(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্ট থেকে ফিরছি সিডনিতে। ভার্সিন অস্ট্রেলিয়ার ফ্লাইট। আমাদের বিমানটি ইতোমধ্যে অবতরণের ঘোষণা দিয়েছে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে বিমানটি আরো নিচে নেমে এলো। সিডনি শহরের সবকিছু পাখীর দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছিলো। বিমানবন্দরটিরও দেখা মিললো, দেখা যাচ্ছিলো বিস্তৃত রানওয়েও। আমাদের বহনকারী প্লেনটি হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে রানওয়ে স্পর্শ করে ছুটতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যে সেটি থেমে গেল, অতঃপর গাড়ির মতো করে ধীরে ধীরে টার্মাকের দিকে এগুতে লাগলো।
আশেপাশের যাত্রীদের সিলবেল্ট খোলার শব্দ শুনছিলাম, কারো কারো মোবাইল বেজে উঠলো। কিছুটা ব্যস্ততাও দেখা গেলো যাত্রী এবং কেবিন ক্রুদের মাঝে। আমার মতো অনেকেই বসে আছেন, কেউ কেউ ফোনে কথা বলছেন। সবার চোখে মুখে কমবেশি সিডনিতে পৌঁছে যাওয়ার আনন্দ! আহা, কতজন যে কতকাজে এই সিডনিতে আসছেন! কেউবা চাকরি করতে, কেউবা স্বজনদের দেখতে, কেউবা উচ্চ শিক্ষার জন্য। আবার অনেকেই শুধু বেড়ানোর জন্য।
অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী সিডনি নয়, তবুও সিডনিই দেশটির প্রধান শহর। সিডনি বিমানবন্দরই অস্ট্রেলিয়ার প্রধান বিমানবন্দর। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন কমার্শিয়াল বিমানবন্দরগুলোর একটি। ১৯২০ সাল থেকে গত একশ’ বছরেরও অধিককাল ধরে এই বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের আনাগোনা চলছে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় বিমানবন্দরের উন্নয়ন হয়েছে, সম্প্রসারণ হয়েছে। আগে শর্ট ডিট্রেন্স ফ্লাইট চলাচল করতো, এখন লং ডিস্ট্রেন্স ফ্লাইট! একসময় ছোট বা মাঝারী ফ্লাইট চলাচল করলেও এখন বোয়িং কিংবা এয়ারবাসের যে কোন সাইজের ফ্লাইটই এই বিমানবন্দর অনায়াসে হ্যান্ডলিং করতে পারে। বিমানবন্দরটিতে তিনটি টার্মিনাল ও তিনটি রানওয়ে রয়েছে। যেখান থেকে প্রতিদিন অন্তত এক হাজার ফ্লাইট পরিচালিত হয়। বিশ্বের খ্যাতনামা ৩০টিরও বেশি ফ্লাইট অপারেটর এই বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক নানা রুটে ফ্লাইট অপারেট করে। প্রতিদিনই এই বিমানবন্দর থেকে বিশ্বের নানা দেশে শতাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট আকাশে ওড়ে, অবতরণ করে। গত বছর এই বিমানবন্দর প্রায় সাড়ে চার কোটি যাত্রী হ্যান্ডলিং করেছে। বছরে সাড়ে চার কোটি! দৈনিক প্রায় সাড়ে ১২ লাখ!! প্রতিদিনই আমাদের যে কোন বড় একটি জনসভার লোকসমাগম হয় সিডনি বিমানবন্দরে! এই একটি তথ্যই বিমানবন্দরটির ব্যস্ততা অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট!
