দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সিডনির হোটেলের জানালায় দাঁড়িয়ে চারদিকের ভবন এবং নিচের ফুটপাত ধরে ছুটে চলা মানুষের কাফেলা দেখছিলাম। কী ব্যস্ততা! অসংখ্য মানুষ। শহরের বুক ছিঁড়ে ছটুছে বাস, অসংখ্য গাড়ি। লাইট ট্রেন নামের ট্রামসার্ভিসও রয়েছে গণপরিবহন হিসেবে।

আগেই বলেছি আমাদের হোটেলটি সিডনি সেন্ট্রাল এলাকায়। ট্যুর অপারেটর জানিয়েছেন যে, সেন্ট্রাল এলাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। ট্রেন, লাইট রেল, বাসসবকিছুর কেন্দ্র যেন এই জায়গাটি। আমাদের হোটেল থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটলে নাকি শহরের সবচেয়ে বড় ট্রেন স্টেশন। ইচ্ছে করলে ওখান থেকে নানা গন্তব্যে যাতায়াত করা যাবে।

আমি জানালায় দাঁড়িয়ে শহরের স্কাইলাইন দেখছিলাম। কী যে সমৃদ্ধ! উঁচু উঁচু সব ভবন, আবার পুরোনো ইটের ছোট ছোট বাড়ি। তবে পুরোটাই মোড়ানো স্থাপত্যে। কাচেমোড়ানো সুউচ্চ ভবন, ব্রিটিশ আমলে তৈরি নিচু নিচু ভবন! পুরানো এবং নতুন ভবনগুলো পাশাপাশি থাকলেও মনে হচ্ছিলো তাদের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব, যেনো দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা! তবে সিডনি যে বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ধারণ করে তা বেশ চোখে পড়ছিল। এটিই একটি সমৃদ্ধ শহরের প্রধান বিশেষত্ব! ঐতিহ্য আর আধুনিকতার সহাবস্থান। পৃথিবীর সমৃদ্ধ শহরগুলো তাদের ঐতিহ্যের লালন করে, ধরে রাখে। পৃথিবীর বহুদেশেই ব্যক্তিমালিকানাধীন পুরানো ভবনও ভাঙ্গা যায় না, সংস্কার করার অনুমোদন দেয়া হয়, কিন্তু তাতেও সামনে পেছনে বা আশেপাশে হাত লাগানো যায় না। ডিজাইনে কোন পরিবর্তন আনা যায় না। তারা ঐতিহ্য ধরে রাখে, অতীতকে হারিয়ে যেতে দেয় না। অথচ, আমরা!!!

আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিচে নামার তাগাদা দেয়া হলো। লাঞ্চ করতে যেতে হবে। ট্যুর অপারেটর জানালেন যে, দশ মিনিটের মধ্যে হোটেলের সামনে থেকে রেস্তোরার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না পৌঁছালে নিজ দায়িত্বে লাঞ্চ করতে হবে।

লায়ন ফজলে করিম ভাই ফোন করলেন। জানালেন যে তিনি ডালিয়া ভাবীকে নিয়ে নিচে নামছেন, আমি এবং বিজয়’দা যেনো দ্রুত নেমে পড়ি। বিজয় দা ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে গেছেন, আমিও। আমরা নিচে নামার পর ট্যুর অপারেটর বললেন যে, কাছেই পাকিস্তানী রেস্তোরা, আজকে আর কোন প্রোগ্রাম নেই, লাঞ্চের পর ফ্রি। রাতে ডিনারে আবার দেখা হবে।

মনে মনে বললাম, ডিনারের চিন্তা পরে হবে, আগে লাঞ্চ সেরে নিই। কিন্তু আমার মাথায় ঢুকছে না যে, বিকেল থেকে রাত অব্দি করবোটা কি!

রেস্তোরা নাকি কাছেই, আমাদের সবাইকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন ট্যুর অপারেটর। বিশাল চওড়া ফুটপাত, শত শত মানুষ হাঁটছেন, তাই আমাদের হাঁটতেও খারাপ লাগছিল না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, হাঁটার সময় রিঙা টেঙি বা বাস এসে যে ধাক্কা দেবে না সেটির গ্যারান্টি রয়েছে। গায়ে মিষ্টি হাওয়া মাখতে মাখতে আমরা হাঁটছিলাম।

বিশাল চওড়া রাস্তা ধরে ছুটছে নানা রকমের যানবাহন। পাশের ফুটপাতটি খুবই সুন্দর, বড় বড় গাছ অকাতরে ছায়া বিলুচ্ছে। নানা ধরণের পাখীও ওড়াউড়ি করছে। ফুটপাতের পাশে কিছুটা পরপরই বসার জন্য বেঞ্চ করে রাখা হয়েছে। ছায়া ঢাকা, পাখী ডাকা এমন এক আবহ শহরের কেন্দ্রে!!

