আমাদের বাস চলছিল। আমরা সিডনি শহরের ডে ট্যুর করছি। অর্থাৎ শহরের নানা দর্শনীয় স্থান আমাদের ঘুরিয়ে দেখানো হচ্ছে। বিশ্বখ্যাত সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড পরিদর্শন করতে নিয়ে আসা হয়েছে আমাদের। খেলাধুলার সাথে তেমন কোন সম্পর্ক না থাকলেও কোথাও গেলে স্টেডিয়াম দেখতে আমার ভালো লাগে। বিশেষ করে ক্রিকেট স্টেডিয়াম। সেটা হোক শারজাহ, হোক লর্ডস কিংবা মেলবোর্ন! যদি কোন শহরে যাওয়ার সুযোগ হয় এবং সেই শহরের স্টেডিয়াম যদি আমাদের ক্রিকেটের সাথে সম্পর্কিত হয় তাহলে আমার কেন জানি খুবই ভালো লাগে। মনে হয়, আমাদর দেশের সোনার ছেলেরা এই স্টেডিয়ামে খেলে গেছে, এখানেই তারা আমাদের পতাকা ওড়িয়েছে, আমাদের জাতীয় সংগীত গেয়েছে।
সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সমৃদ্ধ স্মৃতি রয়েছে। এই স্টেডিয়ামে আমাদের সোনার ছেলেরা অনেকগুলো ম্যাচ খেলেছে। তাই এমন একটি দর্শনীয় স্থান দেখাতে নিয়ে আসায় ট্যুর অপারেটরকে ধন্যবাদ দিলাম। বাস থেকে নেমে বৃষ্টির তাড়ায় অনেকটা দৌড়ে স্টেডিয়ামের লবিতে ঢুকেছিলাম। কিন্তু ঘুরে টুরে বের হওয়ার পর আচমকা চমকে উঠার মতো একটি ব্যাপার ঘটলো। আকাশের চেহারা যেনো চোখের সামনে দ্রুত পাল্টাতে শুরু করলো। মাথার উপরে সূর্য, স্বচ্ছ নীল আকাশ। আর নীলাম্বরী পরিহিত আকাশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ওড়ে ওড়ে যাচ্ছে সাদা সাদা মেঘ। আমি মুগ্ধ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম! ছবির মতো সুন্দর হয়ে উঠলো সিডনির আকাশ, চারপাশ। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না যে, একটু আগেও বৃষ্টির জন্য যে শহরে বাস থেকে নামতে পারি নি, মাত্র আধা ঘন্টার মধ্যে এমন কোন সোনার কাঠির স্পর্শে সেই শহর কিশোরী মেয়ের মতো কলকলিয়ে উঠলো!
আমাদের সাথে কোন কিশোরী মেয়ে না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের শিক্ষিকাসহ কয়েকজন লায়ন সদস্যা ছিলেন। ছিলেন স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিখ্যাত কিছু বুড়ো মানুষও। সিডনির পরিবর্তিত আবজে আমাদের কলেজ– বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাডামগুলোর উচ্ছ্বাস যেনো বাঁধ ভাঙ্গতে শুরু করলো। মন ভালো হয়ে গেলো, ডালিয়া ভাবীরও। লায়ন ফজলে করিম ভাইয়ের স্ত্রী ডালিয়া ভাবী সকাল থেকে বেশ মন খারাপ করে ছিলেন। বৃষ্টির মধ্যে কোন শহরে আসলে বেড়ানো যায় না। হাত পা নাড়িয়ে একটা জায়গা ঘুরে ফিরে দেখার যে আনন্দ, বৃষ্টির মধ্যে তা কোনভাবেই সম্ভব হয় না। বিজয় দাকে মোবাইল এগিয়ে দিয়ে রোদ্রোজ্জ্বল সিডনির বিখ্যাত ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কয়েকটি ছবি তুলে দেয়ার অনুরোধ করলাম।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই ক্রিকেট গ্রাউন্ডে রয়েছে বিশ্বের বহু কিংবদন্তি খেলোয়াড়ের ব্যাট বলের স্মৃতি, ব্যক্তিগত অর্জনের সুন্দর এবং স্মরণীয় মুহূর্ত।
সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম ক্রিকেট খেলা শুরু হয় ১৮৪৮ সালে। ১৭৮ বছর বছর আগে। সেই সময় ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে, আর সেই যাত্রার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড।
স্যুভেনির ঘেঁটে এবং গুগল থেকে যা তথ্য পাওয়া গেলো তাতে বলা হচ্ছে যে, প্রায় দুইশ’ বছর আগে যখন এই মাঠে খেলা শুরু হয় তখন এটি ছিল অনেক সরল একটি মাঠ। চারদিকে কাঠের গ্যালারি, মাঝখানে সবুজ ঘাসের উইকেট, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি আধুনিক রূপ পেতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে তৈরি হয় বিশাল গ্যালারি, আধুনিক প্যাভিলিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা।
আজ এটি বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে স্বীকৃত।
স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকলেই প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো মাঠের সবুজ কার্পেটের মতো ঘাস। নিখুঁতভাবে ছাঁটা আউটফিল্ড যেন একটি বিশাল সবুজ চাদরের মতো বিস্তৃত। মাঠের মাঝখানে ২২ গজের উইকেট, যেখানে অসংখ্য ঐতিহাসিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান ও বোলাররা এখানে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। আমাদের ক্রিকেটারেরাও এখানে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে আমাদের গৌরবান্বিত করেছে, মুগ্ধ করেছে। আমরা টিভি সেটের সামনে বসেও এই সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড দেখেছে, আবেগে ভেসেছি!
