(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম শহরগুলোর একটি সিডনি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আধুনিক স্থাপত্য এবং সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রাণবন্ত এক শহর। লোভনীয় এক অনন্য নগরজীবন শহরটির পরতে পরতে। বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন শহর হিসেবেও পরিচিত সিডনি। এই নগরী প্রতিবছর লাখো পর্যটককে আপন করে, কাছে টানে। এই যে আমরা চায়না টাউনে ঘুরছি, এখানেও প্রচুর পর্যটক। শত শত নারী পুরুষ। এরা কেউ এসেছেন চীন থেকে, কেউবা ইউরোপ–আমেরিকা থেকে। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের পর্যটকও আছেন, তবে সংখ্যায় কম। চায়না টাউনের বিকিকিনিকে ঘিরে যেনো মহাবিশ্বের মহামিলনমেলা বসে গেছে! কত দেশের কত রঙের কত ধরনের মানুষ যে উৎসবের আমেজে ঘুরছেন!
আমরা নানা জিনিসপত্র দেখছিলাম। কিন্তু কেনাকাটা থেকে খুব যত্নের সাথে দূরে থাকলাম। কারণ কোথায় থেকে কোথায় যাবো তার কোন ইয়ত্তা নেই। এখন এসব জিনিসপত্র কিনে লাগেজ ভারি করলে আখেরে নিজেরই ভোগান্তি হবে! ঘুরতে ঘুরতে কিছুটা কাহিল এবং ক্ষুধার্থ মনে হলো। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে ট্যুর অপারেটরের ডিনারে যাবো না, এখানেই কিছু একটা খেয়ে হোটেলে ফিরে যাবো। লায়ন ফজলে করিম ভাই থাকাতে চীনাদের সাথে খাওয়া দাওয়ার ব্যাপার সামলাতে আমাদের কোন সমস্যা হয় না। তিনি চীনা ভাষায় তাদেরকে বুঝিয়ে বলেন। খাবারের অর্ডার দেন। অতএব আমরা নিশ্চিন্তে সেই খাবার খেতে পারি। আমরা একটি চীনা রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। লায়ন ফজলে করিম ভাই অর্ডার করলেন। চীনা তরুণী বেশ সুন্দরভাবে আমাদের অর্ডার নিলেন। লায়ন বিজয় শেখর দা’ও কি কি সব খাবারের অর্ডার করলেন। এতো এতো খাবার কী খাওয়া যাবে! ইতোমধ্যে আমরা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লিখে দিয়েছি যে, আমরা ডিনার করবো না।
নানা ধরনের ভেজিটেবল আইটেম দিয়ে আমাদের খাওয়া দাওয়া শুরু হলো। চীনাদের স্টাইলই এমন, লাঞ্চ ডিনারে একটির পর একটি খাবার আসতে থাকে। যেটি আসবে সেটি খেতে থাকেন, পরেরটি আসার জন্য অপেক্ষার দরকার নেই। ভাত আসবে সবার শেষে। টেবিলের দিকে তাকিয়ে আমার মন ভরে গেলো। কোন মাংসের আইটেম নেই, সবই মনে হচ্ছে সবজি, দুইটি মাছ। সবজির যে এতো এত্তো আয়োজন থাকতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। স্যুপ ছাড়াও নানা সবজির গ্রিল, সেদ্ধ, ভাজা, কচকচে, মচমচে, ঝাল, টক, মিষ্টি– কী নেই সবজি দিয়ে তৈরি খাবারের ভান্ডারে! বেগুনের গ্রিল, কাঁচামরিচের গ্রিল, আস্ত মাছের গ্রিল!!! একেকটি খাবার একেকরকম। কিন্তু দুর্দান্ত টেস্ট। হংকংয়ের ভিসা পাওয়ায় আমার মন এমনিতেই ফুরফুরে, এরমধ্যে চমৎকার সব খাবার–দাবার আমার মনকে যেনো উস্কে উস্কে দিচ্ছিলো।
বেশ রাত অব্দি চায়না টাউনে ঘোরাঘুরি এবং খাওয়া দাওয়া করে হেঁটেই হোটেলে ফিরে আসি আমরা। অবশ্য, ফেরার পথে একবার পথ ভুল করে অন্যদিকে চলে গিয়েছিলাম। পরে জিপিএস ধরে হোটেল খুঁজে পেয়েছি। মরার এমন দেশ– রাস্তায় একটা পুলিশও নেই যে পথের হদিশ করবো! পথচারীদের সিংগভাগই পর্যটক, তাদের অধিকাংশেরই শহরের পথঘাট সম্পর্কে ধারণা নেই। তারাও আমাদের মতো হারায়, আবার নিজেরে নিজেই উদ্ধার করে।
আমি খুব খেয়াল করে দেখলাম যে, প্রযুক্তি শুধু অনলাইনে ভিসাই এনে দেয় না, হারিয়ে গেলে পথও দেখায়! জীবনে লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম। তবে কে কিভাবে ব্যবহার করছি বা কতটুকু ব্যবহার করছি তার উপরই পুরো ব্যাপারটি নির্ভর করে। তথ্য প্রযুক্তির এমন বিকাশ যদি না হতো, তাহলে এভাবে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এসে কাউকে জিজ্ঞেস না করে একা একা পথ চলা কি সম্ভব হতো! কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় হাওয়া খেতে খেতে হংকংয়ের ভিসা!!