চারদিকের আবহ দেখে ঘোর লেগে যাচ্ছিলো। প্রচুর তরুণতরুণী হাঁটছিলেন। এতো যুবক যুবতী দেখে মনে হচ্ছিলো অস্ট্রেলিয়াও আমাদের মতো যুবশক্তিতে সমৃদ্ধ! কথাটি বলতেই ট্যুর অপারেটর হাসলেন। বললেন, যাদের দেখছেন এরা সবাই শিক্ষার্থী। অধিকাংশই বিদেশী। বিশ্বের নানা দেশ থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা ‘অস্ট্রেলিয়ান’ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে উপমহাদেশের শিক্ষার্থীরা এদেশে এসে লেখাপড়া শেষ করে থেকে যান, পিআর, পাসপোর্ট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস শুরু করেন।

আমাদের মেধা পাচার হচ্ছে বহুবছর ধরে। আমাদের দেশের কষ্টার্জিত টাকায় বিদেশে লেখাপড়া শিখে আমাদের সন্তানেরা বিদেশেই থেকে যাচ্ছে। এতে করে দিনশেষে লাভও ‘বিদেশের’। এতোদিন আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হিসেবে লাখ লাখ টাকা টিউশন ফি নিয়ে যেসব শিক্ষার্থীকে তারা লেখাপড়া করিয়েছে, তারা তাদেরই হয়ে গেছে!

ট্যুর অপারেটর জানালেন যে, কাছেই সিডনি ইউনির্ভাসিটি এবং সিডনি ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনির্ভাসিটি। তাই এলাকাটিতে সবসময় শিক্ষার্থীদের আনাগোনা চলে। শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে বিশ ঘন্টা করে কাজ করতে পারেন, যাদের অধিকাংশই এখানে বিভিন্ন শোরুম, হোটেলরেস্তোরা এবং বারে কাজ করেন।

অল্পক্ষনের মধ্যেই আমরা রেস্টুরেন্টে পৌঁছে গেলাম।

সুন্দর গোছানো রেস্তোরা। সবকিছু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। দেয়াল জুড়ে নানা ছবি, পোস্টার। সেখানে নানা ধরণের খাবারের ছবি। পাকিস্তানী রেস্তোরা, বিরানী, কাবাবসহ মোগলদের মতো খাবার দাবারের আয়োজন। আমাদের ট্যুর অপারেটর বেশ অভিজ্ঞ। তিনি সবাই খেতে পারেন এমন করে অর্ডার দেন, সামলে নেন।

আমি খুবই আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, গোল্ড কোস্টের মতো এখানেও বাংলাদেশী তরুণতরুণী পেয়ে গেলাম। পরিচিত হয়ে জানলাম যে, তারা লেখাপড়া করে। সপ্তাহে বিশ ঘন্টা এখানে জব করেন। তরুণ রাজশাহীর, তরুণীদের একজন ঢাকা অপরজন রাজবাড়ির। আমাদের অর্ডার আগেই দেয়া ছিল, এখন তারা সার্ভ করছেন। কথা বলে জানতে পারলাম যে, বাংলাদেশের তিনজন শিক্ষার্থী এই রেস্টুরেন্টে জব করেন, দুজন মেয়ে, একজন ছেলে। ভারতীয় দুজন এবং পাকিস্তানী শেফসহ কয়েকজন স্টাফ রয়েছেন। বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান মিলে উপমহাদেশীয় আবহ!

খাবার সার্ভ হলো, নানা ধরনের খাবার। এতো এত্তো খাবারের মাঝে আস্ত মাছের গ্রিল, আস্ত মুরগী রোস্টের অর্ডার করা হয়েছে। এতো খাবারের দরকার পড়ে না, তবুও ট্যুর অপারেটর সবই অর্ডার করছেন। তিনি লায়নের বড় গ্রুপটিকে অতিমাত্রায় সন্তুষ্ট রাখতে চান, যাতে ভবিষ্যতেও ব্যবসা ঠিকঠাক থাকে। তাছাড়া তিনি নিজেও লায়নিজমে বিশ্বাসী, বহুদিন ধরে লায়নিজম করেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে লায়ন সদস্যদের জন্য একটু বেশি বেশিই তিনি করতে চাচ্ছেন বলেও আমার মনে হলো।