আমরা বিমান থেকে বেরিয়ে বোর্ডিং ব্রিজ হয়ে ডোমেস্টিক টার্মিনালের দিকে এগিয়ে গেলাম। ট্যুর অপারেটর আমরা যেনো দলছূট হয়ে না পড়ি সেদিকে খেয়াল রাখতে বললেন। তিনি বললেন, প্রচুর যাত্রী, প্রচুর ভিড়। হারিয়ে গেলে নিজ দায়িত্বে হোটেলে পৌঁছাতে হবে। তিনি আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে হোটেলের নাম–ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য দিয়ে রেখেছেন বলেও জানিয়ে দিলেন।
আমরা অনেকেই একসাথে এসেছি, ঢাকা এবং চট্টগ্রামের লায়ন সদস্যদের বিরাট দল। চট্টগ্রামের চারজন আমরা একসাথেই থাকি, হাঁটি, খাই। লায়ন ফজলে করিম ভাই ডালিয়া ভাবীকে সাথে নিয়ে আমাদের আগে আগে হাঁটছেন। পেছনে আমি ও লায়ন বিজয় শেখর দাশ। ফজলে করিম ভাই বললেন, হারালে অসুবিধা নেই। আমরা চারজনে একটি উবার নিয়ে চলে যাবো। তাড়াহুড়ো করে দৌঁড়াতে পারবো না।
বিমানবন্দরের সর্বত্রই ব্যস্ততা চোখে পড়ল। প্রচুর মানুষ এদিক ওদিক ছুটছেন। এরা আসলে আস্তে হাঁটতে পারে না। আমাদেরকে পেছনে ফেলে অনেকেই এগিয়ে গেলেন। সর্বত্রই ব্যস্ততা, তবে শৃঙ্খলার কোন অভাব নেই। বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ইংরেজিতে এতো সুন্দর করে নির্দেশনা দেয়া রয়েছে যে, ইচ্ছে করলেও হারার সুযোগ নেই। বিমানবন্দরটি বিশাল, বিস্তৃত। একেবারে সাজানো গোছানো, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কিছু বলার নেই। অসংখ্য দোকান, দোকানে দোকানে থরে থরে সাজানো নানা পণ্য। অনেকগুলো ব্র্যান্ডশপও দেখা গেলো। একটি ঘড়ির দোকানে কিছুক্ষন ঘাটাঘাটি করার ইচ্ছে হলো, আমার প্রিয় কলমের দোকানটিতেও একবার ঢুঁ মারতে মন চাচ্ছিলো। কিন্তু করিম ভাইয়ের তাড়ায় কোনকিছুই হলো না। খাবারের দোকানগুলোও বেশ চোখে পড়ছিল। নানা ধরনের খাবারের গন্ধ ভেসে আসছে। কোন একটিতে বসে কিছু একটা খেয়ে নিলেই হতো! ফজলে করিম ভাই আমি কফি খাবো কিনা জানতে চাইলেন। বুঝতে পারছিলাম যে, তিনি আমার কফিপ্রেম নিয়ে টিটকারি করলেন। আমি হেসে ট্যুর অপারেটরকে অনুসরণের পরামর্শ দিলাম।
ডোমেস্টিক ফ্লাইট হওয়ায় ইমিগ্রেশন ঝামেলা নেই, নিরাপত্তা ও ব্যাগেজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া যথেষ্ট গোছানো। আমরা লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে গেলেই চলবে। নির্দেশনা দেখে দেখে লাগেজ বেল্টের দিকে হাঁটছিলাম আমরা। বিমান অবতরণের পরই পাইলট কত নম্বর বেল্টে আমাদের লাগেজ থাকবে তা বলে দিয়েছিলেন, অতএব বেল্ট খোঁজার জন্য আর ডিজিটাল স্কিনের সামনে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকার দরকার নেই। সিঙ্গেল রুট, তাই লাগেজ হারানোর শংকা নেই। আমরা নির্দিষ্ট বেল্টে গিয়ে লাগেজের অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ব্যাগেজ বেল্টে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আশেপাশের মানুষের ভাষা, পোশাক আর আচরণে বোঝা যাচ্ছিল–সিডনি বহুজাতিক সংস্কৃতির ধারক। কত রঙের কত ধাঁচের মানুষ সিডনি বিমানবন্দরে!
আমাদের বেল্ট ঘুরতে শুরু করলো। বুঝতে পারলাম যে, লাগেজ দেয়া শুরু হয়েছে। অল্পক্ষনের মধ্যে আমাদের লাগেজ পেয়ে গেলাম। ট্যুর অপারেটর একপাশে অপেক্ষা করছিলেন। সকলের লাগেজ পাওয়ার পর তিনি আমাদেরকে সামনের দিকে হাঁটার নির্দেশনা দিয়ে নিজে আগে আগে হাঁটতে লাগলেন।
বাইরে এসে প্রথম যে জিনিসটি চোখে পড়ল, তা হলো সারিবদ্ধ বাস ও ট্রান্সফার সার্ভিস। ট্যুর অপারেটর বাসচালককে ফোন করলেন। আমরা বিমাবন্দরের বাইরে আমাদের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
বেশ বড়সড় একটি বাস নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। এই বাসেরও কোন সহকারী নেই। লাগেজ সব আমাদেরকেই তুলতে হয়েছে। মধ্যবয়সী চালক আমাদের স্বাগত জানিয়ে বাস চালাতে শুরু করলেন।
বাসে উঠে জানালার পাশে বসতেই শুরু হলো আরেক নতুন অভিজ্ঞতা। রাস্তা ধরে বাস ছুটে চলেছে, দুই পাশে সুউচ্চ সব ভবন, কোথাও আবার সবুজ পার্ক। সড়কগুলো প্রশস্ত, ফুটপাতগুলো গোছানো, সাজানো। প্রচুর গাছ রাস্তার পাশে। গাড়ির গতি দ্রুত কিন্তু নিয়ন্ত্রিত। লেনে লেনে চলছে সবগাড়ি। কেউ লেন বা সাদা দাগ ক্রস করে এদিক ওদিক যাচ্ছিলো না। এতো শৃংখলা! ট্রাফিকের ব্যস্ততা আছে, তবে বিশৃঙ্খলা নেই। চারপাশের পরিবেশ, আবহ এতো সুন্দর যে মন ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। আধুনিক ভবনগুলোর পাশাপাশি কিছু কিছু পুরানো ভবনও চোখে পড়ছিলো। সবগুলোই ব্রিটিশ ধাঁচে, যেনো ইংল্যান্ডের কোন শহর! রাস্তার যেসব নাম বাস থেকে পড়তে পারছিলাম সেগুলোও ব্রিটিশ। লন্ডন শহরে দেখেছি এমন অসংখ্য রাস্তার নাম সিডনিতে চোখে পড়লো!