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ম্যাসেজ দেয়া হয়েছে যে, নাস্তা সকাল ৮টার মধ্যে শেষ করতে হবে, হোটেলের নিচে সিটি ট্যুরের বাস থাকবে, সাড়ে ৮টায় ছেড়ে যাবে।’ অতএব তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হবে। তথ্য প্রযুক্তি না থাকলে আমাদের ঢাকা–চট্টগ্রামের ত্রিশজনকে এক কাতারে সামিল করতে ট্যুর অপারেটরের কেয়ামত হয়ে যেতো। এখন এক ম্যাসেজে আমরা সকলেই লাইনে ঢুকে যাচ্ছি। আগে প্রতিটি রুমে আলাদা আলাদাভাবে যেতে হতো, অথবা ফোন করতে হতো। এখন দুই লাইনের এক ম্যাসেজে সব সমস্যার সমাধান! অতএব, আমাদেরকে সকাল সাড়ে ৮টায় বাসে চড়তে হবে!
রুমে ঢুকে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। রাতে যখনি ফিরি এক মগ কফি নেয়ার জন্য মন আনচান করে। তবে আজ আর কফি নিলাম না। শুয়ে পড়লাম। সকালে আর্লি জাগতে হবে, বাস ধরতে হবে। নানা স্পটে নামতে হবে, হাঁটতে হবে, ঘুরতে হবে। সিটি ট্যুর আনন্দের, তবে কষ্টেরও। নানা পয়েন্টে হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ব্যথা হয়ে যায়। পাহাড় টাহাড় থাকলেও খবর হয়ে যাবে!
বিছানায় পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে গেলেন বিজয় দা। আমি এপাশ ওপাশ করছিলাম। উল্টো ভেড়া গুনছিলাম, মেঘের রাজ্যে পাখি গুনছিলাম। একেবারে লো ভলিউমে স্লিপিং মিউজিক বাজাচ্ছিলাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিলো না। আসলে রাত জাগার যে অভ্যাস আজন্ম, তার থেকে কী এতো সহজে মুক্তি মিলে!