এক বাংলাদেশী তরুণীকে ডাকলাম, অনুরোধ করলাম আরো কিছু সালাদ এবং কাঁচামরিচ দেয়ার জন্য। তিনি এতো সন্দুর করে সালাদ তৈরি করিয়ে আনলেন যে চোখ জুড়িয়ে গেলো। বেশ তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করলাম। প্রতিটি আইটেমের টেস্ট ছিলো দুর্দান্ত, ১০ এ ১০। সার্ভিস খুবই ভালো। বাংলাদেশী তরুন তরুনী কিছুটা বাড়তি কদর দেয়ায় সার্ভিসও দুর্দান্ত হয়ে উঠেছে। লাঞ্চের পরে মসলা চা সবশেষের ‘ভালো’ হয়ে মন ভরিয়ে দিলো।

আমরা আবারো হোটেলের পথ ধরলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে ভালো হবে। সেই ফুটপাত ধরে হাঁটছি, যাওয়ার সময় যা দেখে গিয়েছিলাম সেগুলো নতুন করে দেখতে দেখতে হোটেলে পৌঁছে গেলাম। লবিতে আড্ডা না পিটিয়ে আমরা সরাসরি রুমে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ ঘুমালে ভালো হবে।

বিজয় দা আমাকে ডেকে তুললেন। বললেন, সন্ধ্যা হয়ে গেছে, চলেন ঘুরে টুরে আসি। হোটেলে ঘুমানোর জন্য তো সিডনি আসিনি! কথাটি একদম ঠিক, ঘুমানোর জন্য তো সিডনি আসিনি। তবে ঘুম চলে আসলে করবো টা কী!

লায়ন ফজলে করিম ভাইকে ফোন দেয়া হলো। ভাবী আর বের হতে চাচ্ছেন না।

আমরা তিনজন হোটেল রিসিপশনে গিয়ে ধারে কাছে দেখার মতো কি আছে, বা কোথায় যাওয়া যায় জানতে চাইলাম। রিসিপশনের তরুণী কোনদেশের বুঝতে পারছিলাম না, তবে অস্ট্রেলিয়ান বলে মনে হলো না। তিনি আমাদের দিকে বেশ মোলায়েম করে তাকালেন। বললেন, বার কিংবা ডিসকোতে যেতে চাই। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে দুই কদম পিছিয়ে গেলেন করিম ভাই। আমি বললাম, না না ওসব নয়, দর্শনীয় কিছু। শপিং মল, মিউজিয়াম!

তরুনী যেনো কিছুটা লজ্জা পেলেন। বললেন, একটু সামনে গেলেই চায়না টাউন। সুন্দর জায়গা। ভালো লাগবে।

আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। আমাদের হোটেল পেছনে ফেলে কিছুদূর এগুতে শত সহস্ত্র শিক্ষার্থীর উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকাটি যেনো উচ্ছ্বসিত। কত দেশের মানুষ যে দেশটিতে বসবাস করে কে জানে!

মাত্র মিনিট কয়েক হাঁটার পরই আমরা বিখ্যাত চায়না টাউন সিডনি। চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে রাস্তার গাছে গাছে লাল লণ্ঠন ঝুলিয়ে রাখে। এখানেও একইভাবে লাল লণ্ঠন ঝুলিয়ে চীনের আবহ দেয়া হয়েছে। অনেক ধরণের জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে। রয়েছে চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সারিও। চীনের তৈরি নানা পণ্য বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের সকলেই চীনা, ক্রেতারা নানা দেশের। কত ধরণের পণ্য যে চীন তৈরি করে তার ছোটখাটো একটি প্রদর্শনী যেনো এই চায়না টাউনে।

বিশ্বের কারখানাখ্যাত চীন পৃথিবীর অধিকাংশই দেশেই নিজেদের পণ্যের যোগান দেয়। বিশ্বব্যাপী বাজার তাদের। অস্ট্রেলিয়ায়ও তাদের পণ্যের পসরা বেশ সমৃদ্ধ, ক্রেতাও অনেক। চায়না টাউনের আলো আঁধারীতে যেনো চীনেরই জয়গান রচিত হচ্ছিলো! (চলবে)

লেখক ঃ চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপবিত্র রমজান মাসের খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া উচিত
পরবর্তী নিবন্ধ১৪ উপজেলায় পরীক্ষামূলক ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু ১০ মার্চ