ধীরে ধীরে আমাদের বাসটি শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় ঢুকে পড়লো। ট্যুর অপারেটর আগেই বলেছিলেন যে, আমাদের হোটেলটি একেবারে শহরের সেন্টারেই। দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার সুবিধা এবং রাতবিরাতে ঘুরে ফিরে দেখার সুবিধার কথা মাথায় রেখে তিনি ভাড়া বেশি হলেও সেন্টারেই হোটেল নিয়েছেন বলে আমাদের শুনিয়ে দিলেন।
আমাদের বাস চলছিল। বাড়ছিল শহরের ব্যস্ততা। অফিসপাড়া, কফিশপ, রেস্তোরাঁ সবখানে মানুষের আনাগোনা। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় রাস্তার ওপারে দেখলাম মানুষ ব্যস্তভাবে হেঁটে যাচ্ছে, কারও হাতে কফির কাপ, কারও হাতে ল্যাপটপ ব্যাগ। কেউবা খালি হাতে কেবলই সামনে ছুটছে। দূর থেকে এক ঝলক দেখা গেল বিখ্যাত সিডনি অপেরার সাদা স্থাপত্য, পাশে বিস্তৃত সিডনি হারবার। কাছ থেকে সিডনি অপেরা এবং হারবার অবশ্যই দেখবো, আমাদের ট্যুর প্ল্যানেও আছে। তবে এক ঝলক দেখাতেই মনটি কেমন যেনো নেচে উঠলো, বিমান থেকেও একটু করে দেখেছিলাম সিম্বল অব সিডনি হয়ে উঠা অপেরা ও হারবার। এ দু’টির সঙ্গে সিডনি যে কী অঙ্গাঙ্গিভাবেই না জড়িত!
শহরের প্রাণকেন্দ্র সিবিডি এলাকায় আমাদের হোটেল। বাস হোটেলের সামনেই পার্ক করলো। তবে ড্রাইভারের তাড়াহুড়োয় বুঝতে পারছিলাম যে, এখানে তিনি বেশিক্ষন বাস রাখতে পারবেন না। চারপাশে প্রচুর কোলাহল। আকাশচুম্বী সব ভবন। ভবনগুলোর ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলো সিডনির নীল আকাশ। রাস্তা দিয়ে প্রচুর গাড়ি চলাচল করছিল, ফুটপাত ধরে ছুটছিলো হাজারো মানুষ। সিডনির ব্যস্ততা আমাদের স্পর্শ করে যাচ্ছিলো।
আমরা লাগেজ টেনে হোটেলের রিসিপশনে পৌঁছলাম। বেলবয়কে লাগেজগুলো দিয়ে সোফায় বসে পড়লাম। ট্যুর অপারেটর আমাদের সবার চেক ইন করছেন। আমাদেরকে ওয়েলকাম ড্রিংকস সার্ভ করা হলো। জিরাপানি টাইপের। কিন্তু খারাপ লাগলো না। হোটেলে চেক–ইনের প্রক্রিয়া বেশ দ্রুত হয়ে গেলো। বুঝতে পারলাম যে, রিসেপশনের মেয়েগুলো বেশ দক্ষ, পেশাদার। তারা হাসিমুখে আমাদের স্বাগত জানালেন, রুম কার্ড দিয়ে দিলেন। লিফটে চড়ে যখন কক্ষে পৌঁছালাম। দারুণ দুইটি বিছানা। একটি আমার, অপরটি বিজয় দা’র। জানালার পর্দা সরিয়ে দিলাম। আলোয় ভরে গেলো রুম, বাইরে চমৎকার সব ভবন, নিচে ফুটপাতে মানুষের কাফেলা! (চলবে)
লেখকঃ চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।











