(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
আমাদের বাস চলছিল। সূর্য ডুবে গেছে আগে, ভর সন্ধ্যাও পার হয়ে গেছে। চারদিকে আলোর ঝলকানিতে গোল্ড কোস্ট বর্ণিল হয়ে উঠেছে। ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে যাচ্ছে আলোর রঙ, চারপাশের রূপ। মায়াবী এক শহরে আমরা রাতের খাবারের জন্য পথে নেমেছি। আমাদের গন্তব্য কোথায় তা কেবল ট্যুর অপারেটরই জানেন।
মহাসাগরের পাড়ে গড়ে উঠা গোল্ড কোস্ট অস্ট্রেলিয়ার পর্যটনে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। রাত নামলেও পথে ঘাটে প্রচুর গাড়ি, প্রচুর পর্যটক। সমুদ্রের নোনা গন্ধ, দূরে ঢেউয়ের একটানা গর্জন, আলোকোজ্জ্বল রাজপথ আর বর্ণিল সব উঁচু উঁচু ভবন–সব মিলিয়ে শহরটা অন্যরকম। এ শহর যেনো কেবলই রঙ বদলায়, কিন্তু মনের গহিনে তাল, লয় এবং ছন্দ যেনো একই থাকে। আর এটাই দিনভর ঘোরাঘুরির পর শরীরটা ক্লান্ত হলেও মনটাকে অদ্ভুত রকম সতেজ রেখেছে।
অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের বাস থেমে গেলো। আমাদের হোটেলের কাছেই একটি রেস্তোরাঁয় ডিনার করাতে আনা হয়েছে আমাদের। রেস্টুরেন্টটিও সুন্দর, বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। অবশ্য, অস্ট্রেলিয়ার মতো শহরে খাদ্যে ভেজাল দেয়া কিংবা অপরিস্কার পরিবেশে খাওয়ানো দুটোই শুধু কঠিনই নয়, মহাকঠিন। রেস্তোরাঁটি পাকিস্তানি নাকি ভারতীয় ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। বেশ বড়সড় রেস্টুরেন্টে প্রচুর লোক ডিনার সারছিলেন। অধিকাংশই ভারতীয় এবং পাকিস্তানী। সাদা চামড়ার কয়েকজন নারী পুরুষকেও বিয়ারের ক্যানের সাথে দিব্যি কাবাব চিবুতে দেখা গেলো।
বাইরে সার্ফার্স প্যারাডাইসের রাস্তা ঝলমল করছে। রেস্তোরাঁর ভেতরে মায়াবী আলো আর মসলার চমৎকার গন্ধ। সন্ধ্যার সময়ও মনে হয়েছিল ডিনারে কিছু খাবো না। খাওয়ার কোন ইচ্ছেও আমার ছিল না। রুমে বসে না থেকে দলের সাথে আসলে শহরের কোন একটি অংশ হয়তো দেখা হবে–এই ভাবনা থেকেই আমি বাসে চড়েছিলাম। কিন্তু এখন মুহূর্তেই আমার ক্ষুধা অনেকগুন বেড়ে গেলো। মসলার দারুণ গন্ধ আমাকে টানতে লাগলো!
আগেই খাবার অর্ডার দেয়া হয়েছে, আমাদের জন্য টেবিলও আলাদা করে রাখা আছে। বসার পর টেবিলে একে একে এলো নান, চিকেন করাহি, কাচ্চি বিরিয়ানি আর ধোঁয়া ওঠা ডাল। ডাল দিয়ে নানরুটি মুখে দিয়ে মনে হলো একটি দেশের সাথে অপর দেশের হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব থাকলেও স্বাদের কোনো দূরত্ব নেই। মসলার ঝাঁঝ, ঘির হালকা সুবাস এবং ডালের সেই চিরচেনা ঘ্রাণ–সব মিলিয়ে প্রবাসে বসে যেনো স্বদেশের কোন রেস্তোরাঁর খাবার খাচ্ছিলাম! সাদা চামড়ার যেসব মানুষ এতোক্ষন কাবাব দিয়ে বিয়ার খাচ্ছিলেন তাদেরকেও দেখলাম প্রচন্ড কৌতূহল নিয়ে বিরিয়ানি চাখছেন। তাদের অভিব্যক্তি দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, তারাও নতুন এক স্বাদের প্রেমে পড়েছেন।
আমরা গল্পে গল্পে ডিনার সারছিলাম। নান এবং বিরিয়ানি ভাগাভাগি করে খেলাম আমরা। রাত কিছুটা বাড়লেও জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম গোল্ড কোস্টের আকাশে আলো কমেনি, থামেনি জীবনের কোলাহল। গোল্ড কোস্টে আমাদের সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শহরটিকে ছেড়ে যেতে কেমন যেনো মায়া লাগছে!
আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। কেউ কেউ এদিক–ওদিক ঘুরতে গেলেও আমরা রুমে চলে গেলাম। লবিতে প্রায় প্রতিদিনকার আড্ডায় যোগ দেয়া হলো না। সকালেই ফ্লাইট, সিডনির। ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে হবে। রুমে ঢুকে ধীরে সুস্থে সবকিছু খুঁজে নিয়ে ব্যাগ গোছানো শেষ করলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে সরাসরি নিচে চলে যাওয়ার মতো প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।
অ্যালার্ম বেজে ওঠার আগেই ঘুম ভেঙে গেল। সুইচ টিপে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি আকাশে হালকা নীলচে আলো, শহরটা তখনও আধো ঘুমে। আরো একটু ঘুমানো যায় কিনা চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘুম ধরলো না। সকালের ফ্লাইটের এই এক মহাযন্ত্রনা। টেনশনে ঘুম হয়না।
ডোমেস্টিক ফ্লাইট, অনেক ফর্মালিটিরই দরকার হয়না। ফ্লাইট ছাড়ার এক ঘন্টা আগে পৌঁছালেই চলে। কিন্তু ট্যুর অপারেটর গ্রুপে ম্যাসেজ দিলেন, ব্যস্ত বিমানবন্দর, একটু আগে ভাগে পৌঁছালে ভালো হবে। তিনি সবাইকে সবকিছু নিয়ে নিচে নেমে আসার তাগাদা দিলেন। চাবি জমা দিয়ে ঠিকঠাকভাবে চেক আউট করে নেয়ারও পরামর্শ দিলেন।
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্যারের সফরসঙ্গী হয়ে বছর কয়েক আগে প্যারিস গিয়ে হোটেলের চেক–আউট নিয়ে যে ভোগান্তির শিকার হয়েছিলাম তা মনে পড়লো। অতএব, সাধু সাবধান! আমি এবং বিজয়’দা চাবি জমা দিয়ে মিনিবারসহ সবকিছু চেক করিয়ে লেখিয়ে নিলাম। কাগজটি যত্ন করে পকেটে নেয়ার পর নিজেদের লাগেজগুলো বাসের লাগেজস্পেসে তুলে দিলাম। আরো কয়েকজন বয়স্ক লায়ন সদস্যকেও সাহায্য করলাম। আগেই বলেছি যে, এসব দেশে বাসের কোন সহকারী নেই। চালকই সবকিছু করেন। তবে আমাদের চালক কিছুটা বয়স্ক। তাই ওনাকে কষ্ট দিতে আমার ইচ্ছে করছিলো না। নিজের লাগেজের পাশাপাশি আরো কয়েকজনের লাগেজও আমি তুলে দিলাম। পরে চড়ে বসলাম বাসে, গন্তব্য গোল্ড কোস্ট এয়ারপোর্ট।
গোল্ড কোস্ট এয়ারপোর্ট বিশাল। বড় দেশের গুরুত্বপূর্ণ এয়ারপোর্ট। অনেক যত্নে তৈরি, যত্নে রাখা। কোন বিশৃঙ্খলা নেই। শত শত যাত্রী নিজেদের মতো করে ছুটছেন। আমরা নির্দিষ্ট ফ্লাইট অপারেটরের কাউন্টারে গিয়ে গ্রুপ চেকইন করলাম। কিছুটা সময় লাগলেও লাগেজ জমা দিয়ে বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। বিজয়’দা এবং ফজলে করিম ভাইকে বললাম, চলেন, লাউঞ্জে গিয়ে কিছু খাই। সকালে তাড়াহুড়োয় তো কিছু না খেয়েই বের হতে হয়েছে। একটি কফিও খাওয়া হয়নি। গুগল ম্যাপে লাউঞ্জ খুঁজে নিলাম। ক্রেডিট কার্ড এবং প্রায়োরিটি কার্ডের সহায়তায় আমরা চারজন নাস্তা এবং কফি খেলাম।
