দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ৪ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সিডনি শহরে নরোম হাওয়ায় গা ভাসিয়ে হাঁটছিলাম। চায়না টাউন যেনো চীনেরই কোন প্রদেশ, চীনা পণ্যের সম্ভার। কাপড়চোপড় থেকে খেলনা পর্যন্ত নানা পন্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন চীনা তরুণী এবং মাঝবয়সী নারীরা। চীনের মতো চায়না টাউনেও নারীর জয়জয়কার! তারাই পণ্য বিক্রি করছেন, তারাই টাকাপয়সা বুঝে নিচ্ছেন, পণ্য প্যাকেট করে দিচ্ছেন। সবই একহাতে! জমজমাট বিকিকিনি চলছে। একটি উৎসবের আমেজ যেনো চারদিকে। আমাদের কেনাকাটার কিছু না থাকলেও এদিক ওদিক ঘুরছিলাম। চীনা পণ্যের পাশাপাশি চীনের মানুষগুলোকেও দেখছিলাম। কী পরিশ্রমী জাতি! দেখতে ছোটখাটো এবং নরোম মানুষগুলো যে কী পরিমাণ পরিশ্রম করতে পারেন তা বেশ কয়েকবার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। চীনা তরুণীরা দারুণ মিশুক, হাসিখুশীতে থাকার পাশাপাশি চারপাশকে জমিয়ে রাখতে এরা অভ্যস্ত। নারীদের এমন পরিশ্রমের সুফল ঘরে ঘরে পুরুষেরা উপভোগ করেন বলেও আমার মনে হয়। এখানে পুরুষদের তুলনায় নারীরা অনেক বেশি কাজ করেন, পরিশ্রম করেন।

আমার বন্ধু লায়ন ফজলে করিমের সাথে চীনের যোগাযোগ অনেক বেশি। আমরা তাকে হাফ চীনা বলে ডাকি। তিনি চীনের ভাষা বুঝেন, বলতে পারেন। আমি এবং বিজয় দা বেশ মজা পাচ্ছিলাম করিম ভাইয়ের কাজকারবার দেখে। তিনি চীনা নারীদের সাথে বেশ মজা করছিলেন। নানা পণ্যের দরদাম করছিলেন। অথচ, কিছুই কিনছিলেন না।

হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মধ্যে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ বুলুচ্ছিলাম। ফেসবুক এবং হোয়াটসঅ্যাপ দেখছিলাম। মেইল আসার নোটিফিকেশন আসলো, সারাদিনই আসে। ব্যাপারটিকে খুব একটা গুরুত্ব কখনো দিইনা। কিন্তু স্ক্রিনে মেইলটির সেন্ডারের নাম দেখে কৌতুহলী হলাম। মেইল খুলে আমার পরাণটি ভরে গেলো, অন্যরকমের এক আনন্দ এবং ভালোলাগায় আমি আচ্ছন্ন হতে শুরু করলাম। মন মেজাজ যে ফুরফুরে হয়ে উঠছে তাও বুঝতে পারছিলাম। আমি কিছু না বলেই করিম ভাই এবং বিজয় দাকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলাম। বললাম, ভিসা হয়ে গেছে! দুজনই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের চোখে মুখে প্রশ্ন। ভিসা? কিসের ভিসা? ভিসা নিয়েই তো অস্ট্রেলিয়ায় এসেছি। আমি মোবাইলে হংকংয়ের মেইলটি দুজনকেই দেখালাম। তারাও খুশী হলেন। তথ্যপ্রযুক্তির অপ্রত্যাশিত অগ্রযাত্রায় মুগ্ধ আমি। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! হংকং এয়ারপোর্টে বসে ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করেছিলাম, আমি অস্ট্রেলিয়ায়ায় বসে অনলাইনে হংকংয়ের ভিসা পেয়ে গেলাম! অস্ট্রেলিয়া থেকে হংকং হয়ে দেশে ফেরার পথে আমি অনায়াসে হংকং প্রবেশ করতে পারবো, যেতে পারবো আমার বন্ধুর কবরে। বিষয়টি আমার জন্য কতটুকু আবেগ এবং আনন্দের তা বলে বুঝানো অসম্ভব। তবে আমার সাথে থাকা দুই বন্ধুই ব্যাপারটি আঁচ করতে পারছিলেন। তারা দুজনই ইউছুপ আলী ভাইকে চিনতেন এবং একসাথে খাওয়া দাওয়া এবং আড্ডাও দিয়েছিলেন।

