলে যায় শরীর মনে। দূর থেকে এটিকে যত বড় মনে হয়, আসলে এটি তার থেকে ঢের বেশি বড়, বিশাল। কত বছর আগের স্থাপনা, কী দুর্দান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং। হাজার হাজার টন স্টিল, অথচ কি শক্তপোক্তভাবেই না হারবারের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে!

ব্রিজ নিয়ে অনেকেই ছবি তুলতে ব্যস্ত। আমরা কয়েকটি ছবি তুলে খোলা চোখে ব্রিজটিকে ভালোভাবে দেখে নিচ্ছিলাম। যেনো জীবনের সেরা এবং মিষ্টি স্মৃতি হিসেবে এই হারবার ক্রুজ আমার অন্তরে অক্ষয় হয়ে থাকে।

ক্রুজ সামনে এগোতেই দেখা যায় ছোট্ট একটি দ্বীপ দুর্গ. ফোর্ট ডেনিসন। একসময় এটি ছিল উপনিবেশিক আমলের কারাগার ও প্রতিরক্ষা ঘাঁটি। এখন এটি সিডনি হারবারের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন।

আমি মুগ্ধ হয়ে দুর্গ দেখছিলাম। উপনিবেশিক আমলে এটির জৌলুশ কেমন ছিল সেটি অনুভূবের চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ কিছুটা দূরে দারুণ সবুজে ঘেরা একটি উদ্যানের মতো দেখা গেলো। এটিই রয়েল বোটানিক গার্ডেন। বিশাল ওই উদ্যানটিকে শহরের মাঝখানে এক টুকরো সবুজ শান্তির দ্বীপের মতো লাগছিল। গাছপালার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছিলো সিডনির সুউচ্চ ভবন। সেগুলো যেনো আলোর ঝলকানির মতো আমার অন্তরে দোলা দিয়ে হঠাৎ হঠাৎ হারিয়ে যাচ্ছিলো। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপঞ্চাশে জীবন: নিজেকে যত্নে রাখার সময়
পরবর্তী নিবন্ধস্মরণ : শিক্ষাবিদ প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