ফোন বেজে উঠলো। আমার বন্ধুর কন্যা ডা. নিশা ফোন দিয়েছে। সিডনি প্রবাসী নিশা তার বাসায় দাওয়াত দিয়েছে। কখন যেতে পারবো তা আমার জানানোর কথা ছিল। ভুলে গেছি। তাই বেচারি এতোরাতে আবারো ফোন করেছে। আহা, বিদেশ বিভুঁইয়ে এসব আন্তরিক দাওয়াত, এদিক–ওদিক ঘোরাঘুরি কিংবা খাওয়ানোর আবদারগুলো আমাকে আপ্লুত করে, ভিজিয়ে দেয়। নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে হয়! পৃথিবীর দেশে দেশে কত জাতের কত পাতে যে আমার রিজিক ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল তা আমাকে ভাবায়, বিনীত করে! দুনিয়াতে কত মানুষ একবেলা খাবার পাচ্ছেন না, এক মুঠো ভাতের অভাবে অসংখ্য শিশু–কিশোরসহ কোটি কোটি মানুষ না খেয়ে ঘুমাতে যান, অনাহারে অর্ধাহারে থাকেন কত মানবসন্তান। সেই নির্মম পৃথিবীতে আমাকে একবেলা খাওয়ানোর জন্য ডা. নিশা যেভাবে লেগে আছে সেই আন্তরিকতার কি কোন তুলনা চলে! নিজের পকেটের টাকা খরচ করে যখন একবেলা খাওয়ানোর জন্য মানুষ এমন করে তখন বিশ্বাস করতে হবে, সেই সম্পর্কে স্বার্থের নয়, আত্মার। সেই সম্পর্ক রক্তের না হলেও সেটাই আত্মীয়তা!
‘বল– মা’, ফোন ধরলাম। নিশা বললো, ‘আংকেল, কাল সন্ধ্যার পর আপনার হোটেল থেকে আমার একজন আত্মীয় আপনাকে তুলে নেবে। রাতে আমরা আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দেবো। কালই আসবেন আংকেল।’ মেয়েটি এমন আদুরে গলায় ডাকলো যে, আমার নিজের মেয়েগুলোর জন্য অন্তর হু হু করে উঠলো। নিশাকে বললাম, ‘আচ্ছা মা, ফোনে যোগাযোগ করে ভদ্রলোককে আসতে বলিও।’
ঘুম থেকে জেগে খুব দ্রুত নাস্তা শেষ করলাম। সাড়ে ৮টার আগেই আমরা চারজন রিপোর্ট করলাম। চট্টগ্রামের চারজনকে নিয়ে ট্যুর অপারেটর বেজায় খুশী। সময়ের কোন এদিক–ওদিক নেই। কোন ঝামেলাতেও নেই। যেভাবে রাখেন ওভাবেই থাকি, যেভাবে খাওয়ান ওভাবেই খাই। কোন কিছুতেই কোন অভিযোগ নেই, কোন আবদার নেই। ট্যুর অপারেটর যতটুকু পারেন করেন, এর বাইরে কিছু করতে হলে আমরা নিজেরাই করে নিই।
আমাদের বাস যাত্রা শুরু করেছে। আমরা সিটি ট্যুরে যাচ্ছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ঘুরে ঘুরে শহরের সব দর্শনীয় স্থানগুলো দেখানো হবে। এটাই সিটি ট্যুর। তবে আজ ওয়েদার এতো বাজে লাগছে যে, মন খারাপ হয়ে গেলো। বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে বহু জায়গায় বাস থেকে নামা যাবে না। কোন কোন জায়গায় নামলেও ভিজে যাবো। ছবি ভালো হবে না। আকাশ যেনো মাথার উপর চলে এসেছে, মেঘে মেঘে পুরো আকাশ ঢেকে আছে!
ভীষণ মন খারাপ ভাব নিয়ে বসেছিলাম। বাস এগিয়ে চলছিলো। শহরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পর্যটন স্পটগুলো একটির পর একটি আমাদের দেখানো হবে। শুরুতে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কে জানে! ট্যুর অপারেটর বাসের মাইক নিয়ে বিভিন্ন পর্যটন স্পটের ব্যপারে নানা তথ্য দিয়ে থাকেন। তবে আজ এখনো তিনি মাইক হাতে নেন নি। বৃষ্টি দেখে ওনারও মন খারাপ কিনা কে জানে!
সিডনির পরিচয় বহন করে এমন বেশ কয়েকটি স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সিডনি হারবার ব্রিজ, সিডনি অপেরা হাউজ, ডার্লিং হারবার। ব্রিজ ও অপেরা তো ‘সিম্বল অফ সিডনি’ হয়ে উঠেছে। সিডনির আর কোনকিছু না দেখালেও এসব যে দেখাবে তা আমি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম। আমাদের গাড়ি চলছিল। বৃষ্টিভেজা পথ ধরে এগিয়ে চলছিলাম আমরা। (চলবে)।
লেখকঃ চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