লাউঞ্জ থেকে বের হয়ে নির্দিষ্ট গেটে গিয়ে অল্পক্ষন অপেক্ষা করার পরই আমাদেরকে প্লেনে তোলা হলো। প্লেনটা ধীরে ধীরে রানওয়ে ধরে ছুটতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে গতি বাড়ল, তারপর হালকা একটা ধাক্কার মতো অনুভূতি–মাটি ছেড়ে আকাশে উঠে গেলাম। জানালার পাশের সিটটা পাওয়ায় নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। জানালা দিয়ে শেষবারের মতো সমুদ্ররেখা দেখা গেল। সোনালি বালুকাবেলা, নীল জল, বন–বনানী আর চমৎকার শহর–সব মিলিয়ে গোল্ড কোস্ট যেন পেছনে নয়, অন্তরে রয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা মেঘের ভেতরে চলে গেলাম। বাইরে সাদা তুলোর মতো মেঘ, ভেতরে বিমানের মিষ্টি আলো আর হালকা গুঞ্জন। বড়সড় বোয়িং, পাশাপাশি দশটি আসন। পাশের যাত্রীরা কেউ ঘুমে ঢুলছেন, কেউ ম্যাগাজিন উল্টাচ্ছেন। ক্যাবিন ক্রুকে ইশারায় ডেকে এক বোতল পানি চেয়ে নিলাম। বিদেশীনি যখন পানি দিতে আসলেন তখন আলতো করে হেসে বললাম, সম্ভব হলে এক কাপ কফি। ‘সিউর’, বলে তরুণী মোলায়েম একটি হাসি দিয়ে পা বাড়ালেন। অল্পক্ষণের মধ্যে তরুণী এক কাপ কফি দিয়ে গেলেন। আমি কফির কাপ হাতে জানালার বাইরের মেঘের রাজ্যে রাজকন্যা খুঁজতে লাগলাম।
কতক্ষণ পার হয়েছে টের পেলাম না। নানা ভাবনায় সময় গড়িয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ ক্যাবিনের আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ক্যাবিন ক্রুরা নাস্তা দিচ্ছিলেন। ছোট্ট ট্রেতে ব্রেড, বাটার, ফল আর গরম কফি দিয়ে গেলেন। মেঘের উপর বসে নাস্তা করার মধ্যে আলাদা এক রোমাঞ্চ আছে। পৃথিবীর সব ব্যস্ততা মাটিতে রেখে অন্তত তেত্রিশ হাজার ফুট উঁচুতে মেঘের রাজ্যে বসে নাস্তা করছি!
গোল্ড কোস্ট থেকে সিডনির দূরত্ব খুব বেশি নয়, সাতশ’ কিলোমিটারের মতো। এক ঘন্টার কিছু বেশি সময় লাগার কথা। আমি জানালায় চোখ রেখে খেয়াল করলাম যে, জানালার দৃশ্য বদলাচ্ছে। ধীরে ধীরে মেঘের ফাঁক দিয়ে নিচে ভূমি দেখা যেতে লাগল। পাইলটের কণ্ঠ ভেসে এলো–আমরা সিডনির আকাশসীমায় প্রবেশ করেছি, অল্প সময়ের মধ্যেই অবতরণ করবো। তিনি যাত্রীদের সিটবেল্ট বেঁধে ফেলারও অনুরোধ করলেন।
আমাদের প্লেন আরো নিচে নেমে এলো। জানালার বাইরে তাকিয়ে চোখে পড়ল বিস্তীর্ণ শহর, জলের খাঁজকাটা উপসাগর, আর দূরে পরিচিত এক দৃশ্য–সিডনি হারবারের বিখ্যাত অপেরা হাউজ। সূর্যের আলোয় শহরটা চকচক করছে, জ্যোতি ছড়াচ্ছে অপেরা। এই অপেরা হাউজ অস্ট্রেলিয়ার সিম্বলে পরিণত হয়েছে। সত্যি,বলতে কি এই অপেরা হাউজই আমাকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত টেনে এনেছে। যখনি কোথাও অপেরা হাউজের ছবি দেখতাম, তখনি আমার অন্তরটি আকুলি বিকুলি করে উঠতো। অবশেষে বিমান অবতরণের সময় এক ঝলক সেই অপেরা হাউজের দেখা পেয়ে গেলাম আমি। তবে বিমান থেকে সিডনিকে যতটুকু দেখলাম তাতে বেশ বুঝতে পারছিলাম যে, গোল্ড কোস্টের সৈকতঘেঁষা মায়াবী আবহের বদলে সিডনি অনেক ব্যস্ত, গুছানো এবং বনেদি শহর!
বিমান নিচে নামতে থাকল, বাড়িঘর বড় হতে লাগল, রাস্তার গাড়িগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একসময় হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে আমাদের বিমান রানওয়েতে ছুটতে লাগলো। ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হলো গতি। সবাই একসাথে যেন নিঃশ্বাস ফেলল–আমরা সিডনি পৌঁছে গেছি!
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