শুধু ভিসা পেলেই হবে না, হংকং প্রবেশ করতে হলে আমার টিকেটও রিরুট করতে হবে। আমার ফেরার টিকেট অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে হংকং হয়ে ঢাকা। সরাসরি ঢাকায় ফেরার টিকেট করা হয়েছিল, এখন সেটিকে পরিবর্তন করতে হবে। সিডনি থেকে হংকং পর্যন্ত ফ্লাইটের নির্দিষ্ট সিডিউল রেখে হংকংয়ে এক সপ্তাহ অবস্থান করে ঢাকার টিকেট করতে হবে। অর্থাৎ আমাকে হংকংঢাকা ফ্লাইটের টিকেট নতুন করে করতে হবে। হাঁটতে হাঁটতেই মোবাইলে ট্রাভেল এজেন্টকে বিষয়টি জানালাম। তিনি অল্পক্ষণের মধ্যে ফিরতি ফোনে জানালেন যে, বেশ ভালো পরিমাণে বাড়তি টাকা খরচ করতে হবে। একই রুট, একই দুরত্ব, তবুও আংশিক ফ্লাইট পরিবর্তন করায় এতোগুলো টাকা বাড়তি চার্জ করা হচ্ছে! বিষয়টি অমানবিক মনে হলেও কিছুই করার নেই, সহ্য করে নিতে হবে। অবশ্য, এই টাকা আমার বন্ধুর কবর জেয়ারতের সুযোগের কাছে কোন ব্যাপারই না। আমি হংকংয়ে এক সপ্তাহ থাকবো বলে জানিয়ে নতুন টিকেট করে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য ট্রাভেল এজেন্সির কর্মকর্তাকে অনুরোধ করলাম। আমি জানি যে, চায়না টাউনে হাঁটতে হাঁটতেই আমার নতুন টিকেট চলে আসবে! অনাগত দিনে তথ্য প্রযুক্তি কোন লেভেলে যে যাবে!

হংকং আমি আগে ঘুরেছি। ছোট্ট দেশ, বিপুল মানুষ। দুনিয়ার অন্যতম ব্যয়বহুল একটি শহর। দুইশ’ বর্গফুটের ফ্ল্যাট জীবনে প্রথম দেখেছিলাম হংকংয়ে। তিনশ’ স্কয়ার ফিটের বাসায়ও পুরো পরিবারকে থাকতে দেখেছি। খুবই ছোট তবে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত ফ্ল্যাটে মানুষ বসবাস করে। এক একটি এ্যাপার্টমেন্টে পাখীর বাসার মতো অসংখ্য ফ্ল্যাট। অবশ্য বিপরীতে আলীশান বাড়িঘর নিয়েও থাকেন বহু মানুষ। তবে সিংহভাগ মানুষেরই থাকা খাওয়ার জায়গার নিদারুণ সংকট হংকংয়ে। অনেকেই খুবই বাজেভাবেও বসবাস করেন। হংকংয়ে বন্ধুপত্নী, আমার শাহীন ভাবীকেও ভিসা হওয়ার বিষয়টি জানালাম। ভাবীকে অফিসের কাউকে দিয়ে সাত দিনের জন্য একটি হোটেলের ব্যবস্থা করারও অনুরোধ করলাম। ফেরার তারিখ এবং সময় জানিয়ে সম্ভব হলে কাউকে এয়ারপোর্টে পাঠানোর আবদারও করতে হলো। কারণ বিদেশে এয়ারপোর্টের বাইরে কেউ অপেক্ষা না করা অনেক কষ্টকর!

ইউছুপ আলী ভাই হংকংয়ের নাগরিক। পরিবার পরিজন নিয়ে দেশটিতে বসবাস করে আসছিলেন বহুবছর ধরে। সফল ব্যবসায়ী ইউছুপ আলী ভাই অত্যন্ত অভিজাত এলাকায় বিশাল এক ট্রিপলেক্স বাড়ি কিনে বসবাস করতেন। আমি প্রথমবার হংকং সফরকালে এই বাড়িতে থেকেই তার বিশাল গাড়ি নিয়ে হংকং চষে বেড়িয়েছিলাম। ইউছুপ আলী ভাই অসুস্থ থাকায় আমার সাথে খুব বেশি ঘুরতে পারেননি, তবে আমার ঘুরে বেড়ানোর আয়োজনে কোন কমতিও রাখেননি। বাড়তি পাওনা ছিল আমার অপর বন্ধু, প্রাইমারী স্কুল থেকে যার সাথে ঘনিষ্ঠতা, ক্লাসমেট স্বপন। সে আমাকে কয়েকদিনে হংকংয়ের নানা অঞ্চল ঘুরিয়ে কাহিল করে তুলেছিল।