ভিতরে চারদিকে উঁচু গ্যালারিগুলো আধুনিক নকশায় তৈরি হলেও কিছু অংশে এখনও ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে। বিশেষ করে পুরনো প্যাভিলিয়নটি স্টেডিয়ামের সমৃদ্ধ অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্যাভিলিয়নের বারান্দা থেকে পুরো মাঠের দৃশ্য অসাধারণ লাগে। আমার ভাবতে বেশ ভালো লাগছিলো যে, এখানে বসে এক সময় অনেক কিংবদন্তি ক্রিকেটার ম্যাচ উপভোগ করেছেন।
নতুন গ্যালারিগুলোতে আধুনিক সুযোগ–সুবিধা রয়েছ্তেআরামদায়ক আসন, খাবারের ব্যবস্থা এবং বড় স্ক্রিনে ম্যাচ দেখার সুবিধা।
আমাদের মতো আরো অনেকেই ক্রিকেট গ্রাউন্ড পরিদর্শন করতে এসেছেন। মাঠে কোন খেলা চলছিল না। আমি বেশ কিছুক্ষণ গ্যালরীতে বসেছিলাম, কল্পনায় দেখেছিলাম বাংলাদেশ–অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট ম্যাচ!
স্টেডিয়াম থেকে বের হওয়ার পর চমৎকার আবহ আমাদের সকলেরই মন ভালো করে দিলো। ইউরোপের আবহাওয়া ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায় বলে জানি, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া কী ইউরোপের মতো। এই রোদ, এই বৃষ্টি!
স্টেডিয়ামের চারপাশে খোলা সবুজ এলাকা ও গাছপালা। সিডনির মতো বিশ্বমানের একটি শহরের প্রাণকেন্দ্রের ব্যস্ততার মাঝেও এমন প্রশান্ত পরিবেশ মন ছুঁয়ে দিলো।
তথ্য এবং ম্যাপ ঘেঁটে দেখলাম যে, স্টেডিয়ামের পাশেই মুর পার্ক, সিডনির অন্যতম বড় সবুজ পার্ক। এই পার্কের গাছপালা ও খোলা মাঠ স্টেডিয়ামের পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলেছে। চারদিকে এতো এত্তো সবুজ যে মন এবং চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছিলো।
স্টেডিয়ামের বাইরে ক্রিকেট কিংবদন্তিদের স্মরণে বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান–এর ভাস্কর্য। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানকে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন হিসেবে ধরা হয়। তার স্মৃতিকে সম্মান জানাতে স্টেডিয়ামের সামনে তার মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।
আরও রয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট ইতিহাসের আরেক মহান ক্রিকেটার রিচি বেনো এর ভাস্কর্য। তিনি শুধু একজন সফল ক্রিকেটারই ছিলেন না, বরং একজন জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার হিসেবেও বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন। গুনী মানুষদের এভাবে সম্মানিত করায় ভালো লাগলো। আমরা ভাস্কর্ষগুলো সাথে নিয়ে ছবি তুললাম।
প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড বিশ্বের ক্রিকেট সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ, জন্ম নিয়েছে অনেক রেকর্ড, আর গড়ে উঠেছেন বহু কিংবদন্তি ক্রিকেটার। গ্রাউন্ডটির পরতে পরতে রয়েছে ক্রিকেটের ইতিহাস, আবেগ এবং ঐতিহ্য। আমি ক্রিকেট ভালো না বুঝেও সেই আবেগের আঁচ পাচ্ছিলাম।
সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড থেকে বের হয়ে আমরা বাসে চড়লাম। সামনের দিকে এগুতে লাগলো আমাদের বাস। সারাদিনের জন্য বাসটি ভাড়া করা, সুতরাং আমাদেরকে কোন একটি দর্শনীয় স্পর্টে নামিয়ে দিয়ে বাসটি অদৃশ্য হবে, সময়মতো আবারো সামনে এসে দাঁড়াবে। একজন মাত্র চালক, তার আর কোন সহকারী নেই। তিনি একাই সবকিছু সামলে নিচ্ছিলেন।
স্টেডিয়াম থেকে বের হওয়ার পর আমাদের ট্যুর অপারেটরের ফোন পেয়ে চালক সাহেব হাজির হয়েছেন বাস নিয়ে। আমরা বাসে ওঠার পর চালানো শুরু করেছেন। বয়স্ক চালক কারো সাথে তেমন কোন আলাপ করেন না, নিজের মতো কেবলই স্টিয়ারিং ঘোরান। আমাদের কোথায় নেয়া হচ্ছে এখনো জানি না, তবে যেখানেই যাই না কেনো ভালো কিছু যে হবে তা যেনো স্বচ্ছ নীল আকাশই আগাম বলে দিচ্ছে। (চলবে)
লেখকঃ চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