হংকংয়ের সবকিছু আগে এতো ভালোভাবে দেখা হয়েছিল যে শুধু বেড়ানোর জন্য হংকং যাওয়ার কোন ইচ্ছে আমার হতো না। তবে এখানে জড়িয়ে রয়েছে আমার অন্যরকমের এক আবেগ। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোহাম্মদ ইউছুপ আলী, এই কলামের পাঠকের অনেকের কাছেই ইউছুপ আলী ভাই পরিচিত। তিনি শুধু আমার সাথে দেখা করার জন্য হংকং থেকে চীনে চলে গিয়েছিলেন। শুধু আমাদের সাথে দেখা করার জন্য হংকং থেকে চট্টগ্রামে চলে আসতেন। কয়েকদিন চুটিয়ে আড্ডা দিয়ে আবার হংকং ফিরে যেতেন।

আমাদের এই বন্ধুত্বে কোন চাওয়া পাওয়া ছিল না, চানাস্তার বিল হয় তিনি দেবেন, নাহয় আমি। কিংবা ব্যাংক ম্যানেজার আনোয়ার ভাই বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেলাল নিজামী। তবে হংকংয়ে আমার বন্ধুটি আমাকে পকেটে হাত দিতে দেননি, একাই খরচ করেছিলেন সব। আমার চীন সফরকালে তিনি হংকং থেকে চীনে ছুটে আসেন এবং আমাদের পুরো গ্রুপকেই লাঞ্চ করিয়ে তবে ছেড়েছিলেন। আমার বন্ধুটির সাথে সম্পর্কটি রক্তের ছিলো না, ছিলো আত্মার। তাই অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সময় ক্যাথেপ্যাসিফিকের ফ্লাইট হংকং বিমানবন্দরে যখন ৫ ঘন্টার লেঅভারে ছিল তখন আমার পরাণটি হাহাকার করছিল। করোনার সময় আমার বন্ধুটি মারা যান। তাকে শেষ দেখা হয়নি। জানাজায় শরিক হতে পারিনি, কবরে একমুঠো মাটি দেয়া হয়নি। আমার বন্ধুর জন্য অন্তরে হাহাকার করলেও করোনাকালে বন্ধুর লাশ দেশে যেমন নেয়া যায়নি, তেমনি দেশ থেকেও কেউ হংকং যেতে পারেনি। সেই তখন থেকে হংকং গিয়ে বন্ধুর কবর জেয়ারত করে আসার একটি ইচ্ছে আমাকে তাড়িয়ে মারছিল। হংকং এয়ারপোর্টে বসে আছি, মাত্র কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে শুয়ে আছেন আমার বন্ধু। তাকে না দেখেই অস্ট্রেলিয়ার ফ্লাইট ধরতে হয়েছিল আমাকে। এখন হংকংয়ের ভিসা পাওয়ার পর বাড়তি বিমান ভাড়ার ভয়ে সুযোগটি হাতছাড়া করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাই নতুন টিকেট করার নির্দেশনা দিয়ে নিজেকে অনেক বেশি ভারমুক্ত মনে হচ্ছিলো।

আমরা যখন চায়না টাউনে ঘুরছি তখন ফোন করলো আমার বন্ধু, প্যাসিফিক জিনসের কর্মকর্তা আজিম ভাইয়ের মেয়ে ডা. নিশা। নিশা আমার মেয়ের বয়সী। স্বামী এবং সন্তানসহ অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। এটুকু জানতাম, কিন্তু সে যে আমার ফোন নম্বর যোগাড় করে তার বাসায় যাওয়ার জন্য এমন আন্তরিক আবদার করবে তা জানতাম না। তার আন্তরিকতা আমাকে ছুঁয়ে গেলো। ইচ্ছে না থাকলেও ‘না’ করতে পারছিলাম না। আমি নানাভাবে তাকে বিরত করবার চেষ্টা করছিলাম। পথঘাট চিনি না। নিজের গাড়ি নেই। সাথে অনেক লোক। এতোকিছু বলার পর নিশা খুব সহজ সমাধান দিলো যে, আমি আপনাকে হোটেল থেকে তুলে আনা এবং আবার হোটেলে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করবো। আপনি শুধু আমাদের দেখে যান। এরপর তো আর কোন চেষ্টাই কার্যকর থাকে না। নিশা কি আমার মাঝে তার বাবার ছায়া দেখতে চাচ্ছে! ওকে তাকে কখন যেতে পারবো জানাবো বলে ফোন রাখলাম। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমানুষ কিংবা বৃক্ষ
পরবর্তী নিবন্ধজাকাত বিত্তবান ও বিত্তহীনদের সেতুবন্ধন